লোহাগাড়ায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারীসহ ৪ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে চুনতি ইউনিয়নের বনপুকুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় দুই বাসের বেশির ভাগ যাত্রী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিহতরা হলেন পটিয়া উপজেলার বদিউল আলমের স্ত্রী রেহেনা আক্তার, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গোপালপুর এলাকার চান আলীর পুত্র বিজিবি সদস্য নাইমুল ইসলাম জিহান, একই এলাকার আনোয়ার হোসেনের পুত্র নাঈমুল ইসলাম ও ভোলা জেলার মনির আহমদ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাস্থলে মারসা পরিবহনের দুটি বাসের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কক্সবাজারমুখী বাসে থাকা এক নারী ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। দুর্ঘটনায় উভয় বাসের প্রায় অর্ধশত যাত্রী কম–বেশি আহত হয়েছেন। মুখোমুখি সংঘর্ষের পর বাস দুটি সড়কের পাশে থাকা গাছের সাথে ধাক্কা দেয়। চট্টগ্রামমুখী বাসের ধাক্কায় গাছের পাশে থাকা একটি দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনায় বাস দুটি দুমড়ে মুচড়ে গেছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ ও ট্রমা সেন্টারে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ৮ জনকে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এক নারী ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন। আরও ৩ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা গেছেন। আহত ৪ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলার সদরে ২টি বেসরকারি হাসপাতালে আহত ৮ জনকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরমধ্যে ৪ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়েছে। লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. তাসফিক আহমেদ জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য হাইওয়ে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ওসি সালাহ উদ্দিন চৌধুরী জানান, খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ফোর্স পাঠানো হয়। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে আইনী প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্ঘটনা কবলিত বাস ২টি হাইওয়ে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিক্ষুদ্ধ জনতার মহাসড়ক অবরোধ : দুর্ঘটনার পর ভাঙা গাছের ঢাল ফেলে চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়ক অবরোধ করেছে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা। এতে প্রায় আধা ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে দূরপাল্লার যাত্রীদের। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা এই রুটে মারসা বাস চলাচল নিষিদ্ধ করার দাবি জানান এবং দুর্ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত বাস ২টি ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে যেতে বাধা প্রদান করেন। পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মং এছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষুদ্ধ জনতাকে মহাসড়ক সরিয়ে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করেন। পরে ক্ষতিগ্রস্ত বাস ২টি উদ্ধার করে নিয়ে যায় হাইওয়ে থানা পুলিশ।
সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম–১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। এমপি শাহজাহান চৌধুরী জানান, চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়ক প্রশস্তকরণ কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে আশা করছি দুর্ঘটনা অনেকটা কমে যাবে। দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া নিহতদের মরদেহ তাদের নিজ বাড়িতে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হয়। মহাসড়কে সিংহভাগ দুর্ঘটনা ঘটে বেপরোয়া মারসা বাসের কারণে। এই বাসের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে যতটুকু সম্ভব ব্যবস্থা গ্রহণ ও দুর্ঘটনার ব্যাপারে ভালোভাবে তদন্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন তিনি।
দুর্ঘটনার পর ঘটেছে লুটপাটের ঘটনা : এদিকে ঘটনার পর হতাহতদের মালামাল লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। তবে স্থানীয় এক যুবক দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৬টি ব্যাগ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকে ওই যুবককে নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেন।
এর আগে গত ২৪ এপ্রিল উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়ায় মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে হতাহতদের মালামাল লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া গত ৭ এপ্রিল মহাসড়কে উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের পরিষদের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় নাসিবুর রহমান নাছির (৪৮) নামে এক বাইক আরোহী নিহত হওয়ার পর তার মোবাইল ও মানিব্যাগ লুটের ঘটনা ঘটেছিল। পরে দুর্ঘটনার পর ধারণকৃত ছবি যাচাই করে লুট করে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর যখন আহতরা জীবন বাঁচানোর জন্য ছটফট করেন, ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু অসাধু মানুষের লুটপাটে জড়িয়ে পড়া মানবিকতার চরম বিপর্যয়। দুর্ঘটনাস্থলে সাহায্যের হাত বাড়ানোর পরিবর্তে একটি চক্র আহত ও নিহতদের টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে একদিকে যেমন আহতদের দ্রুত চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সমাজে মানবতা ও নৈতিকতার ভয়াবহ অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু আইনগত অপরাধ নয়, এটি চরম অমানবিকতারও পরিচয়। দুর্ঘটনার পর মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেখানে নৈতিক দায়িত্ব, সেখানে অসহায় মানুষের সম্পদ লুটে নেওয়া সভ্য সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধি, দ্রুত উদ্ধার টিম মোতায়েন ও লুটপাটে জড়িতদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।














