জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সেমিনারে তথ্য

নগরের ৭২টি খাল পুনরুদ্ধার করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ আগামী বর্ষায় শহর ৭০-৮০ ভাগ জলাবদ্ধতামুক্ত থাকবে : মেয়র পাহাড় কাটা বন্ধ করেন, জলাবদ্ধতা কমবে : সিডিএ চেয়ারম্যান গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন : আজাদী সম্পাদক.

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ১০ মে, ২০২৬ at ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ

নগরের জলাবদ্ধতার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ কাজ করছে। ভৌগোলিকভাবে এই শহর পাহাড়, নদী, খাল, উপকূল, নিম্নভূমি এবং ঘন নগরায়ণের এক জটিল সমন্বয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে অল্প সময়ের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, জোয়ারের প্রভাব এবং অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নগরের অনেক এলাকায় নিয়মিত জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। জলাবদ্ধতা এখন আর শুধু অস্থায়ী পানি জমে থাকার ঘটনা নয়; এটি চট্টগ্রামের নগর ব্যবস্থাপনার একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকেত।

চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা : সংকটের উৎস ও নাগরিক দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য জানিয়েছেন গবেষকরা। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হলে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে বক্তারা বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে ইমরাত নির্র্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করা, পাহাড় না কাটা, উন্মুক্ত জলাশয় ভরাট রোধ করা, নগরের ৭২টি খাল পুনরুদ্ধার করে প্রকল্পভুক্ত করা, নালাখালে ময়লা ফেললে জরিমানা ও শাস্তির আওতায় আনা, শহরের গুরুত্বপূর্ণ নালাখালে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডাস্টবিন স্থাপন, নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলতে নগরবাসীর মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং পলিথিনমুক্ত শহর গড়ে তোলা।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। উদ্বোধক ছিলেন দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচির সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান ও সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার নুরুল করিম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক শামসুল হক হায়দরী। সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. আল আমিন, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আয়েশা খানম ও বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. মনজুরুল কিবরিয়া।

জলাবদ্ধতা নিয়ে আশার বাণী মেয়রের : সিটি মেয়র ড. শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, আগামী বর্ষায় চট্টগ্রাম শহর ৭০ থেকে ৮০ ভাগ জলাবদ্ধতামুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, আমি মনে করি জলাবদ্ধতাই আমাদের প্রধান সমস্যা। কিন্তু ২০২৫ সালে জলাবদ্ধতা যখন ৫০৭০ ৫শতাংশ কমে চট্টগ্রাম শহর সুন্দর নগরীতে পরিণত হয়, তখন আমরা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম জলাবদ্ধতা নামে কিছু ছিল কি না। যার কারণে অমুক ইস্যু তমুক ইস্যু চলে আসে। হঠাৎ করে বৈশাখের বৃষ্টি হওয়ার পর থেকে আবার জলাবদ্ধতা ইস্যুটা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি আপনাদের আশা দিতে চাই। এখানে আমি কোনো নিরাশা দেখি না। শুধু একটা বিষয়কে ভয় পাচ্ছি, ওই জোয়ার, যেটা আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু আশাও ব্যক্ত করছি, যেহেতু আমাদের কিছু স্লুইচগেট নির্মাণ করা হয়েছে।

ডা. শাহাদাত বলেন, আপনাদের (সাংবাদিক) ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের বক্তব্যের কারণে গভর্নমেন্ট চট্টগ্রামের এই প্রজেক্টটা নিয়ে আরো বেশি কনসার্ন হয়েছে। আমরা হয়তো আরো বাজেট চাচ্ছি। এটা আমাদের লাভ হয়েছে। তিনি বলেন, প্রেজেন্ট মিনিস্টার ইজ ভেরি কনসার্ন। প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন জনগণের ভোগান্তির জন্য। এটা ঠিক যে জনগণের ভোগান্তি হয়েছে, আমি নিজেও দেখেছি, আমি ছিলাম তো। আমি পানির মধ্যে ছিলাম, আমার সামনে বাচ্চা মেয়েগুলো যাচ্ছে। তাদের বললাম, তোমরা যাবা না, যদি স্ল্যাব না থাকে তোমরা পড়ে যাবে। কাজেই ভোগান্তি হয়েছে। আসলে এখানে কিছু করার নেই। কিন্তু ভোগান্তিটা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি লাভের জন্য কাজগুলো করা হচ্ছিল। ওটা চিন্তার মধ্যে আসেনি চারপাঁচ ঘণ্টা একটানা বৃষ্টি হবে। বাঁধগুলো খোলা হয়নি। বাঁধগুলো দেওয়া হয় রিটেইনিং ওয়াল দেওয়ার জন্য।

মেয়র বলেন, আপনাদের কি মনে নেই সেই ২২২৩, এমনকি ২৪ সালেও যখন বর্ষা হয়েছে, বহদ্দারহাট থেকে রেজাউল করিম সাহেব বের হতে পারেননি। তো ২৫ সালে বহদ্দারহাটে পানি উঠেছিল? উন্নতি হয়েছে তো, নাকি হয়নি? হয়েছে। আমি আপনাদেরকে কিন্তু এটা স্পষ্ট বলতে চাই, আপনারা যারা স্বচক্ষে দেখেছেন ২৩২৪ সালে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুর, চকবাজার পানির জন্য মানুষ বের হতে পারে নাই। ২৫ সালে মানুষ বের হতে পেরেছিল কি না, পানির জন্য কষ্ট পেয়েছে কি না? পায়নি। কাজেই আমাদের এত নিরাশ হওয়ার কী আছে? উন্নতি তো হয়েছে। শুধু এটুকুই বলছি, চিন্তার কিছু নেই।

তিনি বলেন, বহদ্দারহাটের যে বড় মার্কেট থেকে ২০ লাখ টাকা ভাড়া পেতাম, যেটা নালার উপর দিয়ে মার্কেট করেছিল, সেটা আমি এক বাক্যে ভেঙে দিয়েছিলাম। যার কারণে বহদ্দারহাটে পানি নেই। এছাড়া আমাদের প্রস্তুতি হচ্ছে আগামী ৬ মাসের জন্য। কারণ আমাদের যে ষড়ঋতুর দেশ এখন আর ষড়ঋতুর দেশ নাই। গ্রীষ্মের পর বর্ষা, বর্ষার পরে শরৎ আর হেমন্ত আসে নাই গত বছরে। শরৎ হেমন্ত বর্ষার মধ্যে ঢুকে গেছে। ছয় মাস আমরা বর্ষাকাল দেখেছি। জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত কিন্তু বৃষ্টি পড়েছে। কাজেই এবারও ওই চিন্তা করে ছয় মাস নিয়ে আমরা চিন্তা করছিলাম যে জুনের ফার্স্ট উইক থেকে নভেম্বর।

মেয়র বলেন, আজকে আমাদের মূল সমস্যা ওইখানেই, যারা সেদিন ৬ হাজার কোটি টাকা, ৯ হাজার কোটি টাকা চুরি করে সিটি কর্পোরেশনকে এড়িয়ে জোর করে প্রকল্প নিয়েছিল। পরে তাদের সক্ষমতা নেই বলে তারা ভাড়া করেছে সেনাবাহিনী। সিডিএ চেয়ারম্যান মাত্র এসেছেন জুলাইআগস্টের পরে। উনিও একজন বৈপ্লবিক নেতা, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে উনি কিন্তু এসেছেন। সততার ব্যাপারে আমি বলতে পারি উনি অত্যন্ত অনেস্ট। কাজে আমি মনে করি এখানে আসলে কারো দোষ নেই।

এম এ মালেক বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

আবু সুফিয়ান এমপি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে জনগণকে কীভাবে আরও সচেতন করা যায়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দিকনির্দেশনা এই সেমিনার থেকে পাওয়া গেছে। খালনালা দখলমুক্ত করা ও খালের পাড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা অপসারণে বিশেষজ্ঞ নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে খাল ও নালায় ময়লাআবর্জনা না ফেলার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

