বিচারপ্রার্থীদের ভিড় বাড়ছে, বাড়ছে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও। সেই সাথে যুক্ত হচ্ছে একের পর এক নতুন আদালত। কিন্তু সেই তুলনায় নতুন করে গড়ে উঠছে না বিচারকাজের মূল অবকাঠামো। ফলে তীব্র স্থান সংকটে পড়েছে চট্টগ্রামের বিচার বিভাগ। নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে অনেকগুলো আদালতকে বাধ্য হয়েই কক্ষ ভাগাভাগি করে বিচারকার্য পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বিচারিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থীরাও পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন আদালত ও ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। ২০২৩ সালে ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার পর ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে দফায় দফায় বেশ কয়েকটি আদালত গঠিত হয়। এর মধ্যে গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি নতুন ২টি বাড়িয়ে অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা ৩টিতে রূপান্তর করা হয়। এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর ১৩টি পারিবারিক আদালত, ১৮ সেপ্টেম্বর ১০টি অতিরিক্ত দায়রা আদালত, ১০টি যুগ্ম দায়রা আদালত, ১১টি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালত ও ৭টি যুগ্ম মহানগর দায়রা আদালত গঠন করা হয়। একই বছরের ২০ অক্টোবর ২টি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইবুনাল এবং ১টি পারিবারিক আপিল আদালত গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
এই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর (২০২৬ সালের) ৩ ফেব্রুয়ারি ৩টি বাণিজ্যিক আদালত এবং গত ৩ সেপ্টেম্বর ৪টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালের এপ্রিলে গঠিত হয় ১টি সাইবার ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া আগে থেকেই ৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনাল, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল এবং শ্রম আদালতসহ বিভিন্ন বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সাধারণ আদালতের মধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৮টি, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ১৩টি, মহানগর দায়রা জজ আদালত ১৯টি এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালত ৪৯টিসহ বিশেষ মহানগর ট্রাইব্যুনালগুলো আগে থেকেই চালু রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক নতুন আদালত ও ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলেও সে অনুযায়ী বাড়েনি দালানকোঠা বা অবকাঠামোগত সুযোগ–সুবিধা। ব্রিটিশ আমলের ঐতিহাসিক ‘লাল আদালত ভবন’ নির্মাণের দীর্ঘ ১২০ বছর পর ২০০৮ সালে নতুন আদালত ভবন নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন এবং এর আগে এনেঙ আদালত ভবন নামের অপর একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রয়োজনের তুলনায় এই ক’টা অবকাঠামো অত্যন্ত অপ্রতুল–বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় বর্তমানে চরম বিপাকে পড়েছেন বিচারক থেকে বিচারপ্রার্থীসহ আইনজীবীরা। বাধ্য হয়ে অনেকগুলো আদালতকে কক্ষ শেয়ার বা ভাগাভাগি করতে হচ্ছে। বর্তমানে দুটি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল মিলে একটিমাত্র কক্ষ ব্যবহার করছে। একইভাবে দুটি অর্থঋণ আদালত, পারিবারিক আপিল আদালত ও ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল, এবং মহানগর ও জেলা দায়রা জজ আদালতের আওতাধীন অনেকগুলো আদালতকে কক্ষ ভাগাভাগি করে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এমনকি নতুন করে প্রতিষ্ঠিত ১৩টি পারিবারিক আদালতকেও অন্য আদালতের কক্ষ শেয়ার করতে হচ্ছে। ৩টি বাণিজ্যিক আদালতের পাশাপাশি সর্বশেষ প্রতিষ্ঠিত ৪টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালকেও অন্য আদালতের কক্ষ ভাগাভাগি করে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এদিকে চট্টগ্রাম আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও আড়াই লাখ ছাড়িয়ে তিন লাখে পৌঁছেছে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির ৮টি আদালতে ৭০ হাজার, মহানগর দায়রা আদালতগুলোতে প্রায় ৫০ হাজার, জেলা ও দায়রা আদালতগুলোতে ১ লাখ ৫০ হাজার মামলা বিচারাধীন। এছাড়া চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি, ৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালসহ অন্যান্য ট্রাইব্যুনালে রয়েছে আরো ৫০ হাজারেরও বেশি মামলা। একদিকে মামলার জট ও বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে নতুন আদালত গঠন করা হলেও উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাবে তার কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধির যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি সমানভাবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ অবকাঠামো না বাড়ালে বিচারকাজে গতিশীলতা আনা সম্ভব নয়। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমিয়ে আনাও কঠিন। এই সংকট নিরসনে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং নতুন ভবনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি বা সুরাহা হয়নি। আইনজীবী সমিতিসহ সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন ও বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে নতুন আদালত ভবন নির্মাণসহ অবকাঠামোগত সুযোগ–সুবিধা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় মামলা জটের পাশাপাশি বিচার কার্যক্রম আরও বেশি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রামে বিচার বিভাগের অবকাঠামো সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে আদালত ও আমরা নতুন অবকাঠামোর জন্য আবেদন জানিয়ে আসছি। কিন্তু অগ্রগতির দেখা পাচ্ছি না।










