জীবনেরে কে রাখিতে পারে

রীতা দত্ত | রবিবার , ১২ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০৮ পূর্বাহ্ণ

অমোঘ সত্য জীবনকে ধরে রাখার সাধ্য নেই। “প্রিয়া তারে রাখিল না, রাজ্য তারে ছেড়ে দেয় পথ।” সিংহাসন তাকে ধরে রাখতে পারে না। তবুও কিছু জীবনাবসান কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। ৩০ জুন পর্যন্ত যে মানুষটি এত প্রাণবন্ত ছিলেন, উৎফুল্ল ছিলেন প্রতিটি বিষয়ে, মাত্র কয়েকঘণ্টার মধ্যে কিভাবে নিঃশেষ হয়ে গেলেন! চলে গেলেন সকলকে কাঁদিয়ে। প্রবর্ত্তক স্কুল এন্ড কলেজ এর সুযোগ্য অধ্যক্ষ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিমনা মনোজ কুমার দেব। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র, দীর্ঘ বছর কলেজে অধ্যাপনা করেছেন এই বিষয়ে অত্যন্ত সফলভাবে। এরপর ২০২৪ এ জানুয়ারিতে যথানিয়মে নির্বাচিত হয়ে প্রবর্ত্তক স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

২৯শে জুন দ্বাদশ শ্রেণির এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান এবং একাদশ শ্রেণির নবীনবরণ অনুষ্ঠান। অত্যন্ত জমজমাট একটি আয়োজন, আমি যথারীতি উপস্থিত। থাকবেন প্রধান অতিথি হিসাবে চট্টগ্রাম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর সুধীর বিকাশ দেব এবং বিশেষ অতিথি থাকবেন তাঁর বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বনামখ্যাত কবি, সাংবাদিক, চট্টগ্রাম একাডেমি প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাশেদ রউফ। মনোজ বাবুকে এত খুশি হতে আগে দেখিনি। দীর্ঘদিনের লালিত ইচ্ছা তাঁর পূরণ হলো। অনুষ্ঠানে রাশেদ রউফ তাঁর স্বাভাবিক ভঙ্গিমায়, সাবলীল উপস্থাপনায় বক্তব্য রাখলেন সময় উপযোগী। মনোজ বাবু অত্যন্ত খুশি হলেন। মঞ্চ থেকে ঘোষণা করলেন শীঘ্রই রাশেদ রউফএর চট্টগ্রাম একাডেমিকে নিয়ে সাহিত্য আড্ডা করবেন। কিন্তু …..। এর আগে ১৭ জুন আমরা প্রতিষ্ঠানের স্কুল এবং কলেজ শাখার গাইড এবং রেঞ্জার ছাত্রীদের দীক্ষাদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। বিগত ৩ সেশনে এই দীক্ষাদান অনুষ্ঠান হয় তাঁর আগ্রহে যা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বিরল। এসব বিষয়ে এত আগ্রহ তাঁর! তাঁর আমন্ত্রণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের মাননীয় চেয়ারম্যান, সচিব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজের অধ্যক্ষ, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সহ অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ। আমরা গার্ল গাইডস এসোসিয়েশন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। কোন একবার বসন্ত উৎসবে বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র মহোদয় উপস্থিত ছিলেন। এর আগে দীর্ঘ অনেক বছর এই প্রতিষ্ঠানে এত গুণীজনের সমাগম হয়নি। তিনি একজন সংস্কৃতি প্রেমী মানুষ। তাঁর আগ্রহে চট্টগ্রামের সাহিত্য সংস্কৃতি প্রেমীদের বিচরণস্থল ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। একজন অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি সহকর্মীদের প্রতি কত আন্তরিক এবং গুণগ্রাহী ছিলেন তার প্রমাণ পেয়েছিলাম। তাঁরই আগ্রহে কলেজের প্রভাষক চন্দনা ভট্টাচার্য এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা জোনাকী দত্তের বই প্রকাশনা উৎসব হয়। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তাঁরই আমন্ত্রণে বিশিষ্টি লেখক শওকত হাসান রুশ্নি সহ আরো কয়েকজন। আমিও একজন আলোচক ছিলাম। প্রবর্ত্তক স্কুল এন্ড কলেজে তাঁর আড়াই বছরের কর্মকালে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি একাডেমিক শিক্ষার অগ্রগতি, খেলাধুলার উন্নয়ন বিজ্ঞান চর্চা, সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত ছিল। প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ছাত্রছাত্রীরা অনেক পুরস্কার অর্জন করেছে যা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্থাপনায় তাঁর আন্তরিকতার জানান দেয়। এগুলি কখনো ভুলবার নয়।

