দেশের শিল্প বিনিয়োগ এখন কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, জ্বালানি সংকট উচ্চ সুদহার এবং নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান কঠিন এ সময়ে এসে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবসা ও শিল্প খাতকে টিকে রাখা এখন বড় প্রয়োজন।
দেশের চলমান অর্থনীতিও বিনিয়োগের অস্থিরতার প্রভাব বিষয়ে বিডা চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুণ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা ভবনে আঙ্কটাড ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ ইমপ্লেসেনশন রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ শীর্ষক রিপোর্ট প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বিশ্ব বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে–এটি আমরা সবাই দেখছি, আমরা বারবার স্থিতিশীলতার কথা বলেছি, আর বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির জন্য স্থিতিশীলতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তা সরকারি হোক বা বেসরকারি স্থানীয় হোক বা বিদেশী বিনিয়োগ সব ক্ষেত্রেই স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা সম্ভবত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে অস্থির একটি বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ছে। এ অবস্থায় আমাদের করণীয় হলো বিদ্যমান বিনিয়োগকে সুরক্ষা দেওয়া নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং উদ্দেশ্য নির্ভর পরিকল্পনা ও শক্তিশালী বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া।
দেশের শিল্পখাতে এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বেশিরভাগ কাঁচামালের দাম বেড়েছে। জ্বালানি সংকটে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্রয়াদেশ অনুযায়ী সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে খরচ বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে শিল্প খাতের সংকট আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির সংকট বাড়বে।
শিল্পখাতের ওপর অর্থনীতির গতিশীলতা নির্ভর করে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে শিল্প খাতে খরচ বেড়েছে। শিল্প টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানি সংকট কমছে না। অনেক কারখানার মালিক শিল্প টিকিয়ে রাখতে শ্রমিক কর্মী ছাটাইয়ের মতো সহজ পথে যাওয়ার চিন্তা করছে। এতে বেকারত্ব বেড়ে যাবে। বেকারত্ব বাড়ার কারণে দেশের অর্থনীতিতে ভারসাম্য নষ্ট হবে। এসব বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে দেশের সংশ্লিষ্ট আমলারা কতটুকু দক্ষ ও সক্ষমতা রাখে সেটি এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘তারা সংকট মোকাবেলায় সহযোগিতার পরিবর্তে সংকটকে আরো কঠিন করে ফেলছে।’ অপরিণামদর্শী চিন্তা ও পরিকল্পনার ফলে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করেও ২০১৯ সাল থেকে আবাসিক, শিল্প, সিএনজি, বাণিজ্যিক স্থাপনার নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশে নতুন করে তেমন আর কোনো শিল্প কারখানা গড়ে উঠেনি। একই কারণে বিদেশী বিনিয়োগেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পথও বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি ‘রাউন্ড দ্য ক্লক’ চালানো কারখানা দিনের অর্ধেকের বেশি সময় ধরে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের পক্ষ হতে শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগের বিষয়ে বার বার আবেদন নিবেদন করেও আশানুরূপ সাড়া মিলেনি। উল্টো শিল্পে গ্যাস সংযোগকে জটিলতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আমলা নির্ভরতার কারণে গ্যাস সংযোগ দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা চরম বিপর্যয়ে পড়েছে। এতে জনগণের মৌলিক অধিকার বিপন্ন হওয়ার পথে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের চিত্র গত এক দশকে ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু দেশীয় উৎপাদন সেই হারে বাড়েনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানির উৎস সীমিত থাকায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। সব উৎস মিলিয়ে সরবরাহ কোনোভাবেই ২৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতে। অনেক শিল্পকারখানা নিয়মিত গ্যাস সংকটে পড়ছে, কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতেও গ্যাসের স্বল্পতায় ভোগান্তিতে পড়ছেন গৃহিণীরা।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাস উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল ২০১৭ সালের দিকে। সে সময় কোনো কোনো দিন দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস উৎপাদন হয়েছে। এরপর ধীর ধীরে উৎপাদন কমতে শুরু করে। বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশীয় উৎপাদন ৬০ শতাংশ কমে গেছে। সরবরাহের বাকি গ্যাস আসবে এলএনজি থেকে। এর পরিমাণ দিনে ৮০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট। পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। দেশের বেশির ভাগ বড় গ্যাসক্ষেত্র অনেক বছর ধরে উৎপাদনে থাকায় সেগুলোর মজুত ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি তুলনামূলক ধীর।
বাংলাদেশের জ্বালানি সম্ভাবনার একটি বড় অংশ রয়েছে বঙ্গোপসাগরে। কিন্তু সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় স্থবির হয়ে আছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা গভীর সমুদ্রের ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন শুরু হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে সমুদ্রের কোনো গ্যাসক্ষেত্র জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়নি। বিদেশী কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে কয়েক দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও সাড়া মেলেনি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান জোরদার না করলে ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হবে। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে। শুরুতে সীমিত পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা হলেও পরে তা দ্রুত বেড়েছে। প্রথম বছরে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ৪১ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার স্পট বাজার থেকেও এলএনজি কিনতে শুরু করে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ৫৬ কার্গো এবং স্পট বাজার থেকে ৫৩ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে।
একটি এলএনজি কার্গোতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে। পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করলে তা প্রায় ৩২৪ কোটি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সমান। অর্থাৎ একটি কার্গো এলএনজি দেশের এক দিনের চাহিদার সমানও নয়। ফলে চাহিদা পূরণে নিয়মিত এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে হয়।
এলএনজি আমদানির কারণে দেশের জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। দেশীয় গ্যাসের তুলনায় এলএনজি অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং এর দাম পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে স্পট মার্কেটে এলএনজি দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২০ থেকে ২৮ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা বছরের শুরুতে প্রায় ১০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। ফলে জ্বালানি আমদানিতে সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এক্ষেত্রে দেশের স্থলভাগ, গভীর সমুদ্র ও অগভীর সমুদ্রে দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ভোলার গ্যাসকে পরিকল্পনা অনুযায়ি ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। গ্যাস সরবরাহ এবং শিল্পে গ্যাস সংযোগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ করে নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করা এখন খুবই প্রয়োজন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনে শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা এবং নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ প্রদানে সকল প্রকার আইনি জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা মুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বৈশ্বিক কঠিন এ সময়ে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বেকারত্ব সমানো খুবই প্রয়োজন।
সরকারকে এবং সরকার সংশ্লিষ্ট সকল সময়ের কঠিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সময়োপযোগী এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। অতীতের ভুল ভ্রান্তি শুধরিয়ে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের দিকে এগিয়ে যাবার সংকল্প এখন সময়ের দাবি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক–শিল্পশৈলী।












