ইসলামে হিজরি সনের গুরুত্ব ও মহররম মাসের ফযীলত
হিজরত অর্থ: হিজরত আরবি শব্দ, হিজর ধাতু থেকে নির্গত, এর অর্থ প্রস্থান করা, ত্যাগ করা, গমন করা, বিরত থাকা, বিচ্ছেদ দেশত্যাগ করা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করা। ইসলামী পরিভাষায় ইসলামকে বিজয়ী ধর্ম হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র মক্কা থেকে মদীনায় গমন করাকে হিজরত বলে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আল্লাহর প্রেরিত কোনো নবী রাসূল নিজ দেশবাসী কর্তৃক সম্মানিত হননি তাঁরা নিজ মাতৃভূমি থেকে হিজরত করে সম্মানিত হয়েছেন, দোজাহানের নবী রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
পবিত্র আল কুরআনের আলোকে ইসলামী বর্ষ : হিজরি সনের সম্পর্ক চন্দ্রের সাথে। আকাশে উদিত নবচন্দ্র মুসলমানদের সময় নির্ধারণী ক্যালেন্ডার। বার মাসে এক বৎসর। ইসলামী নববর্ষের সূচনা সৃষ্টির আদিকাল থেকে। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে গণনার মাস বারটি, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ বা সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করোনা। আর মুশরিকদের সাথে তোমরা যুদ্ধ কর সমবেতভাবে যেমন তারাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সমবেতভাবে। আর মনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন। (সূরা: তাওবা, আয়াত: ৩৬)
ইসলামে হিজরি সনের সূচনা ও গুরুত্ব: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য হিজরতের ১৭ বছর পর খোলাফায়ে রাশেদীনের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইসলামী হিজরি সন প্রবর্তন করেন। বোখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ “ফাতহুল বারী” ৩৭১৯ নং হাদীসের ব্যাখ্যায় হিজরি সনের সূচনার প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে। আমিরুল মু’মিনীন খলিফা হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফত কালে তৎকালীন কুফার গভর্নর হযরত আবু মুসা আশয়ারী রাদ্বিয়াল্লাহু হযরত উমর (রা.)’র খিদমতে পত্র যোগে এ মর্মে আবদেন করেন, যে আমিরুল মু’মিনীন! আপনার পক্ষ থেকে প্রেরিত রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট আদেশ নির্দেশ পরামর্শ সম্বলিত যে সব চিঠিপত্র আমরা পেয়ে থাকি তাতে সন ও তারিখ উল্লেখ না থাকায় সময় ও কাল নির্ধারণ করে কার্য সম্পাদনে আমরা যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হই, এ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সুষ্ঠ সমাধান কল্পে হযরত উমর (রা.) শীর্ষ স্থানীয় সাহাবায়ে কেরামের একটি পরামর্শ সভা আহবান করলেন, উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম থেকে তিনি এ বিষয়ে গঠনমূলক পরামর্শ ও মতামত কামনা করলেন। প্রত্যেকে স্ব–স্ব মতামত ও প্রস্তাব উপস্থাপন করলেন। একদল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র জন্ম দিবসকে করার প্রস্তাব করেন, কিছু সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র নবুওয়ত প্রকাশের দিবসকে করার মতামত দেন, কোনো কোনো সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র ওফাত দিবসকে ইসলামী বর্ষের সূচনা হিসেবে নির্ধারণের প্রস্তাব করেন। আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদীনা হিজরত করেছিলেন যে তারিখে সেদিনটিকে হিজরি সনের তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করার প্রস্তাব করেন সর্বশেষ এ প্রস্তাবটি গৃহীত ও অনুমোদিত হয়। ঐতিহিাসিক মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার মদীনা মুনাওয়ারা রওয়ানা হন, ৮ রবিউল আউয়াল সোমবার দ্বিপ্রহরে কুবা পল্লীতে উপস্থিত হন, আল্লামা ইবন হাযম ও হাফিজ মুগলতাঈ এ অভিমত ব্যক্ত করেন। (যারকানি, খন্ড:১, পৃ: ৩৫১)
রবিউল আউয়াল মাসের পরিবর্তে মহররম মাসকে হিজরি সনের প্রথম মাস হিসেবে এ জন্য করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহররম মাস থেকেই হিজরতের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। এ ছাড়াও হযরত উসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) আমিরুল মু’মিনীন হযরত উমর (রা.) কে পরামর্শ দেন যে, হিজরি সনের সূচনা মুহররম মাস থেকে করা হোক, এর উপর সকলে ঐক্যমত পোষন করেন। (বাবুত তারিখ: ফাতহুল বারী, খন্ড: ৭, পৃ: ২০৯, তারীখে তাবারী, খন্ড:২, পৃ: ২৫২, যারকানী, খন্ড: ১, পৃ: ৩৫২, সীরাতুল মুস্তফা, খন্ড: ১, পৃ: ৩৪০–৩৪১)
