কোরবানিতে পছন্দের শীর্ষে ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া 

বৃহস্পতিবার , ৮ আগস্ট, ২০১৯ at ৯:৩১ অপরাহ্ণ
183

চট্টগ্রামের মানুষের কাছে কোরবানিতে প্রথম পছন্দ ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’। এই গরুকে চট্টগ্রামের বিশেষ জাতের লাল বিরিষও বলা হয়ে থাকে। কেউ কেউ অষ্টমুখী লাল গরুও বলে থাকে।

আকারে ছোট হলেও দেখতে সুন্দর ও সতেজ হওয়ায় পছন্দের তালিকায় সবসময় শীর্ষে থাকে আদি জাতের গরু ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনের কাছে এ জাতের গরু সবচেয়ে প্রিয়।

যারা লাল গরু পছন্দ করেন তাদের ক্ষেত্রে তো কথাই নেই কারণ ‘রেড চিটাগং ক্যাটল‘র অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দেখতে লাল বর্ণের। তবে সবার পছন্দের এই গরু বাজারে মিলছে কম। দেশি-বিদেশী নানা জাতের গরুর ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের একমাত্র এ জাতটি।

খামারি ও গৃহস্থদের অসচেতনতার ফলে ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’র সাথে দেশি-বিদেশী জাতের বীজের সংকরায়নের কারণে ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে অষ্টমুখী এই লাল বিরিষ।

কিছু কিছু খামারি ও কৃষক এখনো ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ মোটাতাজা করে থাকে। এবার চন্দনাইশ এবং সাতকানিয়ার কিছু খামারি ও কৃষক ‘রেড চিটাগং’ মোটাতাজা করেছে বলে জানা গেছে।

তবে সুখবর হলো চট্টগ্রামের বিশুদ্ধ এ জাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ প্রাণী সম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউট। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আইডিএফ’র মাধ্যমে সাতকানিয়া, চন্দনাইশসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’র প্রদর্শনী খামার করা হয়েছে। এসব খামারের মাধ্যমে ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’র বিশুদ্ধ প্রজনন এবং জাতকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করা হচ্ছে।

সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশে বিভিন্ন হাট-বাজার এবং খামার পরিদর্শন করে দেখা যায়, এখনো কেউ কেউ ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ লালন-পালন করছেন। গ্রামের কৃষক এবং কিছু সৌখিন খামারি দেশি-বিদেশী অন্যান্য জাতের গরুর সাথে এ জাতের গরুটিও মোটাতাজা করেছেন। সংখ্যায় কম হলেও হাট-বাজারে এই জাতের গরু আসতে দেখা যাচ্ছে। কোরবানির বাজারে লোকজনের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে জাতটি। ফলে এ জাতের গরু মোটাতাজাকারীরা দামও পাচ্ছেন ভালো।

সাতকানিয়া পৌরসভার ছিটুয়া পাড়ার বাসিন্দা ও খামারি আবদুল মান্নান বলেন, “আসন্ন কোরবান উপলক্ষে আমি মোট ১৭টি গরু মোটাতাজা করেছি। এরমধ্যে ২টি ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ রয়েছে। ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ দেখতে লাল ও সুন্দর হওয়ায় বাজারে সবার নজরে পড়ে। স্থানীয় বাজারে এই জাতের গরুর চাহিদা বেশি। ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ চট্টগ্রামের জাত হলেও বাজারে পাওয়া যায় কম। কোরবানির বাজারে ব্যাপক চাহিদার কথা মাথায় রেখে অধিক হারে মোটাতাজা করতে চাইলেও এই জাতের গরু সংকট থাকায় তা সম্ভব হয় না।”

তিনি জানান, বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে গত ৬-৭ মাস আগে কেরানীহাট থেকে ‘রেড চিটাগং’ জাতের ২টি গরু নিয়েছিলেন তিনি। এসময়ের মধ্যে রেড চিটাগং ২টির কোনো ধরনের রোগ হয়নি। খাবারও স্বাভাবিক। দেখতে অনেক সুন্দর ও মোটাতাজা হয়েছিল। গরু ২টি ইতিমধ্যে বিক্রিও করে দিয়েছেন। বেশ ভালো লাভ হয়েছে। আগামীতে তিনি আরো অধিক হারে ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ পালন করবেন। অন্যান্য যেকোনো জাতের গরুর চেয়ে ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ লালন-পালন সহজ ও বাজারে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।

