কোনো এক বিকেলে গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ যদি চোখে পড়ে একটি পুরোনো মাটির ঘর, হয়তো অকারণেই মনটা থমকে যাবে। চারপাশে পাকা দালান, ইটের দেয়াল, কংক্রিটের ছাদ আর ব্যস্ততার ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ঘরটি তখন কেবল একটি পুরোনো বাড়ি বলে মনে হবে না। মনে হবে, সময়ের গভীর থেকে উঠে আসা একটি স্মৃতি আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দেয়ালের ফাটলে জমে থাকা বয়স, বিবর্ণ চাল, শ্যাওলার দাগ আর নীরব উঠোন যেন বলে-‘আমাকে চিনতে পারছ? একদিন আমিও ছিলাম এই জনপদের পরিচিত মুখ।’
একসময় গ্রাম মানেই ছিল মাটির ঘর। সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, তার দুপাশে কাশফুল, বাঁশঝাড়, তালগাছ কিংবা সুপারি বাগান; আর তারই ফাঁকে ফাঁকে দেখা যেত খড়ের চালা বা টিনের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘর। দূর থেকে মনে হতো, সবুজের সমুদ্রের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মাটির আঁচল জড়ানো কোনো শান্ত, সরল গ্রাম্য বধূ।
পুরু মাটির দেয়াল, বাঁশ–কাঠের কাঠামো, খড় কিংবা টিনের ছাউনি আর সামনে নিকানো উঠোন–এই সামান্য উপকরণেই তৈরি হতো একটি সংসারের পৃথিবী। সে পৃথিবী ছিল ছোট, কিন্তু তার ভেতরে ছিল মানুষের আনন্দ–বেদনা, আশা–আকাঙক্ষা, উৎসব–অনুষ্ঠান আর অগণিত স্মৃতি। মাটির ঘর তাই শুধু থাকার জায়গা ছিল না; ছিল একটি পরিবারের ইতিহাসের নীরব পাণ্ডুলিপি।
আজকের প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, একটি মাটির ঘরকে ঘিরে কত জীবন, কত গল্প, কত আবেগ জমে থাকতে পারে।
এই ঘরের মেঝেতেই কোনো শিশুর প্রথম হামাগুড়ি। এই উঠোনেই তার প্রথম দৌড়। বিকেলের শেষ আলোয় ডাংগুলি, গোল্লাছুট কিংবা লুকোচুরি খেলতে খেলতে সন্ধ্যা নেমে আসা। দূরে আজানের ধ্বনি কিংবা মন্দিরের ঘণ্টা শোনা গেলে খেলা থামিয়ে ঘরে ফেরার তাড়া। বর্ষার দিনে জানালার পাশে বসে ঝুম বৃষ্টি দেখা। টিনের চালে বৃষ্টির অবিরাম ঝমঝম শব্দ শুনতে শুনতে রাত গভীর হওয়া। শীতের সকালে মাটির দেয়ালে হেলান দিয়ে রোদ পোহানো। সন্ধ্যায় কুপিবাতি বা হারিকেনের মৃদু আলোয় পড়াশোনা–এসবই ছিল একসময়ের গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ছবি।
ঘরের এক কোণে থাকত ধানের গোলা, অন্য পাশে মাটির হাঁড়ি–পাতিল। বাঁশের কুলা, চালুনি, ডালা, মোড়া কিংবা কাঠের পিঁড়ি–প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে ছিল ব্যবহারিক প্রয়োজনের পাশাপাশি এক ধরনের আপন সৌন্দর্য। বারান্দায় বসে সন্ধ্যার পর বয়োজ্যেষ্ঠরা গল্প করতেন। নাতি–নাতনিরা ঘিরে বসত। গল্পের ভেতর দিয়ে তারা চিনত পূর্বপুরুষদের, শুনত গ্রামের পুরোনো কাহিনি, জানত হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা। মাটির ঘরের সঙ্গে তাই জড়িয়ে ছিল শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি সমাজের স্মৃতি।
এই ঘর নির্মাণের মধ্যেও ছিল এক আশ্চর্য লোকজ জ্ঞান। মাটি, খড়, তুষ, বাঁশ ও কাঠ–স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ দিয়েই গড়ে উঠত ঘর। কোনো আধুনিক স্থপতির নকশা কিংবা জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন হতো না। প্রজন্মের অভিজ্ঞতাই ছিল তাদের প্রকৌশল। মাটির দেয়াল কতটা পুরু হবে, কীভাবে ভিত্তি তৈরি করতে হবে, কতটুকু শুকিয়ে পরের স্তর তুলতে হবে–এসব জ্ঞান ছিল মানুষের হাতে–কলমে অর্জিত।
মাটির ঘরের নান্দনিকতাও ছিল আলাদা। উৎসব–পার্বণের আগে বাড়ির নারীরা ঘরদোর পরিষ্কার করতেন। উঠোন নিকানো হতো, দেয়ালে দেওয়া হতো নতুন মাটির প্রলেপ। কোথাও কোথাও আঁকা হতো আলপনা। ঈদ, পূজা, বিয়ে কিংবা অন্য কোনো আনন্দের অনুষ্ঠান যেন ঘর সাজানোর মধ্য দিয়েই শুরু হতো। ঘর তখন শুধু বসবাসের জায়গা নয়–পরিবারের আনন্দেরও অংশ হয়ে উঠত। কিন্তু সময় কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।
মেঠোপথের জায়গায় এসেছে পিচঢালা রাস্তা। বাঁশের বেড়ার জায়গায় উঠেছে ইটের দেয়াল। খড়ের চালা সরিয়ে দিয়েছে ঢেউটিন; আর ঢেউটিনের জায়গাও ক্রমে দখল করছে ইট–সিমেন্টের পাকা ভবন। বিদ্যুৎ এসেছে, এসেছে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট। মানুষের জীবন অনেক সহজ হয়েছে। নিরাপদ ও টেকসই বাসস্থানের প্রয়োজনও বেড়েছে। ফলে মাটির ঘরের জায়গা সংকুচিত হওয়া এক অর্থে সময়ের স্বাভাবিক পরিবর্তন। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে একটি জীবনধারাও।
মাটির ঘরের বিলুপ্তির পেছনে আধুনিকতার আকর্ষণের পাশাপাশি রয়েছে বাস্তব কিছু কারণ–অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলাবদ্ধতা, নিয়মিত সংস্কারের প্রয়োজন এবং দক্ষ কারিগরের অভাব। নতুন প্রজন্মও স্বাভাবিকভাবেই এমন বাড়ি চায় যেখানে আধুনিক স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, পানি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা সহজে পাওয়া যায়। ফলে পুরোনো ভিটায় একের পর এক উঠে আসছে পাকা ভবন। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় মাটির ঘরের যে বিস্তৃত উপস্থিতি ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। তবু কিছু ঘর এখনো টিকে আছে।
কোনো পুরোনো ভিটায়, নতুন দালানের পাশে কিংবা বাড়ির পেছনের নির্জন আঙিনায় হয়তো এখনো দাঁড়িয়ে আছে একটি মাটির ঘর। তার দেয়ালে বয়সের রেখা, চালায় শ্যাওলা, দরজায় জীর্ণতার ছাপ। হয়তো সেখানে এখন কেউ থাকে না। তবু ঘরটি যেন নিঃশব্দে পাহারা দিচ্ছে একটি পরিবারের অতীতকে।
সেই ঘরের দিকে তাকালে মনে হয়–এই দরজা দিয়ে কত মানুষ ঢুকেছে, কত মানুষ বেরিয়েছে। এই উঠোনে কত শিশুর হাসি ছড়িয়ে পড়েছে। এই বারান্দায় কত সন্ধ্যা নেমেছে। কত মানুষ এই ঘরে জন্মেছে, বড় হয়েছে, সংসার করেছে; কেউ চলে গেছে দূর শহরে, কেউ আর ফিরে আসেনি। কিন্তু ঘরটি থেকে গেছে–একজন নীরব সাক্ষীর মতো।
তাই মাটির ঘর ভেঙে যাওয়া মানে শুধু একটি পুরোনো স্থাপনার বিলীন হয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় লোকজ স্থাপত্যের একটি অধ্যায়, হারিয়ে যায় প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত নির্মাণজ্ঞান, হারিয়ে যায় একটি বিশেষ জীবনযাপনের স্মৃতি। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির ঘরের দ্রুত বিলুপ্তির চিত্রও উঠে এসেছে।