হিজরি সন ইসলামী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামী শরীয়তে হিজরি সনের গণনাকে ফরজে কেফায়া হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হিজরি সনের অনুসরণ প্রকৃত পক্ষে খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের অনুসরণ। হিজরি সন হলো হযরত উমর ফারুক (রা.)’র প্রতিষ্ঠিত সুন্নাত। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, তোমাদের উপর আমার সুন্নাত ও আমার খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরা অপরিহার্য। (আবু দাউদ, হাদীস: ৪৬০৭)
হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম: আপনারা অবগত আছেন যে, হাদীসে রসুলের আলোকে নিশ্চয় এই মাস আল্লাহর মাস মহররম, হিজরি সনের প্রথম মাস, এটাকে আল্লাহর মাস নবীদের মাস বলা হয়। এ মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে বহু হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর পুণ্যাত্মা নেক্কার বান্দাগন এ মাসকে মর্যাদা দিয়েছেন। সে ব্যক্তি কতই সৌভাগ্যবান যিনি পূন্যময় আমলের মাধ্যমে বিগত বছরকে অতিবাহিত করেছেন। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা এরশাদ করেন, হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির চিন্তা করা উচিৎ আগামীকালের (পরকালের) জন্য সে কি প্রেরণ করেছে। এবং আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয় তোমরা যা কিছু কর সে সর্ম্পকে আল্লাহ পুরোপুরি অবগত। (সূরা: আল হাশর ৫৯, আয়াত: ১৮)
আমাদের উচিৎ আল্লাহ হিসাব গ্রহণের পূর্বে নিজেরা নিজেদের হিসাব করে নেয়া। জেনে রাখুন! সৌভাগ্যবান তিনিই, যিনি নিজের হিসাব নিজেই নিয়েছেন। যেমন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, (আল্লাহ কর্তৃক) তোমাদের হিসাব নেয়ার পূর্বেই তোমরা নিজেদের হিসাব করে নাও তোমাদের আমলের ওজন দেয়ার পূর্বেই নিজেরাই ওজন করে নাও। (মুসনাদে আহমদ, খন্ড ৪র্থ, পৃ–১২৪)
সর্বোত্তম রোজা মহররম মাসের রোজা: মহররম মাসে রোজা পালনে অসংখ্য ফজিলত রয়েছে হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, রমজান মাসের পর সর্বোত্তম রোজা হল আল্লাহর মাস মহররম মাসের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামায হল রাতের নামায। (মুসলিম শরীফ) হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা ৯ ও ১০ মহররম রোজা পালন করে ইয়াহুদীদের বিরোধিতা কর (তিরমিযী শরীফ) এ বরকতময় মাসে সাধ্যনুযায়ী শরীয়ত সম্মত পুণ্যময় আমল করুন। কুফর, শির্ক, বিদয়াত, মিথ্যাচার, গীবত, চোগলখুরী, এবং সকল প্রকার মন্দ অপকর্ম থেকে বিরত থাকুন। রাফেজী ও শিয়া সম্প্রদায়ের মতো নবীজির পরিবার বর্গের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অপমানমূলক কথাবার্তা ও আমল করা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহকে ভালবাসুন। তাঁর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করুন। আহলে বায়াত রসুলের প্রতি ভালবাসা অন্তরে ধারণ করুন। কেননা নবীজির পরিবারবর্গের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করা ঈমানের আলামত। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু যর রাদিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু হতে বর্ণিত তিনি পবিত্র কাবা ঘরের দরজা ধরে বলেন, আমি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তোমাদের মধ্যে আমার আহলে বায়তের দৃষ্টান্ত হচ্ছে হযরত নুহ আলাইহিস সালাম এর কিস্তির ন্যায়, যে এতে আরোহণ করেছে সে মুক্তি পেয়েছে, যে এটা হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সে ধ্বংস হয়েছে। (মিশকাত শরীফ)
আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদের আপনাদের সকলকে কুরআনুল করীমের বরকত রহমত হেদায়াত ও নুর দান করুন। আল্লাহ আমাদের আপনাদেরকে কুরআনুল করীমের কল্যাণ ও জ্ঞানগর্ভ নসীহত দ্বারা উপকৃত করুন। তিনি মহান দানশীল রাজাধিরাজ, পুণ্যময় অনুগ্রহশীল ও দয়ালু। আমিন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।












