ক্রিকেটে বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস

পিন্ডি থেকে সিলেট, পাকিস্তানকে ব্যাক টু ব্যাক হোয়াইটওয়াশ

ক্রীড়া প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার , ২১ মে, ২০২৬ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ

পাকিস্তানকে তাদের দেশেই হোয়াটওয়াশ করে টেস্ট সিরিজ জিতে এসেছিল বাংলাদেশ ২০২৪ সালে। সেবার দুই ম্যাচের সিরিজ ২০ ব্যবধানে জিতেছিল শান্তমিরাজরা। গতকাল বুধবার সিলেটে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্টে পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারিয়ে ব্যাক টু ব্যাক হোয়াটওয়াশের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। এতে করে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার টেস্টে জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়লো বাংলাদেশ।

ঐতিহাসিক এ জয়ের আগে গতকাল ৫ম দিনের সকালে বাংলাদেশের ভাগ্য ঘুরপাক খাচ্ছিল। কারণ পাকিস্তানের অপরাজিত ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান ছিলেন তখন ক্রিজে। ৪৩৭ রানের অসম্ভব লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান তখন লড়াই জমিয়ে তুলেছিল। ম্যাচটা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের হাত ফসকে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল। রিজওয়ান ছিলেন অবিচল। তার ব্যাটে ভর করেই পাকিস্তান দেখছিল ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন।

কিন্তু সব বদলে দিলেন বাংলাদেশের বহু যুদ্ধের নায়ক স্পিনার তাইজুল ইসলাম। উইকেটে জমে যাওয়া রিজওয়ানের সঙ্গী সাজিদ খানকে ফিরিয়ে প্রথম আঘাত হানেন এই বাঁহাতি স্পিনার। আর সেটিই যেন খুলে দেয় পাকিস্তানের পতনের দরজা। মুহূর্তেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে শেষ দিকের ব্যাটিং লাইনআপ। যে দল ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছিল, সেই দলটি সাজিদের ফেরার পর আর কোনো রানই তুলতে পারলো না। বাংলাদেশ ম্যাচ জিতে নেয় ৭৮ রানের ব্যবধানে।

ঢাকার পর সিলেটেও পাকিস্তানকে হারিয়ে সিরিজে পূর্ণ আধিপত্য দেখিয়েছে স্বাগতিকরা। এই জয়ে বিরল এক কীর্তিও গড়েছে বাংলাদেশ। টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার পাকিস্তানকে টানা দুই সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার রেকর্ড গড়লো তারা। দেশের মাটিতেও এটি পাকিস্তানের বিপক্ষে টাইগারদের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়।

৪৩৭ রানের অসম্ভব প্রায় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ৭ উইকেটে ৩১৬ রান। জয়ের জন্য শেষ দিনে দরকার ছিল আরও ১২১ রান, হাতে ছিল মাত্র ৩ উইকেট। রাতভর বৃষ্টির পর সকালে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হলেও মাত্র ১৫ মিনিট দেরিতে শুরু হয় খেলা। শুরুর সময়টা ছিল একেবারেই হতাশাজনক। নাহিদ রানার বলে বেশ কয়েকবার সুযোগ তৈরি হলেও বাংলাদেশ সুযোগগুলো নিতে পারেনি। স্বাগতিক ফিল্ডাররা ক্যাচ ছেড়েছেন বেশ কয়েক দফায়। এতে করে কোনোভাবেই উইকেট ফেলা যাচ্ছিল না। নাহিদ রানা চাপ তৈরি করলেও তাসকিন ছন্দছাড়া বোলিং করছিলেন। তার বলেই স্কোরবোর্ডে দ্রুত রান উঠছিল। পাশাপাশি মিসফিল্ডিং তো ছিলই।

৮৭ ওভারে খেলা শুরুর পর দুই পেসার দুই প্রান্ত থেকে বোলিং করছিলেন। ৯১তম ওভারে বোলিংয়ে আনা হয় তাইজুলকে। এসেই চাপ প্রয়োগ করেন অভিজ্ঞ বাঁহাতি স্পিনার। এর মধ্যেই নাহিদ দারুণ একটি সুযোগ তৈরি করেন। এই ডানহাতি ফাস্ট বোলারের উঁচুতে ওঠা বল খেলতে গিয়ে টপএজ হন সাজিদ। লিটন ও শর্ট লেগে থাকা তাইজুল দুজনই ক্যাচের জন্য ছুটেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই পৌঁছাতে পারেননি। লিটন চিৎকার করে তাইজুলকে বলছিলেন বলটার পেছনে যেতে, আর তাইজুল মনে করেছিলেন লিটনই হয়তো ক্যাচটা নেবেন। কিন্তু ক্যাচ ধরা হয়নি কারো পক্ষেই।

এমন সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পর দুই প্রান্ত থেকে নাহিদ ও তাইজুল চাপ বাড়াতে থাকেন। এই সময় অধিনায়ক শান্ত ব্যথা পাওয়ায় কিছুক্ষণের বিরতি নেওয়া হয়। এই সময়টাতেই মোমেন্টাম চলে আসে বাংলাদেশের পক্ষে। ম্যাচের ৯৬তম ওভারে আসে সাফল্য। তাইজুলের করা অফ স্টাম্পের বাইরে পিচ করে বেরিয়ে যাওয়া বল পা বাড়িয়ে ডিফেন্স করতে চেয়েছিলেন সাজিদ। পুরোপুরি বলের লাইনে যেতে পারেননি। তাতেই ব্যাটের কানা ছুঁয়ে জমা পড়ে প্রথম স্লিপে দাঁড়ানো নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে। ভেঙে যায় ৭৪ বলে ৫৪ রানের ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা পাকিস্তানী জুটি।

এরপর প্রথমবারের মতো আক্রমণে এসেই সাফল্য পান শরিফুল ইসলাম। এক প্রান্ত আগলে রাখা মোহাম্মদ রিজওয়ানকে বিদায় করে জয়ের পথটা নিশ্চিত করে ফেলেন এই পেসার। শরিফুলের প্রথম বলেই অফ স্টাম্পের বাইরের বল জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাট চালান রিজওয়ান। গালিতে চমৎকার ক্যাচ নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। আউট হয়ে যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না পাকিস্তানের এই ব্যাটারের। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্ট করে ধীরপায়ে ড্রেসিংরুমের পথ ধরেন তিনি। ১৬৬ বলে ১০ চারে ৯৪ রান করে বিদায় নেন স্বপ্ন দেখা এই উইকেটকিপারব্যাটার।

পরের ওভারেই তাইজুল খুররাম শাহজাদকে তুলে নিয়ে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করে ফেলেন। তাইজুলকে ছক্কা মেরে ব্যবধান কমাতে চেয়েছিলেন খুররাম শাহজাদ। কিন্তু ওয়াইড লংঅনে চমৎকার ক্যাচ নিয়ে তানজিদ হাসান সাজঘরের পথ দেখিয়ে দেন খুররামকে। তাইজুলের ৬ উইকেটের দারুণ বোলিংয়ে জয় পায় বাংলাদেশ। নাহিদ রানা ২টি, মিরাজ এবং শরিফুল ১টি করে উইকেট নেন। ৯৭.২ ওভারে ৩৫৮ রানে থামে পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংস।

প্রথম ইনিংসে পাকিস্তান করেছিল ২৩২ রান। তার আগে বাংলাদেশ ১ম ইনিংসে ২৭৮ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৯০ রান সংগ্রহ করেছিল। সিলেট টেস্টে ম্যাচ সেরা হন বাংলাদেশের লিটন দাস। প্লেয়ার অব দ্যা সিরিজ নির্বাচিত হন বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধট্যাক্সের ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেব না : মেয়র
পরবর্তী নিবন্ধব্যাটারি রিকশা চালকের ধাক্কায় পড়ে গিয়ে আহত সেই কনস্টেবলের মৃত্যু