জুলাই মাসের ১ তারিখ সকালবেলা কলেজ শাখার প্রভাষক হাসানের একটি ফোন পেলাম। শুনালো মর্মান্তিক ঘটনা। আমি মর্মাহত হলাম। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সাথে সাথে মনে পড়লো তাঁর পুত্র মনিশ এর তো ২ তারিখ থেকে পরীক্ষা। তাঁর কি হবে? খবর পাচ্ছি প্রবর্ত্তক স্কুল এন্ড কলেজে তাঁর নিথর দেহ আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদ, শিক্ষক, শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী, কর্মকর্তা, কর্মচারী সহ অনেকে উপস্থিত হয়েছে এই প্রিয় মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। আমি সকাল ১০টার দিকে সরাসরি অভয়মিত্র শ্মশানে উপস্থিত হলাম। কি দৃশ্য দেখব এটা চিন্তা করতে পারছিলাম না। এমন তরতাজা মানুষটি এখন নির্বাক। কিছুক্ষণ পর এম্বুলেন্সে তাঁকে আনা হলো ঘটনাস্থলে। এম্বুলেন্স থেকে কলেজ শিক্ষিকা সুচিত্রা চৌধুরী মুক্তা দত্ত, সুপর্ণা বড়ুয়া, সুমা মুহুরি নামলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে তাঁদের নিবিড় ক্রন্দন আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। মনোজ বাবুর মধ্যে এমন কি ছিল যাতে তিনি সর্বস্তরের মানুষের হৃদয় জুড়ে আছেন! ভাবলাম এ তাঁর স্বভাবের সম্ভ্রান্ত সৌজন্যবোধ যে শক্তি দিয়ে তিনি সকলের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। আমরা যথানিয়মে শাস্ত্রবিধি মতে তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় গীতাপাঠ, বেদমন্ত্র পাঠ করলাম অনুষ্ঠানস্থলে।

আমার সাথে তাঁর প্রথম দেখাও হয় এই অভয়মিত্র শ্মশানে। ২০২৩ এর ডিসেম্বরের শেষদিকে প্রফেসর চিত্রপ্রসাদ তালুকদারের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে আমি শ্মশানে উপস্থিত ছিলাম। সব শেষ করে যখন ফিরছি তখন হঠাৎ শুনলাম পেছন থেকে কে যেন আমাকে দিদি বলে ডাকছেন। পিছনে ফিরে দেখলাম একজন ভদ্রলোক। আমাকে বললেন, দিদি আমি জানুয়ারির ১ তারিখ আপনাদের প্রতিষ্ঠানে (প্রবর্ত্তক স্কুল এন্ড কলেজ) অধ্যক্ষ পদে যোগদান করব। আমার খুব ভালো লাগল। এই খবর আমি শুনেছি কিন্তু তাঁর সাথে সরাসরি দেখা হয়নি এর আগে। বললেন, আমার বড় ভাই অধ্যাপক পংকজ কুমার দেব আপনাকে জানেন। আমি আশ্বস্ত হলাম একজন সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চার মানুষ আমাদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবেন। আমার মনে হলো তিনি অত্যন্ত স্থিতধী ব্যক্তি। তিনি পারবেন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে। তিনি প্রায় আমাকে ফোনে বলতেন, দিদি একটু আসবেন, কথা আছে। আমি সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানে ছুটে গেছি। ঋষিতুল্য মানুষদের গড়া এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যে আমার আত্মার যোগ। তাঁর সময়কালে প্রতিটি অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত থাকার চেষ্টা করতাম। আমি বলতাম, আমি তো এখন পরিচালনা পরিষদে নেই। আমার উপস্থিতি জরুরি না। এতে তিনি বলতেন, আমি শুনেছি প্রবর্ত্তক বিদ্যালয়কে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত করতে আপনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। আপনি আমাদের শুভানুধ্যায়ী। আপনাকে আসতে হবে। আমিও তাঁর কথা রাখার চেষ্টা করতাম।

অভয়মিত্র শ্মশানে বিভিন্ন স্তরের মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে তিনি কত ভাল মাপের মানুষ ছিলেন। শেষ যাত্রার দৃশ্যটি অসহনীয়। তবুও ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী যখন আগুনে শেষ আম্রকাষ্ঠ নিক্ষেপ করছিলাম তখন বার বার মনে হচ্ছিল আমার চাইতে বয়সে ২০/২৫ বছরের ছোট তিনি। এভাবেই তাঁকে বিদায় দিতে হচ্ছে। কবি গুরুর কবিতায় আছে, “তুমি যখন অগ্নিবেশে নিয়েছ মোর সব কাছে এসে, তখন আমি পূর্ণ হলাম সকল শূন্য করে।” মনোজ বাবু পূর্ণ হলেন সকলকে শূন্য করে। প্রতিষ্ঠানে মনোজ বাবুর আরব্ধ কাজগুলো যেন সুসম্পন্ন হয়। তাঁর স্মৃতি অম্লান থাকবে তাঁর গুণগ্রাহীদের হৃদয়ে। সকলের সাথে সমবেদনা জানাই।

লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