কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ শুরু জেন-জিদের : প্রস্তুতি কতটুকু

ফজলুর রহমান | শনিবার , ২২ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ

সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ দুই যুগের মতো সময় ধরে একটি প্রজন্ম গড়ে ওঠে। এ হিসাব সাধারণত সময়ের জন্ম নেওয়া শিশুর ওপর প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, প্রযুক্তির ক্রমবিবর্তন, বিশ্বায়ন এবং সভ্যতার উন্নয়ন, পরিসংখ্যান ও তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করেই একেকটি প্রজন্মের নামকরণ করা হয়।

যাদের জন্ম ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে হয়েছে, অর্থাৎ যে সময়টাতে প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বে নতুন সব বদলের হাওয়া বইছিল, ডট কমের সেই জোয়ারের সময়টাতে এবং ইন্টারনেটের উত্থানকালে জন্ম নেওয়া মানুষজনকেই মিলেনিয়াল বলা হয়। ওই সময়টায় জন্ম ও বেড়ে উঠার কারণে মিলেনিয়ালদের মধ্যে উদ্ভাবনী শক্তি ও সৃজনশীলতার জন্য এক ধরনের মৌলিক আগ্রহ কাজ করে। ফলে এই প্রজন্মের সদস্যরা ব্যক্তি ও কর্মজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পছন্দ করেন এবং এমন একটি চাকরি করতে চান, যাতে তাদের নিজস্ব আগ্রহ এবং মূল্যবোধের মধ্যে সুরটা কখনো কেটে না যায়।

অন্যদিকে জেন জিরা জন্ম নিয়েছেন ১৯৯৭ সালের পরে এবং জীবনের শুরুর সময় থেকেই তারা প্রযুক্তিকে কাছে পেয়েছেন। যদিও তাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বৈশ্বিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তন সংকট এবং প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নয়ন, তবু তারা মিলেনিয়ালদের চেয়ে বেশি উপভোগ্য, বিশেষ করে আরামদায়ক একটি শৈশব কাটিয়েছেন। জেনজি মানে জেনারেশন জুমার্স, তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম সুবিধা নিতে জানে এবং সারা বিশ্বে এ প্রজন্ম অভাবনীয় কিছু সাফল্য করতে সমর্থ হয়েছে বলে মনে করা হয়। জেনজিরা সাইলেন্ট প্রজন্ম, বেবি বুমার্স প্রজন্ম, অ্যানালগ প্রজন্ম, মিলিনিয়াল প্রজন্ম এবং এক্স প্রজন্ম থেকে অনেক বেশি পরিমাণে মেধামননে বুদ্ধিতে বা দক্ষতায় এগিয়ে থাকা প্রজন্ম। তারা এরই মধ্যে মেধাবী প্রজন্ম বলে পরিচিতি পেয়েছে। তারা আগেকার সব প্রজন্ম থেকে রাজনৈতিক সচেতন প্রজন্মও বটে।

যত দিন যাচ্ছে, জেন জি প্রজন্মের লোকজন আরও বেশি করে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিচ্ছেন এবং বর্তমান কর্মক্ষেত্রে আসছে বহু নাটকীয় মোড়। জেন জিদের কাজের পদ্ধতি এতটাই ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিনির্ভর যে, এতে করে সবার অতিচেনা কর্মক্ষেত্র বেশ বদলে যাচ্ছে কিংবা অন্তত তারা বদলানোর চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফোবর্স এর আভাস মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে জেনারেশন জেড বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রের প্রায় ৩০ শতাংশ দখল করবে। হতে পারে, এ প্রজন্মই আমাদের শেখাবে কর্মক্ষেত্রকে আরও সহানুভূতিশীল, আরও যোগাযোগনির্ভর এবং উন্নত করে তুলতে আমাদের কী কী করতে হবে।

অন্যদিকে মিলেনিয়ালরা, যারা কি না এরই মধ্যে কর্মজীবনের বেশ কয়েকটি বছর কাটিয়ে ফেলেছেন, তারাও এই জেন জিদের সঙ্গেই কাজ করছেন। এই দুই প্রজন্মের মিশ্র অবস্থানের ফলে কাজের জায়গাতে যেমন নতুন নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তেমনি মুখোমুখি হতে হচ্ছে অসংখ্য নতুন চ্যালেঞ্জেরও।

মিলেনিয়ালরা বেড়ে উঠেছেন গত শতাব্দীর শেষের দিকে, যখন প্রযুক্তির গতি দিন দিন বাড়ছিল। তবুও তারা ডিজিটাল ও মুখোমুখি যোগাযোগ, দুটোর মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় রাখতে পছন্দ করেন। ওদিকে জেন জি যেহেতু প্রযুক্তির সঙ্গে বেশি মাত্রায় যুক্ত এবং এ বিষয়ে তাদের দক্ষতাও অপেক্ষাকৃত বেশি, প্রায় সব ক্ষেত্রে অনলাইন যোগাযোগই তাদের কাছে প্রাধান্য পায়। নিজেদের কমফোর্ট জোন এবং নিজেদের ব্যক্তিত্বের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করাটা জেন জির আচরণের একটি বড় অংশ। আর যোগাযোগের পদ্ধতিতে থাকা এই তারতম্যের ফলে কর্মক্ষেত্রে এই দুই প্রজন্মের মধ্যে মতভেদ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।

গবেষকদের মতে, এই দুটো দলই প্রযুক্তি ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ, তা সে সামাজিক জীবনে হোক বা কর্মক্ষেত্রে। তবে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনটা আলাদা। মিলেনিয়ালরা নিজেদের ব্যক্তি ও কর্মজীবনের মধ্যে সঙ্গতি ধরে রাখতে প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। জেন জিদের কাছে প্রযুক্তি সবসময় ব্যবহার করা যায়, এমন একটি মাধ্যম। প্রযুক্তিকে তারা তাই নিজেদের কাজকে আরও দক্ষ ও দ্রুত করার একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করেন।

কর্মক্ষেত্রে উচিত হবে দুই পক্ষের শক্তিশালী দিকগুলো তুলে ধরা। এ ছাড়া আলাদা আলাদা শিখন প্রক্রিয়ার মধ্যে মিল ঘটিয়ে পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয় বৃদ্ধি করা যায়। এ ছাড়াও, মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে দুই প্রজন্মের কর্মীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতি সম্মান বাড়িয়ে তোলা সম্ভব।

জেন জি প্রজন্মের তরুণেরা এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যখন পৃথিবী পুরোপুরি বদলে গেছে। তারা বেড়ে উঠেছে অসীম ডিজিটাল সংযোগ, সামাজিক চাপ এবং ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতায়। কিন্তু কর্মক্ষেত্র বা অফিসে এসে খুঁজে পাচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। যেখানে পুরোনো নিয়ম, আনুষ্ঠানিকতা আর হায়ারার্কির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো মোটেও সহজ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, জেনজির মূল বৈশিষ্ট্য হলো তারা কর্মদক্ষতার চেয়ে বুদ্ধিমত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা কোনো ধরনের সমালোচনাকে ভয় করে না। তারা সবসময় বাস্তবসম্মত শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়।

জেনজির অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখন থেকেই তাই কর্মক্ষেত্রগুলোর উচিত এই প্রজন্ম সম্পর্কে জানাশোনা বাড়ানো, তাদের বোঝার চেষ্টা করা। যাতে করে তাদের সঙ্গে আরও ভালোভাবে কাজ করা যায়, তাদের কাছ থেকে সেরাটুকু নেওয়া যায়। কর্মক্ষেত্রগুলো যত বিকশিত হবে, যত গতিশীল হয়ে উঠবে, প্রতিষ্ঠানকে তত বেশি পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে শিখতে হবে। বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগই হতে পারে সহযোগিতার সূচনা। উচিত কাজ হলো, তাদের সঙ্গে নিয়মিত আলাপ রাখা, তাদের কাজের অগ্রগতি নিয়ে গাইড করা, ভুল করলেও শেখার সুযোগ দেওয়া। দায়িত্ব, সময় ও ফলাফলের ভারসাম্য রক্ষা করে সহযোগিতামূলক পরিবেশ গড়া গেলে প্রজন্মগত পার্থক্য দূর হয়। শুধু বেতন নয়, উন্নতির পথও দেখাতে হবে। প্রশিক্ষণ, নমনীয়তা, স্বীকৃতিএসবই হতে পারে তাদের অনুপ্রেরণার উৎস। তাদের বোঝা, তাদের সঙ্গে শেখা এবং একসঙ্গে কাজ করাই হতে পারে ভবিষ্যতের সফল কর্মসংস্কৃতির চাবিকাঠি। জেন জিদেরও এগিয়ে আসতে হবে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে। তারা চাইলে ৭০২০১০ মডেলটি শিখে নিতে পারে। নবীনদের জন্য সূত্রটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ৭০২০১০ সূত্র হলো একটি জনপ্রিয় ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও শেখার মডেল, যার মাধ্যমে সবচেয়ে কার্যকরভাবে শিখা ও পেশাগতভাবে বেড়ে উঠা যায়। মাইকেল লোমবার্দো ও রবার্ট আইচিঙ্গার কর্তৃক ১৯৯০এর দশকে তৈরি ৭০২০১০ সূত্র এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। এই সূত্র অনুযায়ী পেশাগত উন্নয়নের তিনটি মূল স্তর রয়েছে: . ৭০% বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা: প্রকল্প গ্রহণ, সমস্যা সমাধান, ছোট দল নেতৃত্ব, নতুন দায়িত্ব নেওয়া। এটাই ক্যারিয়ারের মূল চালিকা শক্তি। ২. ২০% পরামর্শ ও ফিডব্যাক: সিনিয়রদের কাছ থেকে শ্যাডো করা, নিয়মিত ফিডব্যাক নেওয়া, সহকর্মীর সঙ্গে শিখন। এটি তাড়াতাড়ি দক্ষতা বৃদ্ধির এক্সেল রোল। ৩. ১০% প্রশিক্ষণ ও কোর্স: ওয়ার্কশপ, অনলাইন সার্টিফিকেট, পড়াশোনা, ওয়েবিনার। এটি মৌলিক জ্ঞান দেয়, কিন্তু ৭০% এবং ২০% ছাড়া কার্যকর হয় না।

৭০২০১০ সূত্র ব্যবহার করার সহজ উপায় : –প্রতি সপ্তাহে একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ গ্রহণ করা (৭০%)একজন মেন্টর বা সহকর্মীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা (২০%)৩০৬০ মিনিটের কোর্স বা পড়াশোনা করা (১০%)

লেখক: উপপরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাজনৈতিক নেতৃত্বকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে