‘টাইটানিক’ ডুবে পৃথিবীতে জাহাজের সমুদ্র যাত্রাকে নিরাপদ করে দিয়েছে। এ জাহাজডুবির পর সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচল আধুনিক আইন–কানুনে সমৃদ্ধ এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে শক্তিশালী হয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, চট্টগ্রাম বন্দর সহ বাংলাদেশের নৌপথে যত দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার প্রধান দুটি কারণ: নৌযানের কাঠামোগত ও প্রকৌশলগত ত্রুটি এবং নৌ আইন অমান্যের প্রবণতা। আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা সময়ের পরিক্রমায় নৌ নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রটোকল সমূহ যুগোপযোগী করেছে।
গত ০৭ আগস্ট, ২০২৬ খ্রি. একটি কারিগরি ত্রুটিযুক্ত কন্টেইনার জাহাজ CNS URANUS চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ে। বন্দর অভিমুখী যাত্রাপথে যে কোন জাহাজ আকস্মিক অচল কিংবা কারিগরি ত্রুটির শিকার হওয়া দুর্ঘটনা বা বিপদের ঝুঁকি বহন করে। বন্দরে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একক দায়িত্ব নয়। এ দায়িত্ব সমভাবে প্রযোজ্য নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর এবং নৌ পরিবহন অধিদপ্তর–এর ওপর।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের লাইফলাইন বিধায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ভাগ এ বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বছরে গড়ে প্রায় ৪হাজার মার্চেন্ট জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ে। বন্দর ব্যবস্থাপনা একটি কঠিন কর্মযজ্ঞ। এখানে রয়েছে অসংখ্য শক্তিশালী স্টেকহোল্ডার, বিশাল স্বার্থের সংঘাত। এসব ডিঙিয়ে নৈতিক অবস্থানে থেকে বন্দর পরিচালনা করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
বন্দর চ্যানেলে জাহাজ আটকে গেলে, ডুবে গেলে কিংবা দুর্ঘটনা কবলিত হলে দেশের Supply Chain শুধু বন্ধ হয়ে যাবে না, বরং মারাত্মক পরিবেশগত ঝুঁকি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে প্রচণ্ড অভিঘাত সৃষ্টি হবে। বন্দর চ্যানেলে দুটি বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে। একটি গুপ্তখালের নিকটে, আরেকটি নৌবাহিনীর স্থাপনার অদূরে। প্রচণ্ড খরস্রোত যুক্ত এলাকা দুটি নিরাপদে অতিক্রমের জন্য জাহাজের শক্তিশালী ইঞ্জিন এবং কার্যকর স্টিয়ারিং থাকা অপরিহার্য। যদি কোনও কারণে সেদিন CNS URANUS বন্দর চ্যানেলে আটকে যেত, তাহলে ভয়ংকর নাব্যতা সংকট দেখা দিত। এছাড়া সাগরের প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে জাহাজের তলদেশ ফেটে Oil-Spillage ঘটে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি হত।
উল্লেখ্য, দুর্ঘটনার শিকার মার্চেন্ট জাহাজ উদ্ধারে যে International Salvage Convention রয়েছে, তার আলোকে কারিগরি সক্ষমতা এবং জনবল দক্ষতা চট্টগ্রাম বন্দরের নেই। আমার কার্যমেয়াদে একবার চট্টগ্রাম বন্দরের ১নং জেটিতে MV Southern Queen নামক মার্চেন্ট জাহাজ ডুবে গেলে তা’ উদ্ধারে নিয়োজিত উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানকে এমন কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখি, যেন জাহাজ থেকে বর্জ্য বা তেল দূষণ না ঘটে। সফলতার সাথে সে উদ্ধার তৎপরতা সম্ভব হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, একশ্রেণির আমদানিকারক বহির্নোঙ্গরে লাইটারিংয়ের খরচ বাঁচাতে বন্দর চ্যানেলকে ঝুঁকিতে ফেলে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ওভারড্রাফটের জাহাজ বার্থিং করায়, যা’ অত্যন্ত বিপজ্জনক।
চট্টগ্রাম বন্দর ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কর্ণফুলী নদী এবং বঙ্গোপসাগরে হাজার হাজার ঘণ্টা মোবাইল কোর্টের নিরন্তর অভিযানের মাধ্যমে আইন ভঙ্গের অজস্র ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলাম। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার যথার্থ প্রয়োগ করে রাডারের মতো পর্যবেক্ষণে রাখতাম ওভারড্রাফটের জাহাজ, নৌ আইন অমান্যকারী কিংবা দূষণকারী দেশী–বিদেশী জাহাজ। এভাবে শত শত জাহাজ আটক ও জরিমানা করেছিলাম নৌ–আইন অমান্যের অপরাধে, দেশি–বিদেশি কিছু মাস্টার ও ক্রু’দের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। বন্দর চ্যানেলকে নিরাপদ রাখতে ইনল্যান্ড জাহাজের যত্রতত্র নোঙর করার প্রবণতা প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনেছিলাম। বন্দরের পাইলটরা নির্বিঘ্নে বহির্নোয়র থেকে নিরাপদে বন্দরে জাহাজ বার্থিং করতে সক্ষম হতো। আশ্চর্য! নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন, “জাহাজের পেছনে তুমি কেন দৌঁড়াবে?” আরেক কর্মকর্তা বলেছিলেন, “স্যার, আপনি বন্দরের জন্য এত কিছু করছেন, সরকার আপনাকে কী দেয়?” বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের এ বৈশিষ্ট্য কারও অজানা নয়।
চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম রাব্বানী স্যার বলতেন, “ You are more prompt than miliary ”.
যতবড় কর্পোরেট বা আন্তর্জাতিক সুনামধারী প্রতিষ্ঠান হোক না কেন, বাংলাদেশে আইন মান্যতার ক্ষেত্রে নৈতিকতার অভাব দেখেছি প্রকটভাবে। চট্টগ্রাম বন্দরে দায়িত্ব পালনকালে বিদেশি জাহাজ আটক করার পর বিদেশী মেরিনারদের কেউ কেউ ডলার দিয়ে আমাকে প্রলোভিত করতে চাইতো। তাদের ধারণা, বাংলাদেশে টাকা দিয়ে আইন ভঙ্গুর করা যায়। এদেশে বিনিয়োগকারী একটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দম্ভভরে উক্তি করেছিলেন, “ Who cares law in Bangladesh” অর্থাৎ তার ভাষ্য, তিনি সবাইকে কিনে ফেলেছেন। তাঁকে পরিবেশ আইনে একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে প্রমাণ করেছিলাম, বাংলাদেশে সবাইকে কেনা যায় না।
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা কাঠামো কেন্দ্রিক নয়, এ সংকট মূলত: আইনের শাসনের দুর্বলতায়। এজন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্ব। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ঘিরে অদ্ভুত এক দুষ্টচক্র, যারা প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বকে ব্যর্থতার ফাঁদে ফেলে দেয় কিংবা দুর্নীতির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে ফেলে। CNS URANUS জাহাজটির মালিক–এজেন্ট–অপারেটর’এর অপরাধ ছিল, জাহাজটির স্টিয়ারিং গিয়ারের হাইড্রোলিক এলার্ম সিস্টেমে যে ত্রুটি, তা’ বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করা। বিকল স্টিয়ারিং গিয়ার SOLAS-1974 (Safety of Navigation) এবং এর অনুবৃত্তিক্রমে বাংলাদেশের মার্চেন্ট Shipping Ordinanec-1983 অনুযায়ী জাহাজটি আটকযোগ্য।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই CNS URANUS ’কে আইনের শৃঙ্খলে এনে বিপুল অংকের জরিমানা দণ্ড আরোপের জন্য। এ দন্ড প্রদান চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে “Instititional Governance”এর অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
উল্লেখ্য, CNS URANUS ’ কে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষ পাইলটদের মাধ্যমে কঠিন প্রতিকূলতার মধ্যে বন্দরের টাগ’এর সহায়তায় বার্থিং করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার মতামত ছিল, “তথ্য গোপন করে ত্রুটিপূর্ণ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রেরণ অনৈতিক। তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে জাহাজটি আটক এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে উচ্চহারে জরিমানা/ক্ষতিপূরণ আদায়পূর্বক এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত, যা’ ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরে আইন মান্যতার মাইলফলক হয়ে থাকবে।”
বন্দর প্রশাসনের নির্দেশনায় পাইলটরা অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে জাহাজটি বন্দরে বার্থিং করাতে সক্ষম হয়। যে বিষয় আমার কাছে প্রণিধানযোগ্য, বহির্নোঙর থেকে উত্তাল তরঙ্গ পেরিয়ে, ঝড়–ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে দিবা–রাত্রি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে পাইলটরা বন্দরকে সচল রাখে, তাদের জন্য একটি মানসম্মত ঝুঁকিভাতা প্রবর্তন করা অপরিহার্য। বাংলাদেশে আমরা সরকারি সেক্টরে Appreciation ev Rewarding’এর গুরুত্ব উপলব্ধি করি না। মন্ত্রণালয়ের ‘Over Bureacrac’এর চাপে অনেক ক্ষেত্রে বন্দরের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গতি ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া স্তিমিত হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরে একটি পরিচালনা বোর্ড রয়েছে, যা’ বন্দরের প্রশাসন পরিচালনার জন্য সক্ষম। আমি দেখেছি, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানদের কীভাবে রুদ্ধশ্বাসে ঘন ঘন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়!
সরকারকে আহবান জানাব, বন্দরসহ অধীনস্থ সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমলাতন্ত্রের অতি–কর্তৃত্ববাদী আচরণ থেকে মুক্ত করুন। আমি দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে অত্যন্ত স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়ে মন্ত্রণালয়ের অপ্রয়োজনীয় কর্তৃত্ববাদিতা উপেক্ষা করে সময় ও শ্রমের সদ্ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছি।
চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে একটি জাহাজ ডুবে যাওয়া মানে নিছক দুর্ঘটনা নয়, সমগ্র বন্দর অচল হয়ে যাওয়া, নৌ–বাণিজ্য স্থবির হয়ে যাওয়া, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সংকটে পতিত হওয়া অর্থাৎ Nuclear Reaction এর মতো ধ্বংসাত্মক Chain Effect। বন্দরে একটি জাহাজ দুর্ঘটনা পুরো বাংলাদেশের দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে, যার ক্ষতি বইতে হতে পারে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ।
বাংলাদেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে Governance Failure, আইনের শাসনের ভঙ্গুরতা আমাদেরকে পিছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু CNS URANUS ’কে জরিমানার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে Port-Governance’এর সূচককে উন্নত করল। এ বার্তা ওগঙ সহ বিশ্বের সকল বন্দরে পৌঁছে যাক। চট্টগ্রাম বন্দর Natural Harbour, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা’র অপার অনুগ্রহের অনন্য আধার। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় নৈপুণ্য বা দক্ষতা কোন জাদুকরী বিষয় নয়, এটি দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও সততার সমন্বয়। আমাদের সবার জন্য শিক্ষণীয়: The stronger the enforcement of law, the lesser the likelihood of corruption and violation
লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট, চট্টগ্রাম বন্দর












