দীর্ঘ ১০ বছর। শিশু সন্তানের সাথে বিচ্ছিন্নতার কারণে তিলে তিলে ক্ষয় হচ্ছিল এক মায়ের হৃদয়। সন্তানের সান্নিধ্য ফিরে পেতে নানা জনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তিনি। অবশেষে চট্টগ্রামে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার (লিগ্যাল এইড) হস্তক্ষেপে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। ফিরে পেলেন সন্তানের সান্নিধ্য, এক আবেগঘন পরিবেশে ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন মা উম্মুল মো–মেনিন।
জানা যায়, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মাহামাদুল হাসানের সাথে উম্মুল মো–মেনিন এর ২০১১ সালে বিয়ে হয়। মাহামাদুল আগে থেকে যুক্তরাজ্যে ছিলেন। বিয়ের পর উম্মুল মো–মেনিনও সেখানে পাড়ি জমান। ২০১৩ সালে শিশুটির তথা সাঈদ মোহাম্মদ ফায়েজ মাহমুদের সেখানে জন্ম হয়। এর কিছুদিন পর তথা দেড় বছরের কিছু সময় পর মাহামাদুল ও উম্মুল দম্পত্তির বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সেই বিচ্ছেদের জেরে যুক্তরাজ্য আদালতের দ্বারস্থ হয় দু’জন। একপর্যায়ে আদালতের নির্দেশে তাদের দেড় বছরের শিশু সন্তানের ঠাঁই হয় একটি সোশ্যাল কেয়ারে। পরবর্তীতে সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মার দায়িত্ব বাংলাদেশে থাকা দাদির ওপর দেওয়া হয়। তবে আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, ছেলের সাথে মায়ের যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।
শুরুতে যোগাযোগ থাকলেও, সময়ের পরিক্রমায় ২০১৬ সালের শেষের দিক থেকে সেই যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সন্তানের খবর না পেয়ে এবং আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে দিশেহারা মা সবশেষে আইনের আশ্রয় নেন। গত ১৭ মে তিনি যুক্তরাজ্য থেকেই বাংলাদেশ তথা চট্টগ্রামের জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যুক্তরাজ্য আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সন্তানের সান্নিধ্য চেয়ে অনলাইনে আবেদন করেন।
আবেদনের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি আমলে নেন এবং উভয় পক্ষকে নিয়ে শুনানির আয়োজন করেন। এই শুনানির জন্য সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে ছুটে বাংলাদেশে হাজির হন ভুক্তভোগী মা। লিগ্যাল এইড অফিসে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে দীর্ঘ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা দাদি তথা প্রতিপক্ষকে যুক্তরাজ্য আদালতের পূর্বের আদেশ মেনে ছেলের সাথে মায়ের যোগাযোগ ও সান্নিধ্য নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। চট্টগ্রামের লিগ্যাল এইড অফিসের ‘স্মার্ট মেডিয়েশন রুমে’ আয়োজিত এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষ সম্মতির ভিত্তিতে একটি মধ্যস্থতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্তানুযায়ী, প্রতি মাসে একবার অনলাইনে মায়ের সাথে ছেলের কথা বলার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া, মা দেশে আসলে বা বিশেষ কোনো দিনে ছেলের সাথে দেখা করা বা উপহার পাঠানোর বিষয়েও উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। এই আইনি সহায়তার মাধ্যমে দীর্ঘ ১০ বছর পর মা ও ছেলের মধ্যকার সম্পর্কের যে দেয়াল তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে গেছে। এমন মানবিক ও আইনি সমাধানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ছেলেকে বুকে টেনে নিতে পেরে আবেগাপ্লুত মা চট্টগ্রামের লিগ্যাল এইড অফিসের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ের অফিস সহকারী এরশাদুল ইসলাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, উভয়পক্ষ বেশ কয়েকটি শর্তের ভিত্তিতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সম্মত হয়েছেন। এর মধ্যে মা ও নাবালক সন্তানের মধ্যে বিদ্যমান দূরুত্ব নিরসনে পক্ষগুলো সচেষ্ট হবেন সংক্রান্ত বিষয়টিও রয়েছে। এ মধ্যস্থতা অনুযায়ী, মা প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের শনিবার ছেলের সাথে একটি সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার অনলাইন ভিজিট করতে পারবেন। উক্ত ভিজিট সমর্থন করা এবং মায়ের সাথে বন্ডিং তৈরির জন্য বর্তমান অভিভাবকরা নাবালক শিশুকে উদ্বুদ্ধ করবেন। মা যদি দেশে এসে দেখা করতে চান সেক্ষেত্রে উভয়পক্ষ মিলে সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করবেন। বিশেষ কোন দিন বা উৎসবে মা দেশে থাকলে সরাসরি এবং দেশে না থাকলে অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময় করার এবং কোন প্রতিনিধির মাধ্যমে সন্তানের কাছে যেকোন শুভেচ্ছা উপহার পাঠাতে পারবেন। এতে অপর পক্ষের কোন আপত্তি থাকবে না। নাবালক সন্তানের সাথে মা এমন কোন বিষয়ে কথা বলবেন না যাতে বাচ্চার মানসিক ক্ষতি হয়। সন্তানের মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর যে কোন ধরণের কর্মকাণ্ড থেকে উভয়পক্ষ বিরত থাকবেন। বর্তমানে সাঈদ মোহাম্মদ ফায়েজ মাহমুদের বয়স ১৪ বছর বলেও জানান লিগ্যাল এইড সহকারী।