অবশ্য সব মাটির ঘর সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। সময়কে পেছনে ফিরিয়ে নেওয়াও সম্ভব নয়। মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনকে থামিয়ে রাখার প্রশ্নও আসে না। কিন্তু ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা যায়। সংরক্ষণ করা যায় স্মৃতি, ছবি, নির্মাণপদ্ধতি ও মানুষের মুখে মুখে থাকা গল্পগুলো। ঐতিহ্যবাহী ও স্থাপত্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাটির ঘর স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা যেতে পারে। এতে একটি পুরোনো ঘর শুধু অতীতের নিদর্শন হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠবে আমাদের লোকজ জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের শিক্ষালয়। কারণ, একটি জাতির ইতিহাস শুধু রাজপ্রাসাদ, দুর্গ কিংবা বড় বড় স্থাপনার মধ্যে লেখা থাকে না। ইতিহাস লেখা থাকে সাধারণ মানুষের ঘরেও। একটি মাটির ঘর হয়তো কোনো রাজকীয় স্থাপনা নয়, কিন্তু তার দেয়ালের ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের শত বছরের গল্প। সেখানে ইতিহাস আছে শ্রমের, আছে ভালোবাসার, আছে বেঁচে থাকার সংগ্রামের।
আজ কোনো গ্রামীণ পথে হাঁটতে গিয়ে যদি হঠাৎ এমন একটি ঘর চোখে পড়ে, একটু থামা যায়। হয়তো দেয়ালের ফাটলে দেখা যাবে সময়ের দীর্ঘ পদচিহ্ন। পুরোনো দরজার দিকে তাকালে মনে হবে, এই দরজা দিয়ে একদিন কত মানুষ জীবনের পথে বেরিয়ে গেছে। নীরব উঠোনে দাঁড়ালে হয়তো বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসবে শৈশবের কোনো হাসি, সন্ধ্যার কোনো ডাক, কিংবা বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া আপনজনের কণ্ঠস্বর। ইট–পাথরের শহর যতই বড় হোক, মানুষের শেকড় শেষ পর্যন্ত মাটিতেই। সেই মাটির ঘরগুলো তাই আমাদের কাছে কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; তারা আমাদের পরিচয়েরও একটি অংশ। তারা মনে করিয়ে দেয়–আমরা কোথা থেকে এসেছি, কীভাবে আমাদের পূর্বপুরুষেরা সীমিত উপকরণে, প্রকৃতির সঙ্গে বোঝাপড়া করে, নিজেদের জন্য একটি পৃথিবী তৈরি করেছিলেন।
হয়তো একদিন শেষ মাটির ঘরটিও সময়ের ভারে মাটিতে মিশে যাবে। দরজা–জানালা খুলে নেওয়া হবে, দেয়াল ভেঙে পড়বে, উঠোনে জন্ম নেবে ঘাস। কিন্তু তার গল্প যেন হারিয়ে না যায়। কারণ একটি মাটির ঘর ভেঙে পড়া মানে শুধু একটি ঘরের পতন নয়–কখনো কখনো তা একটি প্রজন্মের স্মৃতির দরজাও চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া।
আর তাই, মাটির ঘরকে মনে রাখা মানে শুধু অতীতকে মনে রাখা নয়; নিজের শেকড়কে মনে রাখা। মাটি থেকে উঠে আসা সেই ঘরগুলো হয়তো একদিন থাকবে না। কিন্তু আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের লোকসংস্কৃতিতে, আমাদের ইতিহাসে–তাদের জন্য একটি উঠোন যেন চিরকাল খোলা থাকে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট










