কোরবানি মুসলমানদের একটি পবিত্র উৎসব এবং মহান ইবাদত। এটি ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, প্রয়োজনীয় ও উপকারী বিধান। কোরবানির সঙ্গে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন বহু উপকারিতা জড়িত। এটি শুধু একটি সামাজিক রীতি নয় বরং মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কোরবানি শব্দটির উচ্চারণেই ভেসে আসে আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহান আহ্বান। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচার নয় বরং একজন মুমিন বান্দার ইমানের বহি:প্রকাশ এবং তার অভ্যন্তরীণ খোদাভীতি আত্মনিবেদন ও ত্যাগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার আশায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত কোরবানির নিয়তে উট গরু–মহিষ ও ছাগল–ভেড়া জবাই করাই হলো কোরবানি। আর এ পশুর পশম যতবেশিই হোক না কেন প্রতিট পশমের বিনিময়ে রয়েছে একটি করে সওয়াব। হাদিসে পাকে এসেছে–হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন সাহাবায়ে কেরাম একদিন নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই কোরবানি কী? নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন এটা তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এর সুন্নাত (রীতিনীতি)। তাঁকে আবারো জিজ্ঞাসা করা হলো হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এতে আমাদের কি ফজিলত (পূণ্য রয়েছে)? নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন (কোরবানির জন্তুর) প্রতিটি লোমের (পশমের) পরিবর্তে (একটি করে) নেকি রয়েছে। তাঁরা আবারো জিজ্ঞাসা করলেন পশম বিশিষ্ট পশুর বেলায় কী হবে ? (পশুর তো পশম অনেক বেশি)। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন পশমওয়ালা পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তেও একটি করে নেকি রয়েছে। সুবহানাল্লাহ!
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দোয়ার ফসল হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম। তিনি আল্লাহর কাছে নেক সন্তানের দোয়া করেছিলেন। আল্লাহতাআলা তাঁর এ দোয়া কবুল করে সহনশীল এক ছেলে সন্তান দান করেছিলেন। যিনি হলেন হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম। কুরআনুল কারিমে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দোয়া কবুল হওয়া এবং এ সন্তানকে কুরবানি দেয়ার নির্দেশ ও ঘটনা সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ.) এর এই কাজকে তাঁর প্রেমের প্রতীক হিসেবে কিয়ামত পর্র্যন্ত অনুসরণীয় আদর্শ সাব্যস্ত করেছেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহতাআলা বলেন আর আমি একে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। ইবরাহিমের প্রতি শর্ান্তি বর্ষিত হোক। (সুরা সাফফাত : ১০৮–১০৯) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলিম জাতির জন্য সৌভাগ্যের পুরস্কার স্বরূপ বছরে দুটি ঈদ দিয়েছেন তার একটি ঈদুল ফিতর আরেকটি হলো ঈদুল আজহা। সারা বিশ্বে মুসলমানরা হিজরী বর্ষের দ্বাদশ মাস জিলহজ্বের ১০ তারিখে ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ উদযাপন করে। আরবের অনেক দেশে একে বড় ঈদ বা ঈদুল কুবরাও বলা হয়ে থাকে। অন্যান্য দেশেও এর নিজস্ব ভিন্ন নামও রয়েছে তবে এর অর্থ ও তাৎপর্য অভিন্ন। মহান আল্লাহতায়ালার আদেশে হযরত ইবরাহীম (আ.) এর নিজ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) কে আল্লাহর জন্য কুরবানী করার ইচ্ছা ও ত্যাগের কারণে সারা বিশ্বের মুসলমানেরা আল্লাহর কাছে নিজেদের সোপর্দ করে দেয়ার লক্ষ্যে পবিত্র হজ্বের পরের দিন ঈদুল আযহা উদযাপন ও পশু কুরবানী করে থাকে। আল্লাহতায়ালা হযরত ইবরাহীম (আ.) এর আনুগত্যে সন্তুষ্ট হন এবং পুত্রের পরিবর্তে তাকে পশু কুরবানী করার নির্দেশ দেন। ইবরাহীম (আ.) এর সে সুন্নাত অনুসরণে ঈদুল আযহার সময় মুসলমানরা পশু কুরবানী করেন।
জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত দিনে রোজা পালন করা রাতে বেশি বেশি ইবাদত করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন জিলহজের ১০ দিনের ইবাদত আল্লাহর কাছে অন্য দিনের ইবাদতের তুলনায় বেশি প্রিয় ওই সময়ের প্রতিদিনের রোজা এক বছরের রোজার ন্যায় আর প্রতি রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের ন্যায় মর্যাদাপূর্ণ। ঈদের দিনের আমল হলো খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা ফজরের নামাজ মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করা, সকালে গোসল করা মিসওয়াক করা, সম্ভব হলে নতুন জামা কাপড় পরিধান করা, আতর–সুগন্ধি ব্যবহার করা, ঈদগাহে এক রাস্তায় যাওয়া এবং অন্য রাস্তায় ফিরে আসা।
আসা–যাওয়ার সময় তকবির (আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ) বলা খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা। কোরবানি নামাজের মতো স্বাতন্ত্র ইবাদত। কোরআন–সুন্নাহর আলোকে কোরবানির গুরুত্ব ফজিলত ও সাওয়াব অনেক বেশি। আর এটা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নাত হওয়ার কারণেই নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তা পালন করেছেন। সে কারণে তা উম্মতে মুহাম্মাদির সামর্থ্যবানদের জন্যও আদায় করা আবশ্যক। ঈদুল আজহা যা কোরবানির ঈদ নামে পরিচিত এটা মূলত সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের এক স্মৃতিচারণ। এদিন মুসলিম উম্মাহ সর্বজনীনভাবে কোরবানি পালন করে থাকে। এটি শুধু নিছক পশু জবাই নয় বরং অন্তরের অহংকার গুনাহ এবং আত্মকেন্দ্রিকতার পশুত্বের জবাই করার শপথ। সকল সম্প্রদায়ের জন্য আমি কোরবানির বিধান দিয়েছি তিনি (আল্লাহ) তাদের জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। (সুরা–২২–হজ–আয়াত : ৩৪) হে নবী! (সা.) আপনি আপনার রবের উদ্দেশে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন। (সুরা–১০৮–কাউছার : আয়াত : ২) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে কাছে না আসে। মুসলিম উম্মাহ একমত যে কুরবানি কুরআন–সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে কুরবানি ওয়াজিব নাকি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এ বিষয়ে ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক আলেম সামর্থ্যবানদের জন্য কুরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন, আবার অনেক সাহাবি, তাবেঈ ও তাবে–তাবেঈ একে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
কুরবানি শুধু পশু জবাই নয়; এটি আত্মত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান শিক্ষা। এর মাধ্যমে মানুষ অহংকার, স্বার্থপরতা ও গুনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা পায়। তাই কুরবানির বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ মানুষের চেহারা বা সম্পদের দিকে নয়; বরং অন্তর ও আমলের দিকে দৃষ্টি দেন। তাই কুরবানির আগে নিয়ত শুদ্ধ করা প্রয়োজন। কুরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা সুন্নত এবং মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কোরবানির মধ্যে ইহকালীন এবং পরকালীন অনেক উপকারিতা এবং লাভ রয়েছে। সুতরাং কোরবানি আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।












