বাংলাদেশে ধর্মীয় কিংবা সামাজিক উৎসব মানেই আনন্দ, সমপ্রীতি আর এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে এই আনন্দের সমান্তরালে আরেকটি নির্মম সত্য আমাদের হজম করতে হয়েছে। উৎসব এলেই এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর পকেট ভারী করার উৎসব শুরু হয়। কৃত্রিম সংকট, সিন্ডিকেট আর মজুদদারির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে যাওয়াই যেন এ দেশের অলিখিত নিয়ম। বিশেষ করে ঈদ এলেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। তবে সদ্য সমাপ্ত পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম আমাদের এক ভিন্ন এবং আশাজাগানিয়া গল্প শুনিয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ’ শুধু বাজারেই স্থিতিশীলতা আনেনি, বরং ভাঙতে শুরু করেছে উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যবৃদ্ধির সেই চেনা সংস্কৃতি।
বিশ্ব বাজারের সংস্কৃতি এখন চট্টগ্রামে :
পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে উৎসব মানেই ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ বা ‘ক্রিসমাস সেল’। মধ্যপ্রাচ্যে রমজান ও ঈদ উপলক্ষে চলে বিশেষ মূল্যছাড়ের প্রতিযোগিতা। কিন্তু আমাদের দেশে চিত্রটা ছিল ঠিক উল্টো–উৎসব মানেই যেন পকেট কাটার মহোৎসব। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নেতৃত্বে এবার সেই উল্টোরথ সোজা করার একটা চমৎকার চেষ্টা দেখা গেল। ব্যবসায়ীদের কেবল লাঠিপেটা বা জরিমানা করে নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় উদ্বুদ্ধ করে দেশে প্রথমবারের মতো চালু করা হলো ‘ফেস্টিভ সেল’। খাতুনগঞ্জ ও রিয়াজউদ্দিন বাজারের মতো দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা ঈদ উপলক্ষে স্বেচ্ছায় তিন দিনের বিশেষ মূল্যছাড়ের ঘোষণা দিলেন। এটি আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক বাঁক বদল।
সদিচ্ছা ও সক্রিয়তার যুগলবন্দী :
বাজার নিয়ন্ত্রণ কেবল যে এসি রুমে বসে বৈঠক আর পাতা জোড়া বিবৃতি দেওয়ার বিষয় নয়, তা প্রমাণ করেছে জেলা প্রশাসন। গেল ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ কর্মপরিকল্পনার আওতায় কড়া নজরদারি, ভ্রাম্যমাণ আদালত আর কাস্টমসের সাথে দ্রুত সমন্বয়–সব মিলিয়ে প্রশাসন ছিল পুরো মাসজুড়ে সক্রিয়।
সবচেয়ে বড় উদাহরণ তৈরি হয়েছিল আদার বাজারে। ঈদের মুখে যখন আদার কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় ঠেকেছিল, প্রশাসন ঘরে বসে থাকেনি। বন্দরে আটকে থাকা কনটেনার দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করে চটজলদি খাতুনগঞ্জে আদার দাম ১৪৫ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ বা হালিশহরের অসাধু সিন্ডিকেটকে যেভাবে জরিমানা ও মামলার আওতায় আনা হয়েছিল, তা ছিল একাধারে কঠোর ও সময়োপযোগী।
ব্যবসায়ী মহলের ইতিবাচক রূপান্তর :
খাতুনগঞ্জ আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের নিজস্ব খরচ থাকলেও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তাঁরা এই ছাড় দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, সঠিক নেতৃত্ব ও সমন্বয় থাকলে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও শুভ বুদ্ধির উদয় ঘটানো সম্ভব।
সাধারণের স্বস্তি ও সরকারের প্রশংসা :
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুফল ভোগ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা। যখন একজন সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে দেখে উৎসবের মুখে পণ্যের দাম না বেড়ে উল্টো কমছে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি, প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বহুগুণ বেড়ে যায়। চট্টগ্রামের এই সফল উদ্যোগটি শুধু সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটায়নি, সরকারের উচ্চপর্যায়েও দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সমপ্রতি চট্টগ্রাম সফরে এসে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও স্বীকার করেছিলেন যে, এবারের কোরবানির ঈদে দ্রব্যমূল্য অন্যান্য বছরের তুলনায় সহনীয় ছিল, কোথাও কোথাও কমেছে।
একটি অনুসরণযোগ্য মডেল :
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন যে নজির স্থাপন করল, তা কেবল একটি ঈদকেন্দ্রিক সাময়িক স্বস্তি নয়, এটি আসলে একটি ‘সফল ও অনুসরণযোগ্য মডেল’। কেবল আইন প্রয়োগ বা লাঠি ঘুরিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দূরদর্শিতা, সচেতনতা এবং প্রশাসন–ব্যবসায়ী–ভোক্তার সমন্বিত প্রচেষ্টা। উৎসব মানুষের জন্য, আর মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও ব্যবসায়ীদের যৌথ দায়িত্ব। চট্টগ্রামের এই সফল মডেলটি এখন দেশের বাকি ৬৩টি জেলাতেও ছড়িয়ে দেওয়া হোক। তবেই উৎসবের প্রকৃত আনন্দ কোনো রকম বাড়তি চাপ ছাড়াই পৌঁছে যাবে দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে।
লেখক : আবাসিক সম্পাদক , দৈনিক আমার দেশ











