চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্টিবিউশন কোম্পানীর সাধারণ সভা এবং কতিপয় প্রস্তাবনা

নেছার আহমদ

বৃহস্পতিবার , ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৬ পূর্বাহ্ণ
40

আগামীকাল ২৫ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিঃ এর নবম সাধারণ সভা। বার্ষিক সাধারণ সভার স্থান চট্টগ্রামে নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়াতে সংশ্ল্লিষ্ট সকলের প্রতি চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে জানাই কৃতজ্ঞতা।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক, সাধারণ গ্রাহক, শিল্প মালিক এবং চট্টগ্রামের সকল রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবির প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামবাসীর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিঃ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে ৮ সেপ্টেম্বর ২০১০। কোম্পানীর আওতাধীন এলাকা হলো বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা। কোম্পানী গঠনের পর ২৪ মার্চ ২০১১ তারিখে ঢাকায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিঃ এর প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস্‌ লিঃ কে পুনঃবিন্যাস করে কেজিডিসিএল গঠনের উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রামের জন্য, চট্টগ্রামের মানুষের জন্য, চট্টগ্রাম শিল্প বিনিয়োগকারী, চট্টগ্রামের গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান। কিন্তু বিশাল অংকের বাজেট করে প্রতিবছর ঢাকাতে কোম্পানীর সাধারণ সভা করা হয়। এতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী, গ্রাহক বা রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেনি। ঢাকায় সাধারণ সভা করে চট্টগ্রামকে এবং চট্টগ্রামের গ্রাহকদেরকে পরোক্ষভাবে অবহেলা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা চট্টলবীর সাবেক মেয়র এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কোম্পানী গঠনের পর হতে আমরা ১৪.১০.২০১৪, ১০.১২.২০১৫ এবং ০৩.০৭.২০১৮ তারিখে কোম্পানীর সাধারণ সভা চট্টগ্রামে করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে পত্র প্রদান করি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এবিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিঃ এর বিগত সময়ের সফল ব্যবন্থাপনা পরিচালক আইয়ুব খান চৌধুরী চট্টগ্রামে বোর্ড সভা এবং সাধারণ সভা করার বিষয়ে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছেন এবং এবিষয়ে তিনি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, চেম্বার এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে অভিহিত করেছেন। কেজিডিসিএল-এর জন্য জায়গা ক্রয় এবং বাংলাদেশ রপ্তানি অঞ্চল মিরসরাইতে বিনা পয়সায় জায়গা বরাদ্দসহ অনেক অনেক সফল কাজের ক্ষেত্রে প্রসংশনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু এবারই প্রথমবারের ন্যায় চট্টগ্রামে কোম্পানীর নবম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিঃ এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে, পেট্রোবাংলার সম্মানিত চেয়ারম্যান, পরিচালক, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এর সকল কর্মকর্তা এবং কেজিডিসিএল এর বোর্ড চেয়ারম্যান এবং বোর্ডের সকল সদস্যকে তাঁদের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি। চট্টগ্রামের এ সভা এখানে যেন থমকে না যায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট অনুরোধ, ভবিষ্যতেও কোম্পানীর নিয়মিত সাধারণ সভা যেন চট্টগ্রামে করা হয়। এবিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক কতিপয় জরুরি বিষয় এবং প্রস্তাবনা এখানে তুলে ধরছি।
১. কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিঃ (কেজিডিসিএল) এর আওতাধীন এলাকা হলো চট্টগ্রাম ও পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জেলা। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো চট্টগ্রামের জন্য গঠিত এ কোম্পানীর বোর্ড এর সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা পর্ষদে সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়। যাদের জন্য যাদের স্বার্থের জন্য এবং যাদেরকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানের জন্য এ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, তাঁদের কোন প্রতিনিধি পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। চট্টগ্রামের এবং চট্টগ্রামের গ্রাহকদের স্বার্থের কথা বলার জন্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় উত্থাপন বা তুলে ধরার জন্য এবং চট্টগ্রামের সমস্যা এবং গ্রাহকদের সমস্যা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়ার কোন প্রতিনিধি নেই। যার কারণে চট্টগ্রামের সকল শ্রেণীর গ্রাহকরা বঞ্চনার শিকার হন। এতে চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামের গ্রাহকদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ মহল।
বর্ণিত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং চট্টগ্রামের একজন গ্রাহক প্রতিনিধি কেজিডিসিএল পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করে চট্টগ্রামের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এবং কোম্পানীর গ্রাহক সেবাদানের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখার সুযোগ দানের জন্য প্রস্তাব করছি।
২. গ্যাস নীতিমালা ২০০৪ এবং ২০১৪ অনুযায়ী সকল প্রকার আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক, ক্যাপটিভ এবং সিএনজিতে সংযোগদানের সকল প্রক্রিয়া স্থানীয় কার্যালয় হতে সম্পাদন করার নীতিমালা প্রচলিত ছিল। এতে মাঠ পর্যায় হতে শুরু করে সকলের মতামত এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তও অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা ছিল। পরবর্তীতে গ্যাস সংকটের কারণে সংযোগ অনুমোদনের প্রক্রিয়া মাননীয় জ্বালানি উপদেষ্টার নেতৃত্বে ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির মাধ্যমে করা হয়। এখনো তা বিদ্যমান। এতে সুবিধা যে রকম রয়েছে তার চেয়ে অসুবিধা বেশী হচ্ছে। কারণ যার গ্যাস সংযোগ দরকার তাঁরটা অনুমোদন পাচ্ছে না, যার গ্যাস প্রয়োজন নেই তাঁরটা অনুমোদন হয়ে বসে আছে। ফলে গ্যাস সংযোগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হচ্ছে।
বর্তমানে এলএনজি যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। এলএনজি আমদানিতে খরচ অনেকগুণ বেশি। এলএনজির মূল ব্যবহারকারী চট্টগ্রামের শিল্প বিনিয়োগকারীরা। বর্তমানে পূর্বের ন্যায় গ্যাস বিপণন নীতিমালা ২০১৪ অনুসরণ করে গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন গ্রহণ মাঠ পর্যায়ে যাচাই বাছাই এবং সংযোগের সম্ভাব্যতা যাচাইপূর্বক কেজিডিসিএলকে সংযোগ প্রদানের অনুমোদন এবং সংযোগ প্রদান করার ক্ষমতা প্রদান করার প্রস্তাব করছি। এ প্রক্রিয়ায় এলএনজির সৃষ্ট ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং চট্টগ্রামের গ্রাহকরা কেজিডিসিএল হতে নির্ধারিত সময়ে সেবা নিতে পারবে। ফলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে, গ্যাস সংযোগ প্রক্রিয়া সহজ হবে, গ্যাস সংযোগের দীর্ঘসূত্রতা কমবে। সরকারের রাজস্ব আদায় সহজ হবে।
৩. কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিঃ নামক কোম্পানীটি গঠনে চট্টগ্রামবাসীর অনেক সংগ্রাম, অনেক কষ্ট ও অনেক ত্যাগ রয়েছে। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে আবাসিক খাতে উল্লেখযোগ্য কোন অপেক্ষামান গ্রাহকদের তালিকা নেই। কিন্তু কেজিডিসিএল এ প্রায় ২৫ হাজার গ্রাহক সকল প্রকার অর্থ জমা সহ সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গ্যাস সংযোগের জন্য অপেক্ষামাণ। এতে জনগণের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে। ২৫ হাজার গ্রাহককে আবাসিক সংযোগ প্রদান করা হলে এলাকা উপকৃত হবে। সরকারের রাজনৈতিক সফলতা আসবে। সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া বর্ধিত সংযোগ বন্ধ থাকায় অবৈধ সংযোগের হার বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে এতে সরকার রাজস্ব হতে বঞ্চিত হবে।
সুতরাং সকল দিক বিবেচনা করে অপেক্ষামাণ ২৫ হাজার আবাসিক গ্রাহককে সংযোগ প্রদান এবং আবাসিক খাতে বর্ধিত সংযোগ চালু রাখার জন্য প্রস্তাব করছি। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে গ্যাসের অপব্যবহার কমবে। চট্টগ্রামে সরকারের এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার স্বার্থে এবিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ খুবই জরুরি।
চট্টগ্রামে প্রথমবারের অনুষ্ঠিতব্য এ সাধারণ সভায় চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পৃক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, পেট্রোবাংলার নীতিনির্ধারক কর্মকর্তাবৃন্দ, চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দসহ সকল স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক এ সভায় যদি বর্ণিত প্রস্তাবাদি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়, তবে চট্টগ্রামের এ সভা ঐতিহাসিক সভা হিসেবে ইতিহাসে অনন্য স্থান করে নেবে। সদ্য নতুন গঠিত সরকারের জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি আরো বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

x