আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের বিল উত্থাপন হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক সালাউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ বেশ কিছু অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আসবে। এসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণভোটের প্রয়োজন হবে।
গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের গণমাধ্যম সেন্টারে সংবিধান সংশোধন কমিটির তৃতীয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কমিটি। সংবিধানের মৌলিক কোনো সংশোধন আনা হলে তা গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। কমিটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতাদের এ কথা জানানো হয়েছে। খবর বাংলানিউজের।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, বিভিন্ন জার্নালিস্ট ফোরামের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে তফসিল এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। অনেকেই লিখিত প্রস্তাব দেবেন। এসব প্রস্তাব ও আলোচনা রিপোর্ট ও পুস্তিকা আকারে প্রণয়ন করা হবে।
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্পাদকদের অনেকেই বিরোধী দলের সদস্যদের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরাও এর সঙ্গে একমত। আমরা তাদের বারবার আহ্বান জানিয়েছি এবং এখনো জানাই। তারা কমিটিতে যোগ দিলে আমরা স্বাগত জানাব। আমরা চাই আমাদের মধ্যে কোনো বিভক্তি না থাকুক, ঐকমত্যের ভিত্তিতেই আমরা কাজ করতে চাই।
গণভোট প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র–গণ অভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী বাতিল হওয়ায় ১৪২ অনুচ্ছেদটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সংবিধানে এমন কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, যেমন প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে অবশ্যই জনগণকে গণভোট দিতে হবে। বিল পাসের পর এই সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সুরক্ষায় গণভোটের প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য তারা ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে, ভবিষ্যতের কোনো সংসদ যেন তা সহজে বাতিল করতে না পারে, সেজন্য এ সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোতে সংশোধনী আনতেও যেন গণভোটের প্রয়োজন হয়, সেই বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান সংশোধনে অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের অগ্রাধিকার হলো জুলাই জাতীয় সনদ। তবে নির্বাচন ইশতেহার অনুযায়ী ম্যান্ডেট পাওয়া বিষয়গুলোও আমরা ধারণ করব। সংবিধানে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’, যা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রস্তাবনায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে অনুচ্ছেদ ৮–এ যুক্ত করেছিলেন, তা আমরা ফিরিয়ে আনব। এটি আমাদের ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি।
সংবিধান সংশোধনের সময়সীমা সম্পর্কে কমিটির আহ্বায়ক জানান, ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন কমিটির রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপনের জোর প্রচেষ্টা চলছে। ওই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আইন মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিল আসবে। আশা করা যাচ্ছে, জানুয়ারির অধিবেশনে (বছরের প্রথম অধিবেশন) বিলটি সংসদে আসতে পারে। এরপর বিলের ওপর আলোচনা ও সংশোধনী শেষে পাস হলে গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।
মৌলিক সংশোধন গণভোটের মাধ্যমে হবে : সংবিধানের মৌলিক কোনো সংশোধন আনা হলে তা গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। কমিটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতাদের এ কথা জানানো হয়েছে।
গতকাল দুপুরে জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধান সংশোধন বিষয়ে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মতামত জানতে তৃতীয় দফায় বৈঠকে বসে বিশেষ কমিটি। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই বৈঠকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। এ সময় সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে সরকারের বর্তমান অবস্থান ও বক্তব্যও জানতে চান উপস্থিত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা।
বৈঠক শেষে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক পরিবর্তনে গণভোট করতে হয়। সংবিধানে সে রকম কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনা হলে গণভোট হবে বলে আমাদের জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। বৈঠকে আরো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা, সরকারি নিয়োগে শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনার বিষয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।












