কর্ণফুলী আজ দখলে দূষণে বিপর্যস্ত। অথচ কর্ণফুলীর স্রোত, নাব্যতা ও পানি আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। এ নদীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া, নদীকে জীবন্ত রাখা দেশের সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ কর্ণফুলী বর্তমানে খুবই বিপর্যস্ত। নানাভাবে দখল হয়েছে নদী এবং এখনো হচ্ছে। গত ২১ সেপ্টেম্বও দৈনিক আজাদীতে ‘বর্জ্য থেকে কীভাবে বাঁচবে কর্ণফুলী’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং, নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং, খাল–নালা পরিষ্কার করা হলেও কোনো কিছুতেই যেন রক্ষা করা যাচ্ছে না কর্ণফুলী নদীকে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে বছরের পর বছর ধরে চলছে বিপুল অর্থের ড্রেজিং। পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরীর নালা–নর্দমা ও খাল দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য গিয়ে আবার জমা হচ্ছে নদীর তলদেশে।
নগরবাসীর অসচেতনতা, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণ কর্ণফুলী খনন করার পর প্রতিদিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে হুমকির মুখে দেশের লাইফলাইনখ্যাত এই নদী, বন্দর চ্যানেল এবং চট্টগ্রাম বন্দর।
সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও সিটি কর্পোরেশন সংগ্রহ করতে পারছে প্রায় ২ হাজার ২০০ টন। প্রায় ১ হাজার টন বর্জ্য প্রতিদিন ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব বর্জ্যের একটি অংশ রাস্তা, নালা, খাল ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। সেখান থেকে বর্জ্যের বড় একটি অংশ গিয়ে পড়ে কর্ণফুলীতে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সামপ্রতিক এক পরীক্ষায় ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অ্যামোনিয়াম ও ফসফেটের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে টিএসপি ও সিইউএফএল সংলগ্ন এলাকায় পানির মান অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এতে জলজ প্রাণী, মাছের প্রজনন এবং নদীর সামগ্রিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
এর আগে দৈনিক আজাদীতে ‘কর্ণফুলীতে বর্জ্যের স্রোত থামবে কীভাবে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণ কর্ণফুলী নদী বাসাবাড়ি ও শিল্পাঞ্চলের বর্জ্যে প্রতিদিন ভরাট হচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার মেট্রিক টন গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন এবং বন্দরের জাহাজ সংক্রান্ত বর্জ্য খাল ও নালা হয়ে কর্ণফুলীতে পড়ছে। বেশ আগের এক প্রতিবেদনে প্রতি মাসে ৬৬ হাজার টন বর্জ্য কর্ণফুলীতে পড়ছে বলে বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এর পরিমাণ আরো বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। তারা একে বলছেন ‘বর্জ্যের স্রোত’।
বিভিন্ন গবেষণা, সরকারি সংস্থার নানা উদ্যোগ, আলোচনা; কোনো কিছুতেই নদীতে আবর্জনা পড়া থামানো যাচ্ছে না। এছাড়া দখল, দূষণ তো আছেই। নদীর প্রস্থ কমেছে, নষ্ট হচ্ছে স্বাভাবিক গতি। জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে। শুধু জলজ প্রাণী কিংবা জীববৈচিত্র্য নয়, চট্টগ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্ণফুলী নদীকে বাঁচাতে হলে নগর, শিল্প ও বন্দর তিন খাতের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এক খাতে আনতে হবে। তারা আরো কিছু উদ্যোগের কথা বলেন। আর সিটি মেয়র বলছেন, ময়লা যাতে নদীতে না যায় সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এবারের প্রতিবেদনে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও প্রায় ১ হাজার টন সংগ্রহের বাইরে থাকছে। এসব বজ্যের্র একটি অংশ নালা ও খালে পড়ে শেষ পর্যন্ত কর্ণফুলীতে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবেলায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য সিটি কর্পোরেশন প্রায় ২৮৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। কিন্তু শিল্পবর্জ্য কর্ণফুলীর পানি ও তলদেশের জন্য বড় হুমকি বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্ণফুলীকে বাঁচাতে শুধু ড্রেজিং দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। নদীতে বর্জ্য প্রবেশের উৎসগুলো বন্ধ করা, নগরীর সব খাল–নালাকে বর্জ্যমুক্ত রাখা, পয়োবর্জ্যের পূর্ণাঙ্গ শোধন ব্যবস্থা চালু করা, শিল্পবর্জ্যের ইটিপি কার্যকর রাখা এবং নদীর দুই পাড়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।
নগরীর ময়লা যাতে আর কোনোভাবেই নদীতে গিয়ে না পড়ে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাজটা যদি করা সম্ভব হয়, তাহলে দূষণের কবল থেকে রক্ষা পাবে কর্ণফুলী।








