কলেজ জীবনের স্মৃতি

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক | শুক্রবার , ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ

সে ক’বেকার ৮৩–৮৫ সেশনের কথা। আজ থেকে ৪৩ বছর আগের কলেজ জীবনের সেই মধুময় স্মৃতি এখনও হৃদয়কে নাড়া দেয় প্রতিনিয়ত। পাহাড়বেষ্টিত ঘন ঝোপ–জঙ্গলে ভরা, সবুজ গাছপালা, বৈচিত্রময় ফুলের সমারোহের ভেতর দেখা যায় দৃষ্টিনন্দন প্রিয় আঙ্গিনা, সরকারি মহসিন কলেজ। অনেক স্যারেরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, আবার অনেকে এখনও জীবিত আছেন–তবে স্যারদের সাথে খুব একটা দেখাও হয় না, কথাও হয় না। জনা কয়েক বন্ধুদের সাথে কথা হয়–নজরুল ইসলাম মান্না (এনজিও সংস্থা পার্কের প্রধান নির্বাহী), মোঃ মফিজুর রহমান (অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম, জীবন বীমা কর্পোরেশন), মোঃ মনসুর আলী চৌধুরী (জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, লক্ষ্মীপুর), মোঃ জাকারিয়া, তৌহিদুল আনোয়ার তারেক (কানাডা প্রবাসী), রাজিব পাল (ন্যাশনাল সেল্‌স ম্যানেজার, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড), মনজুর মফিজ (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড), আলী মাহবুব মোহাম্মদ হোসেন (কমার্শিয়াল চীফ, বিএসআরএম গ্রুপ), মোহাম্মদ আলাউদ্দিন (মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক)-এ ক’জনা বন্ধুদের সাথে মাঝেমাঝে কথাপোকথন হয়। সম্ভবত দুই সেকশন মিলে আমরা ১২০ জন ছাত্র–ছাত্রী ছিলাম। অনেকে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছে। সুবেহ উদ্দিন খান বাসু নামে এক বন্ধু বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। শুনেছি সে লন্ডনে চাকুরি করে। লন্ডন সফরকালীন (২০১৪ সাল) তার ফোনে কয়েকবার কল দিয়েছিলাম কিন্তু রিসিভ করেনি। আমি থাকতাম সু–উচ্চ পাহাড়ের উপর নির্মিত অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনা মহসিন মুসলিম ছাত্রাবাসে। দু–তলা বিশিষ্ট এই ছাত্রাবাসে চল্লিশ এর অধিক ছাত্র বসবাস করত। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলো কেটেছে এই ছাত্রাবাসে। দু’বছর বসবাস করেছি এখানে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে দু’এক জনের সাথে খানিকটা মনোমালিন্য ছাড়া খুব একটা বড় ঘটনা ছাত্রাবাস জীবনে ঘটেনি। মরহুম আব্বাজান–যিনি ১৯৯০ সালের ১৫ মার্চ আমাদের ৮ ভাই–বোনকে শোকের সাগরে রেখে মহান রবের মেহমান হয়েছেন– তিনি তাঁর সন্তানকে দেখতে ছুটে আসতেন উঁচু পাহাড় বেয়ে। উঠেই যেন হাঁফিয়ে উঠতেন এই বৃদ্ধ মানুষটি। আমার বিছানায় এসে ধপাস হয়ে শুয়ে যেতেন। ক্লান্তি আর অবসাদ ওনাকে ছায়ার মতন ঘিরে রাখত। আসার সময় আম্মার বানানো নাস্তা, গ্রামীণ শাক–সবজি দিয়ে রান্না করা তরকারি, বাড়ির পুকুরের মাছের রান্না, ঘরে পালিত মুরগীর তরকারিসহ হরেক রকমের উপঢৌকন নিয়ে আসতেন শহরে বাস করা ছেলে সন্তানের জন্য। মাছ তরকারির সুগন্ধে সুবাসিত হতো ছাত্রাবাসময়। সহপাঠীরা উঁকি মারত আর তাদের জিভ বেয়ে পড়ত লালার সমুদ্র। শুধু আমার বেলায় নয়, অনেকের