সাতকানিয়ার উত্তর ছদাহা এলাকার লোকমান হাকিম জানান, ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ নামের লাল রঙের গরুগুলো দেখতে খুব সুন্দর এবং মাঝারি আকৃতির হয়। এ জাতের গরুর মাংসে চর্বিও তুলনামূলক কম। মাংস সুস্বাদু হওয়ায় সবাই খেতেও চায়। ফলে কোরবানিতে তার প্রথম পছন্দ রেড চিটাগং।

তিনি বলেন, ‘কোরবানির সময় বাজারে আমি প্রথমে এই জাতের গরু খুঁজি। বাজারে পাওয়া গেলে দাম কিছুটা বেশি হলেও নিয়ে নিই। এবারেও ইচ্ছা ছিল রেড চিটাগং দিয়ে কোরবানি করার। আর ইতিমধ্যে গ্রামের এক কৃষকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা দিয়ে রেড চিটাগং ক্যাটল জাতের গরু পছন্দ করে নিয়ে নিয়েছি। শুনেছি এটি নাকি আমাদের চট্টগ্রামের জাত।’

সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের দুর্লভের পাড়ায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আইডিএফ কর্তৃক পরিচালিত ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ প্রদর্শনী খামারের ব্যবস্থাপক রেজউল করিম জানান, ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ পালনে অনেক সুবিধার দিক রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, মাংসে চর্বি কম হওয়ায় সবাই খেতে পারে, অন্যান্য জাতের গরুর তুলনায় মাংসের স্বাদ বেশি, লালন-পালনে খরচ কম, শারীরিকভাবে বেশ শক্তিশালী, সহজে পোষ মানানো যায়, রোগ বালাই কম, আবহাওয়ার সাথে সমঞ্জস্যপূর্ণ, বাড়িতে কোনো যত্ন নিতে হয় না। ফলে এ জাতের গরু লালন-পালনে অধিক লাভবান হওয়া যায়।

তিনি আরো জানান, ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ জাতের গাভী অন্যান্য যেকোনো জাতের গাভীর চেয়ে অধিক বার বাচ্চা প্রসব করে। প্রতি বছর বাচ্চা দেয়। এ জাতের গাভীর দুধে চর্বি অনেক বেশি। ফলে দুধ ঘন ও সুস্বাদু হয়।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ হলো চট্টগ্রামের আদি এবং একমাত্র জাত। এ জাতের গরু মাঝারি আকৃতির হয়। গরুর রং, চোখ, চোখের ভ্রু, নাক, শিং, ক্ষুর, লেজ ও প্রজননঅঙ্গ লাল রঙের হয়। গরুর শিং তুলনামূলক ছোট ও পাতলা হয়। এ জাতের গরু দেখতে খুব সুন্দর ও শক্তিশালী হওয়ায় পছন্দের তালিকায় সবার শীর্ষে। বিশেষ করে কোরবানির বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকে। কিন্তু রেড চিটাগং জাতের গরু বাজারে খুব কম পাওয়া যায়। আমাদের দেশের খামারি ও কৃষকদের অসচেতনতার কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ দেশি-বিদেশী নানা জাতের ষাড় ও বীজের মাধ্যমে সংকরায়নের ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে চট্টগ্রামের বিশেষ জাতের এ গরু। এ গরুগুলো এখন আগের মতো খুব বেশি নেই। সাতকানিয়ার কেরানীহাট, বাজালিয়া বোমাং হাট, ছদাহা ফকির হাটসহ স্থানীয় বাজারগুলোতে কিছু ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ পাওয়া যায়। মূল উৎপত্তিস্থল চট্টগ্রামেই খুব বেশি পাওয়া যাচ্ছে না এ জাতের গরু। ফলে বাংলাদেশ প্রাণী সম্পদ গবেষনা ইন্সটিটিউট ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, পটিয়া ও আনোয়ারাসহ বিভিন্ন স্থানে কিছু প্রদর্শনী খামার করেছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আইডিএফ এসব প্রদর্শনী খামারের মাধ্যমে ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’কে উৎপত্তিস্থল চট্টগ্রাম এবং বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করছে।

চন্দনাইশ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আরিফ উদ্দিন জানান, চট্টগ্রামের মানুষের কাছে কোরবানির জন্য পছন্দের র্শীষে হলো ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ কিন্তু এ জাতের গরু এখন আর খুব বেশি পাওয়া যায় না। চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে খামার ও কৃষকদের কাছে ৫ শতাধিক ‘রেড চিটাগং ক্যাটল’ রয়েছে। এ জাতের গরু সবচেয়ে বেশি রয়েছে সাতকানিয়ায়। এছাড়া লোহাগাড়া, বাঁশখালী, পটিয়া ও আনোয়ারাসহ বিভিন্ন উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু গরু রয়েছে।

x