চিন্তায়, কথায় এবং লেখালিখিতে আহমদ ছফা এক স্বাধীন, একক ও অনন্য সত্তা। তাঁর সাহস, বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা এবং সর্বোপরি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক সততা আমাদের অলস চিন্তার জগৎকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি এমন এক অবাধ্য ও আপসহীন আলোকবর্তিকা, যিনি কোনো দলীয় বৃত্তে বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সমীকরণে নিজেকে বন্দি করেননি। আহমদ ছফা পাঠ করা মানে কেবল কিছু বই পড়া নয়; বরং নিজের মজ্জাগত অন্ধত্ব, কুসংস্কার এবং ক্ষমতার দাসত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। তিনি আমাদের ভিন্নভাবে চিন্তা করতে শেখান, ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সত্য বলার সৎ সাহস জোগান এবং সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রকে দেখার চোখ বদলে দেন। স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে যখনই কোনো আদর্শিক ও নৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তখনই আহমদ ছফা তাঁর ক্ষুরধার লেখনী নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন সমাজের জাগ্রত বিবেক হিসেবে। আজকের একবিংশ শতাব্দীর জটিল আর্থ–সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা চারপাশের বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা আর নৈতিক স্খলন প্রত্যক্ষ করি, তখন আহমদ ছফার প্রাসঙ্গিকতা কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় থাকে না, তা হয়ে ওঠে আমাদের অস্তিত্বের ও আত্মদর্শনের এক পরম আবশ্যিক শর্ত।
আহমদ ছফার প্রাসঙ্গিকতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড ও চিন্তার স্বাধীনতা, যা আজকের চাটুকারিতা এবং দলীয়করণের যুগে এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তাঁর কালজয়ী প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’–এ তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের যে নির্মোহ ও নির্মম ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন, তা আজকের দিনেও সমানভাবে সত্য ও প্রাসঙ্গিক। ছফা অবলোকন করেছিলেন কীভাবে একদা প্রগতিশীল চিন্তাবিদেরা ক্ষমতার মধুভান্ডে ভাগ বসাতে গিয়ে নিজেদের বিবেক বন্ধক রাখেন এবং মেরুদণ্ডহীন সুবিধাবাদীতে পরিণত হন। তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছিলেন যে, যদি একটি জাতির চিন্তানেতৃত্ব ব্যর্থ ও দলকানা হয়ে পড়ে, তবে সেই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার বা মানবিকতার বিকাশ অসম্ভব। আজ যখন আমরা দেখি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীন চিন্তার চারণভূমি হওয়ার বদলে দলীয় রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে, তখন ছফার এই উক্তি আমাদের চেতনায় এক ঘনঘোর সতর্কবার্তা হয়ে ফিরে আসে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া এই আদর্শিক অবক্ষয়কে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও রসাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁর বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যঙ্গোপন্যাস ‘গাভীবৃত্তান্ত’–এ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকদের সংকীর্ণ উপদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার লোভ এবং নৈতিক দেউলিয়াত্বকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসটি আজ তিন দশক পরেও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কাঠামোর এক জীবন্ত দর্পণ। ছফা আমাদের শিখিয়েছেন যে, বুদ্ধিজীবীর প্রকৃত কাজ শাসকের বন্দনা করা নয়, বরং রাষ্ট্রের বিবেক হয়ে কাজ করা এবং শোষিত মানুষের পক্ষে সত্য উচ্চারণ করা।
ছফার প্রাসঙ্গিকতার আরেকটি গভীর দিক হলো বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট এবং তার মনস্তাত্ত্বিক খোলনলচেকে বোঝার চিরন্তন প্রয়াস। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী সমাজতাত্ত্বিক প্রবন্ধ ‘বাঙালি মুসলমানের মন’–এ তিনি এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনন ও ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক বিবর্তনকে অত্যন্ত নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। কোনো ধরনের সস্তা আবেগ বা সংকীর্ণ সামপ্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজের গঠন, বিকাশ এবং তার চিন্তাগত সীমাবদ্ধতাগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। ছফা বিশ্বাস করতেন, আমাদের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য্তএই উপাদানগুলোর সুষম সমন্বয়ের মধ্যেই আমাদের প্রকৃত জাতীয় সত্তা লুকিয়ে আছে। তিনি এমন এক স্বদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা হবে মানুষের, মানবতার এবং সামাজিক ন্যায়ের। তাঁর কাছে রাষ্ট্র কেবল কোনো ভূগোলের নাম ছিল না, তা ছিল এক আত্মিক প্রকাশ। ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ কিংবা ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’র মতো দীর্ঘ প্রবন্ধগুলোতে তিনি যে দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তা ও ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন করেছিলেন, তা আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে। ছফা আমাদের নিজস্ব শিকড়ে ফিরতে উদ্বুদ্ধ করেন, যা বিশ্বায়নের এই যুগে যেকোনো আত্মবিস্মৃত জাতির জন্য টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার।
