পর্ব ১
চলচ্চিত্র এবং কবিতা–উভয়ই দৃশ্য এবং অনুভূতির এক নিবিড় বুনন। সিনেমার জন্মলগ্ন থেকেই এই দুই শিল্পের মধ্যে এক রহস্যময় সম্পর্ক বিদ্যমান। অনেক চলচ্চিত্র পরিচালক কেবল সেলুলয়েডেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তারা কলম ধরেছেন কবিতার পাতাতেও। পিয়ের পাওলো পাসোলিনি, আন্দ্রেই তারকোভস্কি, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, জঁ ককতো এবং গুলজারের মতো বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকারদের জীবনে কবিতা কেবল একটি সাহিত্যিক ধারা ছিল না, বরং তা ছিল জগতকে দেখার একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি।
পিয়ের পাওলো পাসোলিনি: কবিতার ভাষাতত্ত্ব ও লৈখিক সিনেমার স্বপ্নদ্রষ্টা
ইতালীয় চলচ্চিত্রকার পিয়ের পাওলো পাসোলিনি (১৯২২–১৯৭৫) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী, কবি, ঔপন্যাসিক এবং নাট্যকার । তার শৈল্পিক যাত্রার শুরু হয়েছিল কবিতার মাধ্যমে এবং ১৯৫৪ সালে তিনি তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কবিতা সংকলন La meglio gioventù প্রকাশ করেন । পাসোলিনির কাছে সিনেমা ছিল কবিতারই একটি সমপ্রসারিত রূপ। তিনি তার বিখ্যাত প্রবন্ধ “The Cinema of Poetry” (১৯৬৫)- তে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সিনেমা মূলত গদ্যের চেয়ে কবিতার ভাষার কাছাকাছি ।
পাসোলিনির তত্ত্বে সিনেমার মৌলিক উপাদান হলো ‘ইম–সাইন’ (im-sign) বা চিত্র–চিহ্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের ভাষা যেমন নির্দিষ্ট ব্যাকরণ এবং অভিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, সিনেমার চিত্র–চিহ্নগুলো সেভাবে প্রথাগত নয়। এগুলো আসে স্বপ্ন, স্মৃতি এবং মানুষের অচেতন মনের গভীর থেকে একজন পরিচালকের কাজ হলো এই ‘নীরব বিশৃঙ্খলা’ থেকে ছবিগুলোকে তুলে এনে সেগুলোকে ব্যক্তিগত অভিব্যক্তির মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা । পাসোলিনি মনে করতেন, সিনেমা যখন কবিতার ব্যাকরণ অনুসরণ করে, তখন ক্যামেরা তার উপস্থিতি জানান দেয়–যাকে তিনি ‘মুক্ত পরোক্ষ ব্যক্তিনিষ্ঠ’ (free indirect subjective) সিনেমা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য কবিতার সংকলনগুলোর মধ্যে Le ceneri di Gramsci বিশেষভাবে পরিচিত, যেখানে তিনি তার মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইতালীয় বুর্জোয়া সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা তুলে ধরেছেন । তার এই রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তা সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে তার নির্মিত চলচ্চিত্রে। উদাহরণস্বরূপ, The Gospel According to St. Matthew (১৯৬৪) ছবিতে তিনি বাইবেলের ভাষাকে সরাসরি ব্যবহার করেছেন, যেখানে কোনো কৃত্রিম সংলাপের পরিবর্তে ইমেজের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতা ফুটে উঠেছে । এছাড়া Mamma Roma এবং Salò ছবিগুলোতে তিনি বাস্তবতার কঠোর ও কাব্যিক বয়ান দিয়েছেন, যা তাকে বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য স্থান করে দিয়েছে ।
