পবিত্র কুরআনের আলোকে শহীদের মর্যাদা:
আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম পবিত্র ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য দ্বীনের পতাকাকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে আল্লাহর পথে যারা নিহত হয় কুরআন ও হাদীসের আলোকে তাঁরা শহীদ হিসেবে পরিগণিত। শাহাদাতের মৃত্যু শ্রেষ্ঠ মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহর নিকট শহীদদের মর্যাদা অপরিসীম। এরশাদ হয়েছে, “আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলে ধারণাও করো না। প্রকৃতপক্ষে তারা জীবিত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযিকপ্রাপ্ত।”(সূরা:৩, আল–ই–ইমরান,পারা: ৪, আয়াত:১৬৯)
দ্বীনের জন্য যারা শহীদ হন তাঁরা জান্নাতী:
সমগ্র সৃষ্টি কুলের স্রষ্টা বিশ্ব বিধাতা মহান প্রভু আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, আল্লাহ কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না, তিনি তাদের সঠিক পথ দেখাবেন এবং তাদের অবস্থা সুসংহত করে দেবেন, আর সেই বেহেস্তে তাদের প্রবেশ করাবেন, যার সম্পর্কে পূর্বেই তাদের অবহিত করেছেন।” (সূরা: মুহাম্মদ–৪–৬)
হাদীস শরীফের আলোকে শহীদের মর্যাদা:
শহাদাতের মৃত্যু ও সাধারণ মৃত্যু এক নয়, মহান আল্লাহ তা’য়ালা শহীদদেরকে মৃত্যুর কঠিন কষ্ট যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যেমন দংশনে ব্যথা পায় শহীদ ব্যক্তি তেমন ব্যাথা ছাড়া নিহত হওয়ার ব্যাথা অনুভব করেনা। (তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ১৬৬৮)
জান্নাতের প্রবেশের পর শহীদগণ বারবার দুনিয়াতে আসতে চায়:
আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের দ্বীনের হেফাজতের জন্য যাঁরা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন পরকালে সুখময় জান্নাতের প্রসংশিত সম্মানজনক স্থানে তাঁরা অবস্থান করবে। তারা আনন্দ চিত্তে বারবার শাহাদাতের মর্যাদা লাভের জন্য জান্নাত থেকে দুনিয়াতে ফিরে আসার তীব্র আকাঙ্খা প্রকাশ করবে। হযরত আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, এমন কোন ব্যক্তি নেই যে জান্নাতে প্রবেশ করার পর পুনরায় দুনিয়াতে আসতে চাইবে। হ্যাঁ তাঁকে দুনিয়ার সব আসবাব পত্র দেয়া হবে। কিন্তু শহীদ ব্যতীত সে চাইবে পুনরায় দুনিয়াতে আসতে এবং দশবার আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতে কেননা সে শাহাদাতের মর্যাদা অবলোকন করেছে। (বোখারী শরীফ)
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, শপথ সে মহান সত্বার যাঁর কুদরতে আমার আত্মা ও জীবন উৎসর্গীত, আমার পরম ইচ্ছে যে, আমি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হব, পুনরায় শহীদ হবো, অতঃপর পুনরায় জীবিত হবো, অতঃপর শহীদ হবো, পুনরায় জীবিত হবো, পুনরায় শহীদ হবো, পুনরায় জীবিত হবো, শাহাদাতের অমীয় সুধা পানে ধন্য হবো। ( বোখারী শরীফ)
শহীদের ছয়টি মর্যাদা রয়েছে:
সম্মানিত নবীগণ ও সিদ্দিকীন এরপর তৃতীয় স্তরের মর্যাদার অধিকারী হলো শহীদগণ। শাহাদাতের গুরুত্ব ও শহীদের মর্যাদা প্রসঙ্গে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য হাদীস শরীফ বণির্ত হয়েছে, আল্লাহর নিকট শহীদদের ছয়টি বিশেষ মর্যাদার কথা হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে–
১.শহীদের রক্ত প্রবাহিত হওয়ার পূবেই তাঁকে ক্ষমা করা হয়।
২. শহীদ জান্নাতে নিজের ঠিকানা সরাসরি প্রত্যক্ষ করে।
৩. কবরের শাস্তি থেকে শহীদকে নিরাপদ করা হয়।
৪. কিয়ামতে কঠিন ভয়াবহতা থেকে শহীদগণ পরিত্রাণ পাবে।
৫. তাঁকে জান্নাতী পোষাক পরিধান করিয়ে পবিত্র রমনী হুরের সাথে বিবাহ দেয়া হবে।
৬. আত্মীয় স্বজনের মধ্য থেকে সত্তর জনকে জান্নাতে প্রবেশের সুপারিশ করার জন্য তাঁকে অনুমতি দেয়া হবে। (সুনানে তিরমিযী)
শহীদের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ:
মাযহাবের সম্মানিত ইমামগণ শহীদের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন, মুশরিকদের হাতে যারা নিহত হয় তাঁরা শহীদ। অথবা যুদ্ধ ময়দানে আঘাত প্রাপ্ত অবস্থায় যাদের পাওয়া যায় অথবা অন্যায়ভাবে মুসলমানরা যাকে হত্যা করেছে সে শহীদ। শহীদ দু প্রকার হাকিকী ও হুকমী। শহীদে হাকিকী তথা প্রকৃত শহীদ হচ্ছে আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীন পবিত্র ইসলামকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে নিহত হয় সে হচ্ছে শহীদ। শহীদে হুকমী কয়েক প্রকার যেমন এক বর্ণনায় পাঁচ প্রকার পাওয়া যায়। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছে করেছেন। শহীদ পাঁচ প্রকার।
