চট্টগ্রামে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি সেপ্টেম্বরে এই এক সপ্তাহে রোগী ছাড়িয়েছে পাঁচশত জনেরও বেশি। অথচ গত আগস্টের পুরো মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ১ হাজার ২০২ জন। তার আগে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত অর্থাৎ আগের সাত মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ছিল ৮৩৪ জন, এছাড়া মোট মৃত্যুর ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে মাসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গুর রোগী সংখ্যা বাড়লেও সেটি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। চট্টগ্রামের জেলা উপজেলার সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর খুব বেশি চাপ নেই। তবে সবার সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রকোপ কমাতে হবে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৫৪৮ জন। এছাড়া মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। এদিকে গতকাল সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ৭১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত চিকিৎসা নিচ্ছেন। এরমধ্যে গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭১ জন, ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে ১৮ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১০ জন, চট্টগ্রাম সিএমএইচ হাসপাতালে ১ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে ১৬ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৩ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামে বর্তমানে কখনো মাঝারি ও কখনো থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিভিন্ন জায়গায় স্বচ্ছ পানি জমছে। বিশেষ করে ফুলের টব ও ডাবের খোসা, গাড়ির টায়ারসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত বস্তুতে পানি জমার কারণে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা প্রজননে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীও বাড়ছে। তাই সবাইকে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখাসহ কোথাও যাতে তিনদিনের বেশি পানি না জমে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এছাড়া রাতে ছাড়াও দিনেরও বেলায়ও মশারি টানাতে হবে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর মূল চিকিৎসা হচ্ছে ফ্লুইড ম্যানেজম্যান্ট। অনেক অনেক রোগী এনএসওয়ান রিপোর্ট হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাচ্ছেন। এটির আসলে কোনো দরকার নাই। ডেঙ্গুর প্ল্যাটিলাট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে তখন ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়। তখন ক্রিটিক্যাল কেয়ার ম্যানেজম্যান্টের প্রয়োজন পড়ে। আবার প্ল্যাটিলেট কমা শুরু হয় জ্বর কমে যাওয়ার পর পর। তখন শারীরিক কিছু অসুবিধা দেখা দেয়। ওই সময় হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্ল্যাটিলেট নিয়ে আতঙ্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আসলে প্ল্যাটিলেট যখন বাড়া শুরু হয় তখন দ্রুতই বাড়ে। কাজেই ডেঙ্গু জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, এখন প্রায় প্রতিদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হওয়ার কারণে পানি জমে যাচ্ছে। ফলে এসব পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মশক নিধনে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরা বিভিন্ন জায়গা ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতার অংশ হিসেবে লিফলেট বিতরণ করছি।
এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে জরিপ চালিয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ গুণ বেশি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ‘ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শীর্ষক জরিপটি পরিচালনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম দপ্তরের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল ৮ জুন থেকে ২০ জুন এই জরিপ পরিচালনা করে। তারা গত ২৪ জুন এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে জমা দেয়। জরিপে কন্টেনার ইনডেঙে (বিভিন্ন ধরণের পাত্রে) এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতির হার পাওয়া গেছে ৩৩ শতাংশের বেশি। জরিপে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জরিপকারী দল। অন্যদিকে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হল– ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩ নম্বর পাঁচলাইশ, ২ নম্বর জালালাবাদ, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা এবং ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড। এসব ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ির মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে, অর্থাৎ প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এসব লার্ভার মধ্যে ৮০ শতাংশ এডিস ইজিপটাই এবং বাকি ২০ শতাং এডিস অ্যালবোপিকটাস ধরণের। জরিপকারী দল এডিস মশার বিস্তার প্রতিরোধে চারটি সুপারিশ করেছে। এরমধ্যে আছে– বাড়িঘর ও কর্মস্থানের জায়গা পরিষ্কার রাখা, সব ধরনের প্লাস্টিক কন্টেনার অপসারণ, সুউচ্চ ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড ও নির্মাণাধীন ভবনে নজরদারি, লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইডের সময়োপযোগী প্রয়োগ এবং মশা নিধনে কীটনাশকের সঠিক প্রয়োগ।
উল্লেখ্য, গত বছর ২০২৫ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মারা যান ২৭ জন। এছাড়া ২০২৪ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা যান ৪৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হয়েছিল ১৪ হাজার ৮৭ জন। এরমধ্যে মারা যায় ১০৭ জন এবং ২০২২ সালে মোট আক্রান্ত ৫ হাজার ৪৪৫ জনের মধ্যে মারা যান ৪১ জন।