আন্দ্রেই তারকোভস্কি: সময়ের ভাস্কর্য ও ধ্রুপদী কবিতার উত্তরাধিকার
রুশ চলচ্চিত্রকার আন্দ্রেই তারকোভস্কি (১৯৩২–১৯৮৬) বিশ্ব চলচ্চিত্রে ‘সিনেমার কবি’ হিসেবে স্বীকৃত। তারকোভস্কির কাব্যিক সত্তার মূলে ছিল তার পিতা, বিখ্যাত রুশ কবি আর্সেনি তারকোভস্কির প্রভাব । আর্সেনি তারকোভস্কির কবিতা আন্দ্রেইর বহু চলচ্চিত্রে একটি প্রধান কাঠামোগত উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ছবিগুলোকে কেবল দৃশ্যকাব্য নয়, বরং আত্মজৈবনিক এবং আধ্যাত্মিক দলিলে পরিণত করেছে ।
তারকোভস্কির শিল্পতত্ত্বের প্রধান ভিত্তি ছিল ‘টাইম–ইমেজ’ বা সময়ের ভাস্কর্য। তার বই Sculpting in Time (১৯৮৬)-তে তিনি সিনেমার ছন্দকে কেবল এডিটিং বা মন্তাজ দিয়ে বিচার না করে ফ্রেমে সময়ের চাপের (pressure of time) মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করেছেন । তিনি প্রচলিত নাট্যধর্মী গল্পের কাঠামোর চেয়ে ‘অ্যাসোসিয়েটিভ লিঙ্কেজ’ বা কাব্যিক সংযোগকে বেশি গুরুত্ব দিতেন । তার মতে, কাব্যিক যুক্তি মানুষের চিন্তার বিকাশের ধারার সঙ্গে অনেক বেশি সঙ্গতিপূর্ণ ।
তার চলচ্চিত্রের দীর্ঘ দৃশ্য (long takes) এবং ধীর গতি ছিল মূলত দর্শককে এক ধরনের ধ্যানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশল। তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র Mirror (১৯৭৫)-এ আর্সেনি তারকোভস্কির চারটি কবিতা সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে স্মৃতি ও স্বপ্নের এক নিবিড় মেলবন্ধন ঘটেছে। একইভাবে Stalker (১৯৭৯) ছবিতে প্রটাগনিস্টের মুখে তার পিতার কবিতা এবং Nostalghia (১৯৮৩) ছবিতে নির্বাসিত কবির একাকীত্ব ফুটিয়ে তুলতে কবিতার সার্থক প্রয়োগ দেখা যায় । তারকোভস্কি বিশ্বাস করতেন যে, শৈশব থেকে মানুষ যেসব স্মৃতি এবং অনুভূতি বহন করে, কবিতার মাধ্যমেই সেগুলোর প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: বাংলার নিসর্গ ও অন্তিম কাব্যিক বাস্তবতাবাদ
ভারতীয় চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (১৯৪৪–২০২১) ছিলেন অনন্য, কারণ তিনি একাধারে একজন প্রথিতযশা কবি এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত পরিচালক ছিলেন । তার শৈল্পিক যাত্রার শুরু হয়েছিল কবিতার মাধ্যমে এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি একাধিক কবিতা সংকলন প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে গভীর আড়ালে, কফিন কিম্বা সুটকেস, রোবটের গান এবং শ্রেষ্ঠ কবিতা উল্লেখযোগ্য। দাশগুপ্তের চলচ্চিত্রে কবিতার প্রভাব কেবল অলঙ্করণ নয়, বরং তা তার চিত্রভাষার মূল কাঠামো তৈরি করেছে।
দাশগুপ্তের চলচ্চিত্রে কবিতার প্রভাব এবং তার শৈল্পিক দর্শনের প্রতিফলন তার প্রতিটি কাজেই স্পষ্ট। তার বাঘ বাহাদুর (১৯৮৯) চলচ্চিত্রে লোকশিল্পের মৃত্যু এবং মানুষের অস্তিত্বের লড়াইয়ের কাব্যিক রূপ দেখা যায়, অন্যদিকে চরাচর (১৯৯৩) ছবিতে প্রকৃতি, পাখি এবং মানুষের মধ্যকার আধ্যাত্মিক বন্ধন ফুটে উঠেছে । তার সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় নিঃসঙ্গতা বা লোনলিনেস (loneliness) একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে । তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তার শৈশব কেটেছে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে, যা তাকে প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীল করে তুলেছে ।
দাশগুপ্তের চলচ্চিত্রে চরাচর বা আকাশ–জমিনের যে বিস্তার দেখা যায়, তা মূলত তার কবিতারই দৃশ্যরূপ । তিনি মনে করতেন, শব্দের মাধ্যমে যা প্রকাশ করা কঠিন, ক্যামেরার লেন্স দিয়ে সেই অব্যক্ত অনুভূতিকে মূর্ত করা সম্ভব। তার নির্মিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র যেমন লাল দরজা, উত্তরা এবং কালপুরুষ স্মৃাত ও বর্তমানের ধূসর সীমানায় এক কবির পদচারণাকেই তুলে ধরে । দাশগুপ্তের কাছে সিনেমা ছিল জীবনের অর্থ খোঁজার একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া, যেখানে শব্দের চিত্ররূপ ও চিত্রকল্পের কাব্যিকতা একীভূত হয়ে একটি বহুমুখী ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে ।
আব্বাস কিয়ারোস্তামি পারস্যের মরমীবাদ ও হাইকু–চিত্রকল্পের কারিগর
ইরানি চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামি (১৯৪০–২০১৬) তার চলচ্চিত্রের নূন্যতমবাদী (minimalist) শৈলী এবং কাব্যিক গভীরতার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত । তিনি কেবল সিনেমা বানাতেন না, তিনি ছিলেন একজন ফটোগ্রাফার এবং কবি । তার প্রকাশিত কবিতার সংকলনগুলো মূলত জাপানি হাইকুর আদলে লেখা ছোট ছোট পঙ্ক্তি, যা ইমেজের মাধ্যমে জীবনকে ব্যাখ্যা করে । কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্রে পারস্যের ধ্রুপদী কবিদের এবং আধুনিক কবি সোহরাব সেপেহরির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে ।
কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্রে কবিতার প্রভাব এবং শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি সোহরাব সেপেহরির মরমীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র Where Is the Friend’s House? (১৯৮৭)-এর শিরোনাম সরাসরি সেপেহরির একটি কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে । তার শেষ ছবি ২৪ Frames (২০১৭) এবং পরবর্তী কাজগুলোতে স্টিল ইমেজের কাব্যিক ব্যবহার তাকে ‘সিনেম্যাটিক পোয়েট’ হিসেবে অনন্য করে তুলেছে । কিয়ারোস্তামি মনে করতেন যে, কবিতা যেমন পাঠকের কল্পনার ওপর অনেক কিছু ছেড়ে দেয়, সিনেমাকেও তেমনই ‘অসমাপ্ত’ রাখা উচিত যাতে দর্শক নিজেই সেই ছবিটিকে মনে মনে সম্পূর্ণ করতে পারে।
তার চলচ্চিত্রগুলোতে প্রকৃতির শান্ত ও গভীর পর্যবেক্ষণ পারস্যের সুফিবাদকে মনে করিয়ে দেয় । যেমন The Wind Will Carry Us (১৯৯৯) ছবিতে সরাসরি কবিতার আবৃত্তি গল্পের অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে । কিয়ারোস্তামির ক্যামেরা বিশ্বকে দেখে একজন কবির দৃষ্টিতে–শান্ত, গভীর এবং সূক্ষ্ম বিস্ময় নিয়ে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিল্পী কেবল ছবি বানান না, তিনি জগতকে দেখার একটি নতুন চোখ দেন এবং দৈনন্দিন তুচ্ছ ঘটনার ভেতরেও কাব্যিক সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন ।












