মহাকাশে এক বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা, যেখানে ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে বহুদূরে ভাসমান এক দানবাকার ‘ভবঘুরে’ ব্লাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের সন্ধান পেয়েছেন তারা। গবেষকরা বলছেন, তাদের এ আবিষ্কার মহাবিশ্বে দুটি ছায়াপথের সংঘর্ষ ও একীভূত হওয়ার পর দানবাকার বিভিন্ন কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে নতুন পথ তৈরি করে সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের আগের ধারণা বদলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিল’–এর একদল গবেষকের করা এ গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’–এ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট নোরিজ প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ বা টিডিই নামের এক বিরল মহাজাগতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। কোনো তারা যখন ধীরে ধীরে ভেসে গিয়ে বড় এক কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছাকাছি চলে আসে তখন এমন ঘটনা ঘটে। এ সময় কৃষ্ণগহ্বরের প্রচণ্ড অভিকর্ষ বলের টানে তারাটি মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং এক আলোর তীব্র ঝলকানি তৈরি করে। আলোকের এ প্রখর ছটাই সাধারণত অদৃশ্য হয়ে থাকা কৃষ্ণগহ্বরটিকে ক্ষণিকের জন্য দৃশ্যমান করে তোলে।
মহাকাশে এ ধরনের ঘটনা বিরল। হিসাব অনুসারে, গড়ে একটি ছায়াপথে প্রতি এক লাখ বছরে কেবল একবার এমন ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ ঘটে থাকে। গত এক দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ ধরনের শতাধিক আলোর ঝলকানি শনাক্ত করতে পারলেও সেগুলোর প্রায় সবই ঘটেছিল বিভিন্ন ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলে, যেখানে বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুসারে সবচেয়ে বড় আকারের বিভিন্ন কৃষ্ণগহ্বর অবস্থান করে। খবর বিডিনিউজের।
‘টিডিই ২০২৫এবিসিআর’ নামের নতুন আবিষ্কৃত এ ঘটনাটি ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী। ছায়াপথের কেন্দ্রের কাছাকাছি ঘটার বদলে তা কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে সংঘটিত হয়েছে। দৃশ্যমান আলোয় দেখা পাওয়া কোনো ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’–এর ক্ষেত্রে ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে এত বেশি দূরত্বের রেকর্ড এটা। এ আবিষ্কার সূর্য অপেক্ষা প্রায় ১০ লাখ গুণ ভরের এক ‘ভবঘুরে’ কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বরই প্রমাণ।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বহুকাল আগে দুটি ছায়াপথের মধ্যে সংঘর্ষ ও একীভূত হওয়ার পর এ কৃষ্ণগহ্বরটি আলাদা হয়ে গিয়েছিল।
আরেকটি সম্ভাবনা, অন্য কোনো বড় আকারের কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে শক্তিশালী অভিকর্ষীয় বলের ধাক্কায় এটা মূল ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে দূরে ছিটকে পড়েছিল। তারার মতো কৃষ্ণগহ্বর নিজস্ব কোনো আলো তৈরি করে না, যার ফলে এদের শনাক্ত করা কঠিন। সাধারণত আশপাশের বস্তুর ওপর এদের প্রভাব দেখে বিজ্ঞানীরা এদের উপস্থিতি টের পান। এ ঘটনার ক্ষেত্রে পাশ দিয়ে যাওয়া এক তারার ধ্বংস হয়ে যাওয়া যেন মহাজাগতিক এক বড় সার্চলাইটের মতো কাজ করেছে, যা ক্ষণিকের জন্য লুকিয়ে থাকা এ কৃষ্ণগহ্বরটিকে উন্মোচিত করেছে।
এ দূরহ আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের বড় তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ শনাক্ত করতে গবেষক দল ‘টিডিইস্কোর’ নামের এআই প্রোগ্রাম ব্যবহার করেছেন। ছায়াপথের কেন্দ্রমুখী গতানুগতিক অনুসন্ধান পদ্ধতির বাইরে গিয়ে কেন্দ্র থেকে অনেক দূরের অঞ্চলগুলোতে নজর দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল এ এআই সিস্টেমটিকে। ফলে প্রচলিত অনুসন্ধানে চোখ এড়িয়ে যাওয়া এ বিরল ঘটনাটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
এআই যখন এ অস্বাভাবিক আলোর ঝলকানিটি শনাক্ত করে তখন চিলিতে অবস্থিত ‘সাউদার্ন অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল রিসার্চ’ টেলিস্কোপ ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর সঠিক প্রকৃতি নিশ্চিত করেছেন। তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, উজ্জ্বল ওই স্ফুলিঙ্গটিতে বড় কৃষ্ণগহ্বরের কারণে ঘটা টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্টের সব বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। এ আবিষ্কার থেকে প্রমাণ মেলে, পৃথিবীভিত্তিক অপটিক্যাল টেলিস্কোপ দিয়েই মহাকাশের ভবঘুরে কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে বের করা সম্ভব। এ পর্যন্ত একাকী এসব কৃষ্ণগহ্বরকে নিয়ে গবেষণা করা কঠিন ছিল। কারণ পাশ দিয়ে যাওয়া কোনো তারাকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত এরা প্রায় পুরোপুরি অদৃশ্যই থেকে যায়।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, এ সন্ধান কেবল নতুন পথের সূচনা মাত্র। ‘ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি’ ও ‘আর্গাস অ্যারে’সহ নতুন বিভিন্ন পর্যবেক্ষণাগার চালু হলে প্রতি বছর শত শত বা হাজার হাজার টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট আবিষ্কৃত হবে। এ অগ্রগতি গবেষকদের আরও অনেক ভবঘুরে কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে পেতে ও কোটি কোটি বছর ধরে এগুলো কীভাবে তৈরি হয়, বড় হয় ও ছায়াপথে ঘুরে বেড়ায় তা বুঝতে সাহায্য করবে। অদৃশ্য কৃষ্ণগহ্বর উন্মোচনের পাশাপাশি মহাজাগতিক এসব শক্তিশালী বিস্ফোরণ তারার জীবনচক্র, ছায়াপথের বিবর্তন ও চরম অভিকর্ষীয় বল নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে, যে বল পৃথিবীর কোনো গবেষণাগারে তৈরি অসম্ভব। প্রতিটি নতুন টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট এ রহস্যের নতুন জট খুলছে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের লুকিয়ে থাকা ইতিহাস উন্মোচনে সাহায্য করছে।