খারাপ কাজের জন্য ধন্যবাদ : সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা অনেকে নেগেটিভ নিউজ করেছেন। ২০২৪ যখন চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ফিফটি পার্সেন্ট উন্নতি হলো তখন যদি আপনারা মেয়র মহোদয় বা সিডিএকে আরেকটু উৎসাহিত করতেন, আরেকটু ভালো সংবাদ পরিবেশন করতেন, আমরাও আরো উৎসাহিত হতাম। কেউ কেউ বলেছেন, কিন্তু অতটুকু উৎসাহপ্রেরণা আমরা পাইনি। কিন্তু আপনারা নেগেটিভ নিউজটা, সবার ক্ষেত্রে না, কেউ কেউ এত বেশি করে, পুরনো ছবি দিয়েও প্রচার করেছেন। জলযট হয়নি সেটা বলব না, কিন্তু আপনার বাড়িয়ে বলেছেন। সেই বাড়িয়ে বলার খারাপ কাজের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ দিই। আপনারা খারাপ কাজটা করার ফলে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এটা নজরে পড়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে মেয়র মহোদয়ের সাথে কথা বলেছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) চট্টগ্রামের জলযট বা জলাবদ্ধতা নিয়ে কনসার্ন হয়েছেন। এজন্য উনাকে ধন্যবাদ দিই, একজন পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে সরকারকে ধন্যবাদ দিই।

তিনি বলেন, নগরকে সুন্দর রাখতে হলে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে চলতে হবে। আমরা প্রত্যেকেই মনে করি, অন্যকে নিয়ম মানতে হবে, আমাকে মানতে হবে সেটা মনে করি না। আমি সিডিএর চেয়ারে বসে দেখেছি, যারা বক্তৃতা দেয়, ইমারত নির্মাণ বিধিমালার কথা বলি, কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে এটা পালন করে না। আমাদের জন্য অত্যন্ত ডিফিকাল্ট হয়ে যায় সামাজিক ফোর্স মোকাবিলা করা। কিন্তু দৃঢ় পণ করেছি, যতদিন সিডিএর চেয়ারে থাকি আমার হাত দিয়ে অবৈধ কিছু করতে দেব না। এ সময় পাহাড় না কাটার জন্য আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পাহাড় কাটা বন্ধ করেন, জলাবদ্ধতা কমবে।

অন্যরা যা বললেন : নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, কোনো সমস্যা অস্বীকার করে সমস্যার সমাধান করা যায় না। সমস্যাকে স্বীকার করতে হয়, অ্যাড্রেস করতে হয়। চট্টগ্রামে কদিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি যে কারণেই ঘটুক, প্রধানমন্ত্রী অস্বীকার করেননি, মেয়রও অস্বীকার করেননি। মাঝখান থেকে কেউ অস্বীকার করে জনগণকে হতাশ করেছেন, ক্ষুদ্ধ করেছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, নগর আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়, সঠিক বাস্তবায়ন এবং নাগরিক সচেতনতা।

অধ্যাপক ড. আল আমিন বলেন, হঠাৎ অতিবৃষ্টি, চলমান উন্নয়নকাজ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। তিনি চট্টগ্রামকে দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র উল্লেখ করে এর টেকসই উন্নয়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ৭২টা খাল উদ্ধার করে প্রকল্পের আওতায় আনতে হবে। উন্মুক্ত জলাশয় যাতে ভরাট না হয় সেদিকে সিডিএকে নজর দিতে হবে। টাইডাল রেগুলেটর স্থাপন করতে হবে, ব্রিজকালভার্ট প্রশস্ত করতে হবে। চট্টগ্রাম শহরের সবগুলো উন্নয়ন কাজ সমন্বয় করার জন্য সিটি মেয়রের নেতৃত্বে সিটি গভমেন্ট ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর বলেন, কর্ণফুলী নদীসহ প্রধান যে খালগুলো রয়েছে সেখানে অনেক শিক্ষিত ফ্যামিলিও ময়লা ফেলে। এখানে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।

সেমিনারে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এস এম নসরুল কদির, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি ও ফোরাম ফর প্ল্যানড চট্টগ্রামের সভাপতি প্রফেসর ড. সিকান্দর খান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শাহ নওয়াজ, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি মনসুর, রাশিয়ান অনারারি কনসাল স্থপতি আশিক ইমরান, ঈসা আনসারী ও অভীক ওসমান। যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ, যুগ্ম সম্পাদক মিয়া মো. আরিফ সাংবাদিক শাহনেওয়াজ রিটন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলোহাগাড়ায় মহাসড়কে আবার দুর্ঘটনা, নিহত ৪
পরবর্তী নিবন্ধপাইন্দং আশ্রয়ণ প্রকল্পে মস্তকবিহীন মরদেহ