কাছেই তাদের পিতা–মাতা, ভাই–বোন আসতেন হরেক রকমের পসরা নিয়ে। বিএম জসিম উদ্দিন–তাঁর বড় ভাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক–এসেই জসিম এর কাছ থেকে পড়া নিতেন। না পারলে বেদম প্রহার করতেন তিনি। সেই কঠোর শাসনের দিনগুলো এখন কি শোনা যায়? ছোট ভাইকে শাসন করেন আর পড়াশুনার তাগাদা দেন কঠিন ব্যস্ততার ফাঁকে। মনে পড়ে মহেশখালীর রফিক, কক্সবাজারের বাহাদুরদের কথা। অসম্ভব রকমের হাস্যরসের কথায় ভরিয়ে তুলত বাহাদুর। দেলোয়ার–মহেশখালীর আরেক কৃতি সন্তান (আইনজীবি)-নিজের পড়ার ফাঁকে অন্যজনকে ডিস্টার্ব করা–এ যেন এক আকাশছোঁয়া স্মৃতির দুর্ভেদ্য প্রতিফলন। টেকনাফের বাসিন্দা ফরিদ ভাই (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) এর কাছ থেকে আমরা মার্শাল আর্ট শিখতাম। আমাদের ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক গোলাম মোস্তফা স্যার ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। তিনি ছিলেন ইংরেজির শিক্ষক। পরিবারসহ ছাত্রাবাসেই থাকতেন। রাজনৈতিক বিরোধ সৃষ্টি হলে তিনি প্রথমেই এসে সুন্দর সমাধান দিতেন। সিনিয়র ভাইদের মধ্যে মমতাজ ভাই, শফিক ভাই–তাদের কথা এখনও মনে পড়ে। জুনিয়রদের মধ্যে মাহবুব (নামকরা সনোলজিস্ট), মোহাম্মদুল হক মেজবাহ (নামকরা চক্ষু বিশেষজ্ঞ), আবদুস সালাম (নামকরা আবেদনবিদ)-এই ছাত্রাবাসেরই গর্বিত ছাত্র। ছাত্রাবাসের মেসে আবুল নামে এক কর্মচারী ছিল। তার কাছ থেকে ফুসলিয়ে অতিরিক্ত একটি কাপ নিয়ে ফেলতাম। কাপ মানে তরকারির বাটি। আলুর একটি টুকরো, মুরগী এক পিস অথবা দু’টুকরো গরুর মাংস–এই ছিল দুপুর অথবা রাতের খাবার। এতেই সন্তুষ্টচিত্তে খেয়ে ফেলতাম নিমিষেই। সকালের নাস্তায় দু’টি রুটি, এক বাটি ভাজি অথবা ডাল পেট ভরে যেত খুব সহসাই। হোস্টেলের নিচেই শিক্ষক কোয়ার্টারে পদার্থ বিদ্যার শিক্ষক আলোক স্যার থাকতেন পরিবারসহ। তাঁর কাছে আমরা কয়েকজন প্রাইভেট পড়তাম। অত্যন্ত গোছালোভাবে তিনি আমাদের নোট করে দিতেন এবং তা পরীক্ষায় লিখে আমরা ভালো মার্কস পেতাম। আরেকজন প্রিয় শিক্ষকের কথা না বললেই নয়, অংকের শিক্ষক তরফদার স্যার–তাঁর কাছেও আমরা প্রাইভেট পড়তাম। খ্যাতনামা গণিত শিক্ষক ছিলেন তিনি। আমাকে খুবই পছন্দ করতেন। তাঁর ছেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর শফিউল আলম তরফদার করোনায় আক্রান্ত হয়ে মহান রবের মেহমান হয়েছেন। আরেকজন রসায়ন বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর সুমঙ্গল মুৎসুদ্দি স্যার সম্ভবত এখনও বেঁচে আছেন। অনেক বছর আগে তিনি আমার চেম্বারে এসেছিলেন। এরপরে তাঁর সাথে হয়নি কোন কথা ও দেখা। অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর মোবাশ্বের আলী স্যার–অত্যন্ত রাগী ও গুরুগম্ভীর মানুষ ছিলেন তিনি। আরেকজন শিক্ষকের কথা না বললেই নয়–রাউজানের কৃতী সন্তান, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রফেসর রঞ্জিত কুমার ধর স্যার যিনি আমাদেরকে উদ্ভিদ বিদ্যা পড়াতেন। রাশভারী স্বভাবের মানুষ ছিলেন তিনি। স্যারের ক্লাস ছিল অত্যন্ত চমৎকার, গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন তিনি এবং ছাত্রদেরকে বুঝিয়ে পড়ারও অসম্ভব সক্ষমতা ছিল। তাঁর পিতা আমার হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জ্যোতিষ চন্দ্র ধর স্যার অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ ছিলেন। আরেকজন শিক্ষক যিনি প্রাণীবিদ্যার প্রদর্শক ছিলেন। অবাক ব্যাপার হল– আবদুন নূর স্যার এখনও মহসিন কলেজে শিক্ষকতা করছেন। বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তাঁর নিয়োগ আদেশ এখনও বহাল আছে। তিনি আমার দুরসম্পর্কের আত্নীয়ও বটে। স্যারও মাঝে মাঝে আমার চেম্বারে আসেন এবং ওনার মেয়েরাও চিকিৎসা নিতে আসেন। অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত স্বভাবের মানুষ আবদুন নূর স্যার। প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের মেধাতালিকায় ষষ্ঠতম স্থান অধিকার করেছিলাম আলহামদুলিল্লাহ। কিংবদন্তি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডাঃ ফজলুল কাদের স্যারের প্রিয় সন্তান শাহেদ (বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে দেখতে আসতেন প্রতিনিয়ত। তীর্থের কাকের মতন অপেক্ষা করতেন স্যার–কবে ছুটি হবে শাহেদের। ছুটি শেষে সাথে করে নিয়ে যেতেন বাসায়। চট্টগ্রামের তৎকালীন প্রথিতযশা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ছিলেন স্যার। জুনিয়র চিকিৎসকদের তিনি ছিলেন ঐ যুগের আইডল। নিত্য নতুন জামা, নিত্য নতুন পারফিউম, নিত্য নতুন স্যু পরিধান করে আসত বন্ধু শাহেদ। প্রফেসর ফজলুল কাদের স্যার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আমার পরীক্ষা নিয়েছিলেন। রেটিনা গাইড থেকে পড়া সবটুকু প্রশ্নের উত্তর আমি নিমিষেই দিয়ে দিলাম। মৌখিক পরীক্ষায় ২০ নাম্বারের মধ্যে ১৪ নম্বর পেয়েছি। আর লিখিত পরীক্ষায় ৮০ নম্বরের মধ্যে ৫১.৫ নাম্বার পেয়েছি। এস এস সি ও এইচ এস সি পরীক্ষার সর্বমোট মার্কস ছিল ১৪৬৭। ১০% হিসাব করে ১৪৬.৭ যোগ হয়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নাম্বারের সাথে যোগ হয়। আলহামদুলিল্লাহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ লাভ করেছি। মহান আল্লাহপাকের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া তিনি আজ আমাকে মানুষের সেবা করার সুযোগটা করে দিয়েছেন। আমার একমাত্র ছেলে নাজিব নূর ফারুক এ বছর (২০২৬–২০২৭ সেশন) বাবার মহসিন কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ লাভ করেছে। মহসিন কলেজের সম্মানিত প্রয়াত শিক্ষকদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। মহান রব যেন তাদেরকে জান্নাতবাসী করুন।

লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব, অধ্যাপক (ইএনটি)-অবসরপ্রাপ্ত, রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ

পূর্ববর্তী নিবন্ধযে কারণে বৌদ্ধরা আকাশমুখে ফানুস তোলে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রজ্ঞার মহীরুহের বিদায় : অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মানের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য