শুধু ঘোষণা নয়, বাণিজ্যিক রাজধানী করতে বিনিয়োগের পরিবেশ চান অর্থমন্ত্রী

চট্টগ্রামকেন্দ্রিক আইজিএনডি উদ্যোগে ৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তার আগ্রহ এডিবির মহেশখালী-মাতারবাড়ি হবে জ্বালানি হাব

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ১২ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের। শুধু সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে বাণিজ্যিক রাজধানী তৈরি হবে না। এখানে বাণিজ্যিক পুঁজি ও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যারা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, তাদের সম্ভাবনা চিহ্নিত করে কাজে লাগানোই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (আইজিএনডি) উদ্যোগের জাতীয় অবহিতকরণ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এ সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এডিবির দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইংমিং ইয়াং। চট্টগ্রামের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনা বিনিয়োগকারীরা আসছেন, কোরিয়ান বিনিয়োগকারীদেরও আগ্রহ রয়েছে। একই সঙ্গে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষ অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এসব অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে উঠলে এর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আতিথেয়তা সেবা, আবাসনসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হবে। একইভাবে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়লে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ আরও সমপ্রসারিত হবে বলেও জানান তিনি।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে নেওয়া প্রকল্পটিকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এতে বেসরকারি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন অংশীদারদের যুক্ত করা গেলে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। অবকাঠামো ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা খাতে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের বাংলাদেশে নিয়ে এসে প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ সময় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে প্রকল্পের অংশীদার হিসেবে পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক শুধু প্রকল্প উন্নয়নের সহযোগী নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শিল্পায়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, বন্দর ও লজিস্টিকস, শিল্প, দক্ষ জনশক্তি, পর্যটন এবং ডিজিটাল খাতের উন্নয়নকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং সমন্বিত উন্নয়ন কৌশলই দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি। চট্টগ্রাম ও দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপন, গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহ বৃদ্ধি এবং নতুন এলএনজি ও এলপিজি অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, মহেশখালীমাতারবাড়িকে কৌশলগত জ্বালানি হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্দর, শিল্প ও নগর এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের অংশীদারত্ব, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং বিদেশের শ্রমবাজার উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হবে। এছাড়া মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এমএসএমই) বিকাশে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরবরাহকারীদের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং রপ্তানি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।

মূল প্রবন্ধে এডিবির দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইংমিং ইয়াং বলেন, গত মে মাসে এডিবি প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আইজিএনডি প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন এবং আগামী পাঁচ বছরে এ উদ্যোগে সর্বোচ্চ ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার বিষয়ে এডিবির আগ্রহের কথা জানান।

ইংমিং ইয়াং বলেন, বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও অন্যতম গতিশীল অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে দেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রামের উন্নয়ন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে।

স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস ও মানব উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির এই সময়ে উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থায়ন, জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা ও অংশীদারত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইজিএনডি বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপকে আরও সংযুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার একটি অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অর্থায়ন, কারিগরি দক্ষতা ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে এডিবি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ সরকারের পাশে থাকবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্ম সচিব মোস্তফা মোর্শেদ বলেন, প্রস্তাবিত উদ্যোগে চট্টগ্রাম ও দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা সমপ্রসারণ, গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহ বৃদ্ধি এবং নতুন এলএনজি ও এলপিজি অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় মহেশখালীমাতারবাড়িকে একটি কৌশলগত জ্বালানি হাব হিসেবে গড়ে তোলা, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্দর, শিল্প ও নগর এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণি, ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বক্তব্য রাখেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধ‘র’ প্রধানের সফর নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কিছু নেই : তথ্য উপদেষ্টা