মহামারী রোগে মৃত বরণকারী শহীদ, সন্তান প্রসব কালে যে নারীর মৃত্যু হয় সে শহীদ, পানিতে ডুবে মৃত্যু হলে সে শহীদ, মাটি ও দেওয়াল চাপা পড়ে মৃত্যু হলে সে শহীদ, আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যু বরণ করলে সে শহীদ। ( বুখারী শরীফ)
তিন শ্রেণির জান্নাতী:
শহীদগণ খোদা প্রদত্ত অনুগ্রহ ধন্য হয়ে রিযিক প্রাপ্ত হবেন, কবর জগতে জান্নাতী হাওয়া উপভোগ করবেন, জান্নাতের শান্তির নীড়ে অবস্থান করবেন, হযরত হানসা (রা.) বলেন আমার চাচা আসলাম ইবনে সুলাইম (রা.) আমাকে বলেছেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম কে কে জান্নাতে যাবে? তিনি এরশাদ করেন সম্মানিত নবীগণ, শহীদগণ ও নবজাত শিশুগণ জান্নাতে থাকবেন। (আবু দাউদ শরীফ)
শাহাদাত লাভের প্রার্থনা:
শাহাদাতের মৃত্যু শ্রেষ্ঠ মৃত্যু। ইসলামী জগতের দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মুমেনীন হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) সর্বদা আল্লাহর দরবারে শাহাদাতের প্রার্থনা করতেন যে, হে আল্লাহ আমাকে আপনার রাস্তায় শাহাদত নসীব করুন, এবং তোমার প্রিয় রসূলের শহর (মদীনা মুনাওয়ারায়) আমার ইন্তেকাল নসীব করুন। ( বোখারী শরীফ)
শোহাদায়ে কেরামের যিয়ারত করা সুন্নাত:
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহুদ যুদ্ধে শাহাদাত প্রাপ্ত শোহাদায়ে কেরামের কবরে যিয়ারত করতেন, তাঁদের রফঈ দরাজাতের জন্য দুআ পাঠ করতেন। উম্মতের উচিত! নবীজির আদর্শ অনুসরণে বদর যুদ্ধ, ওহুদ যুদ্ধসহ কারবালার ময়দানে শাহাদাত প্রাপ্ত ৭২ জন আহ্লে বায়তে রসূলসহ শোহাদায়ে কেরামের প্রতি ঈসালে সওয়াব করা, তাঁদের কবর ও মাজার যিয়ারত করা পুণ্যময়, বরকতময় ও উত্তম আমল হিসেবে পবিত্র হাদীস শরীফ, মাযহাবের সম্মানিত ইমামগণের আমল ও বুজুর্গানে দ্বীন আউলিয়ায়ে কেরামের আমল দ্বারা স্বীকৃত ও প্রমাণিত।
হযরত মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম তাইমী থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমল ছিল যে নবীজি প্রতি বছরের শুরুতে শহীদদের কবরের পাশে তাশরীফ নিতেন, অতঃপর বলতেন, তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক, ঐ জিনিসের বিনিময়ে যার উপর তোমরা ধৈর্য্যধারণ করেছো। অতএব তোমাদের জন্য পরকালে উত্তম ঠিকানা আছে। বর্ণনাকারী বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) হযরত ওমর (রা.) এবং হযরত উসমান রিদ্বওয়ানুল্লাহি তা’য়ালা আলাইহিম আজমাঈন প্রমুখ সাহাবাদের অনুরূপ আমলই ছিল। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৩/৫৭৩)
শহীদগণ দেহের রক্ত দিয়ে ঈমানের সাক্ষ্য দিয়ে থাকেন:
জেনে রাখুন! ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার মরুপ্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে নবীজির প্রিয় দৌহিত্র জান্নাতী যুবকদের সরদার সৈয়্যদুশ শোহাদা ইমামে আরশে মকাম তাজেদারে কারবালা হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) সহ ৭২ জন আহ্লে বায়তে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “অভিশপ্ত, ঘৃণিত ইয়াজিদের বাইশ হাজার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত বরণ করে নিজেদের দেহের রক্ত দিয়ে ঈমানের স্বাক্ষ্য দিয়ে গেলেন। অন্যায়, অসত্য, মিথ্যাচার, স্বৈরতন্ত্রের সাথে আপস করেননি। সত্য প্রতিষ্ঠার দীপ্ত শপথ ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করাই কারবালার মহান শিক্ষা। মুমীনগণ তাদের কথা ও কর্মে, নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত, দান–সাদকা ইত্যাদি সম্পাদনের মাধ্যমে ঈমানের সাক্ষ্য দিয়ে থাকেন কিন্তু শহীদগণ দেহের রক্ত ও প্রাণ উৎসর্গ করে ঈমানের পরিচয় প্রকাশ করেন। এ কারণে গোসল, কাফন ছাড়া রক্ত মাখা কাপড়সহ শহীদদের দাফন করা হয়। নিদ্রার পর অজু ব্যতীত নামায হয় না। সম্মানিত নবীগণের নিদ্রা দ্বারা অজু ভঙ্গ হয় না। শহীদদের মৃত্যুতে গোসল ওয়াজিব হয় না। (হানাফী মাযাহাবের ফিকাহর কিতাব সমূহ দ্রষ্টব্য)
হে আল্লাহ আমাদের কথায় কাজে কর্মে আমলে বিশুদ্ধ নিয়্যতে আপনার মহব্বত ও সন্তুষ্টি দান করুন। হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আপনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনুল করীমের বরকত দান করুন। কুরআনুল করীমের আয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ নসীহত দ্বারা নাজাত দান করুন। নিশ্চয়ই তিনি মহান দানশীল, রাজাধিরাজ, পূণ্যময় অনুগ্রহশীল ও দয়ালু।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।