আহমদ ছফার সাহিত্যিক প্রাসঙ্গিকতা কেবল তাঁর প্রবন্ধের তাত্ত্বিক গভীরতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা তাঁর সৃজনশীল ফিকশনের ভেতরেও সমানভাবে দেদীপ্যমান। তিনি বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমের কৃত্রিম সংকট বা অতি–রোমান্টিকতার বিপরীতে গিয়ে সাবালটার্ন বা প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকে উপন্যাসের মূল উপজীব্য করেছিলেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’ গ্রামীণ বাংলার ধর্মীয় গোঁড়ামি, দারিদ্র্য এবং তার ভেতরেও প্রবহমান মানবিক ও সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির এক অনুপম দলিল। অন্যদিকে, তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘ওঙ্কার’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রামের পটভূমিতে রচিত এক অনন্য রূপক। একজন বোবা নারীর নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়ার এবং অবশেষে আত্মদানের মাধ্যমে সেই স্বরকে গণজাগরণের স্লোগানে পরিণত করার যে আখ্যান ছফা তৈরি করেছেন, তা আসলে একটি অবদমিত ও শোষিত জাতির সমষ্টিগত রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হওয়ারই মহাকাব্যিক রূপ। এই উপন্যাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারার অধিকারই মানুষের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। এছাড়া ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ সময়ের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক টানাপোড়েনকে তিনি তুলে ধরেছেন ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসে, যেখানে যুদ্ধের রূঢ় বাস্তবতার পাশাপাশি মানুষের অস্তিত্বের সংকটও মূর্ত হয়ে উঠেছে। ছফা দেখিয়েছেন, সাহিত্যের কাজ কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টি নয়, বরং সমাজবদলের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করা।
আহমদ ছফা কেন চিরকাল প্রাসঙ্গিক, তার উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর জীবনবোধ এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের দর্শনেও। ‘পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গপুরাণ’ উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে গাছপালা, পাখি এবং প্রান্তিক মানুষেরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে একটি মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে পারে। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে ছফা এক বিকল্প জীবনদর্শন উপহার দিয়েছেন, যেখানে ক্ষমতার লোভ বা কৃত্রিম আধুনিকতার গ্রাস নেই, আছে প্রকৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং আদিম পবিত্রতা। ছফা নিজে ছিলেন এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ–না ছিলেন সংসারী, না সন্ন্যাসী; গ্রামীণ মেঠো পথে হেঁটে চলা এক স্বাধীন বাউলের মতো ছিল তাঁর জীবনযাপন। ‘যদ্যপি আমার গুরু’ গ্রন্থে তিনি তাঁর মেন্টর জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সাথে কথোপকথনের ছলে শিক্ষা, দর্শন, ইতিহাস ও রাজনীতির যে গভীর পাঠ আমাদের দিয়েছেন, তা আজও তরুণ প্রজন্মের জন্য এক শ্রেষ্ঠ জ্ঞানতাত্ত্বিক নির্দেশিকা। ছফা বেঁচে থাকতে যেভাবে তরুণদের মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, যেভাবে নিজের সমস্ত সঞ্চয় উজার করে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা একাত্তরের প্রলয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা প্রমাণ করে তাঁর চিন্তা ও কর্মের মধ্যে কোনো ব্যবধান ছিল না।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে নৈতিক নেতৃত্বের আকাল, যখন মানুষ আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতায় মগ্ন, তখন আহমদ ছফার এই আপসহীন, পরোপকারী ও মানবিক রূপটি আমাদের অবশ বিবেককে তীব্র আঘাত করে। তিনি যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছেন–ভাষার ঔপনিবেশিক দাসত্ব থেকে মুক্তি, শিক্ষার মানবিক রূপান্তর এবং গণমানুষের সার্বভৌমত্ব–সেই প্রশ্নগুলো আজও আমাদের তাড়া করে ফেরে। তাই ছফা আজ কেবল পাঠ্যসূচির কোনো মৃত লেখক নন, তিনি আমাদের চিন্তার অবাধ্য অন্তঃস্রোত, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের পাশে এক নিঃসঙ্গ শেরপার মতো দাঁড়িয়ে থাকেন এবং চিরকাল আমাদের ভিন্নভাবে বাঁচতে ও ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেন।
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক










