বছর ঘুরে ফিরে এসেছে মহান ১২ রবিউল আউয়াল। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে ধরণী আলোকিত করে শুভাগমন করেছিলেন বিশ্ব মানবতার মুক্তির অগ্রদূত মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ১২ রবিউল আউয়াল একই দিনে ৬৩ বছরে তাঁর তিরোভাব ঘটে। মহানবীর (দ) শুভ জন্ম ও তিরোধান উভয়ই মানবজাতির জন্য কল্যাণকর। স্বয়ং মহানবী (দ) বলেছেন-‘হায়াতি খায়রুল্লাকুম ওয়ামামাতি খায়রুল্লাকুম’ অর্থাৎ ‘দুনিয়ায় আমার পদার্পণ তোমাদের জন্য কল্যাণকর। একইভাবে জাহেরিভাবে আমার দুনিয়া থেকে প্রস্থানও তোমাদের জন্য কল্যাণময়।’ প্রিয় নবী (দ) হচ্ছেন হায়াতুন্নবী অর্থাৎ সদা জীবন্ত ও জাগ্রত। উম্মতের সবকিছু তিনি দেখেন, জানেন। তিনি জিন্দানবী বলেই আমরা তাঁর ওফাত দিবস পালন করি না বরং তাঁর জন্ম দিবসে খুশি উদযাপন করি। বাংলাদেশে তথা চট্টগ্রামে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে লাখো লাখো ঈমানদার নবী ওলীপ্রেমী জনতার উচ্ছ্বাসমুখর অংশগ্রহণে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসা জশনে জুলুস এবার ৫৫ বছরে পদার্পণ করেছে। রাহনুমায়ে শরিয়ত ও তরিকত গাউসে জমান আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মজিআ) এর নেতৃত্বে ইয়ানবী (দ) সালাম আলাইকা, ইয়া রাসূল (দ) সালাম আলাইকা ধ্বনিতে রাজপথ মুখরিত করে তুলবে নবীওলীপ্রেমী লাখো লাখো জনতা। আওলাদে রাসূল (দ) কে সামনে রেখে রাজপথে হেঁটে হেঁটে উচ্চ রবে দরুদ–সালামের পরিবেশনায় নগরী যেন অনন্য রূপ ধারণ করে। জশনে জুলুস হচ্ছে নবী ওলীপ্রেমী জনতার ঈমানি চেতনা, জজবা–উদ্দীপনার সেরা বহিঃপ্রকাশ। ইসলামী তাহজিব তমদ্দুন ও কৃষ্টি সংস্কৃতির সেরা উদাহরণ এই জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ)।
ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে শরিয়তসম্মত পন্থায় জশনে জুলুস উদযাপন নতুন কোনো কৃষ্টি সংস্কৃতি নয়, বরং যুগে যুগে বিভিন্ন অবয়বে নানা আঙ্গিকে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) পালিত হয়ে আসছে। তবে পীরে কামেল হাউসে জমান আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ) এর নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রামে বড় আয়োজনে ১৯৭৪ সন থেকে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে ‘আজিমুশ্মান জশনে জুলুস’ আয়োজন মহত্তর ইসলামী–কৃষ্টি–সংস্কৃতিরই যেন জানান দিয়ে আসছে। গাউসে জমান আল্লামা সৈয়দ তৈয়ব শাহ (রহ) এর প্রধান খলিফা আলহাজ্ব নূর মোহাম্মদ আলকাদেরীর (রহ) নেতৃত্বে ১৯৭৪ এবং ১৯৭৫ সনে পর পর দুই বছর চট্টগ্রাম নগরের বলুয়ারদীঘি খানকাহ শরিফ থেকে জশনে জুলুসের আয়োজন হয়। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৬ সন পর্যন্ত টানা ১০ বছর ‘জশনে জুলুসের’ নেতৃত্ব দেন আওলাদে রাসূল (দ) গাউসে জমান আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ)। সুদূর পাকিস্তানের সিরিকোট দরবার শরিফ থেকে এসে তিনি জশনে জুলুসের আয়োজনে বড় অবদান রাখেন। পরবর্তীতে তাঁরই আওলাদ ও স্থলাভিষিক্ত সাজ্জাদানশিন রাহনুমায়ে শরিয়ত ও তরিকত আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মজিআ) দীর্ঘকাল ধরে জশনে জুলুসের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে এ জুলুসের নেতৃত্ব দেন পীরে বাঙাল আওলাদে রাসূল (দ) আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মজিআ)। এ বছরও যথারীতি পীরে বাঙাল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মজিআ) এর নেতৃত্বে ঢাকায় ৯ রবিউল আউয়াল এবং চট্টগ্রামে ১২ রবিউল আউয়াল (২৬ আগস্ট বুধবার) জশনে জুলুস আয়োজিত হতে যাচ্ছে। ৫৫ বছরে এসে জশনে জুলুস আজ সারা দেশে নবীওলীপ্রেমী জনতার মাঝে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। সকল সুফিবাদি তরিকতপন্থি সুন্নি–দরবারের সাজ্জাদানশিন পীর মাশায়েখ ও উলামায়ে কেরাম আজ জশনে জুলুস আয়োজনে শামিল হচ্ছে। যারা এক সময় জুলুসের বিরোধিতায় পঞ্চমুখ ছিল, কাল পরিক্রমায় তারাও আজ জুলুসের প্রাসঙ্গিকতা–প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারছে এটি নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। আওলাদে রাসূল (দ) আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ) সূচিত এ জশনে জুলুস আজ বিশ্ব ইসলামী সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। কুরআন মজিদের সূরা ইউনূসের ১০: ৫৮ আয়াতে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-‘হে প্রিয় মাহবুব বলুন! আল্লাহর অনুগ্রহ রহমত প্রাপ্তিতে তারা আনন্দ প্রকাশ করুক। তারা যা সঞ্চয় করে তার চেয়ে এটিই উত্তম।’ মহানবীর (দ) দুনিয়ায় শুভাগমন আল্লাহ পাকের সেরা নেয়ামত ও অনুগ্রহ স্বরূপ। তাই নবীজীর (দ) শুভ জন্মদিবস উপলক্ষে আনন্দ খুশি প্রকাশ করা মহান আল্লাহ পাকেরই নির্দেশনার বাস্তবায়ন মাত্র।
ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে ধর্মীয় শোভাযাত্রা তথা জশনে জুলুস উদযাপন হয়তো অর্ধশতাব্দী আগেও এতো ব্যাপক আকারে ছিল না–তা ঠিক। কিন্তু যুগের চাহিদার নিরিখে দ্বীন ইসলামের মাঝে নবতর সংযোজন হিসেবে জশনে জুলুসকে মানা ও উদযাপন করা নিঃসন্দেহে উত্তম ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা যায়। সকল বিদয়াত ঢালাওভাবে বর্জনীয় নয়। কিছু উত্তম বিদয়াতও রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে বিদয়াত দুই প্রকার। বিদয়াতে হাসানাহ এবং বিদয়াতে সাইয়িয়াহ। বিদয়াতে হাসানাহ হচ্ছে এমন বিদয়াত বা ইসলামে নবতর সৃষ্টি–যা নির্দ্বিধায় মানা যায়। যেমন নবীজীর (দ) যুগে মসজিদ–খানকাহগুলো এতো চাকচিক্যময় ছিল না। মসজিদগুলো আজকের মতো এতো পাকা আলীশান টাইলসে সুসজ্জিত বা এয়ারকন্ডিশন ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসে প্রায় সকল মসজিদের স্থাপনা এখন সুরম্য ও দৃষ্টিনন্দন। এই বাড়তি সৌন্দর্যই হচ্ছে উত্তম বিদয়াত বা বিদয়াতে হাসানা। ঠিক তেমনিভাবে যুগে যুগে ইসলামের নীতিরীতি মেনে অনেক গ্রহণযোগ্য অনাপত্তিযোগ্য বিষয় ইসলামে প্রবেশ করেছে। এরই একটি হচ্ছে বিদয়াতে হাসানাহ বা উত্তম বিদয়াত। জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) কে এমন গ্রহণযোগ্য উত্তম বিদয়াতে হাসানাহ মানতে অস্বীকারের কোনো অবকাশ নেই। লেখক: ইসলামী গবেষক, সাংবাদিক।












