গৌতম বুদ্ধের জীবনের পাঁচটি স্মরণীয় ঘটনার স্মৃতিবিজড়িত আষাঢ়ী পূর্ণিমা গতকাল বুধবার চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিত হয়েছে। বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে দিনব্যাপী ধর্মীয় কর্মসূচি পালিত হয়। ভোরে ত্রিপিটকের মঙ্গলবাণী ও সূত্রপাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। পরে বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও উপোসথ শীল গ্রহণ, সংঘদান, পিণ্ডদান, ধর্মদেশনা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। দিনজুড়ে দেশ, জাতি ও বিশ্বের শান্তি এবং সকল প্রাণীর কল্যাণ কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।
বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের বিশ্বাস, এই তিথিতে সিদ্ধার্থ গৌতম মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ ও গৃহত্যাগ করেন। পরে বুদ্ধত্ব লাভের পর সারনাথে প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন, প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন এবং তাবতিংস স্বর্গে মাতৃদেবীকে ধর্মদেশনার ঘটনাও এই তিথির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এদিন থেকেই শুরু হয়েছে ভিক্ষু সংঘের তিন মাসব্যাপী বর্ষাব্রত।
নবপণ্ডিত বিহার : নগরীর নবপণ্ডিত বিহারে প্রফেসর ড. উপানন্দ মহাথেরোর সভাপতিত্বে এবং রতনানন্দ থেরোর সঞ্চালনায় দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমা উদযাপন করা হয়েছে। সকালে বুদ্ধপূজা, অষ্টপরিষ্কার ও সংঘদান অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে আশিন বুদ্ধরক্ষিত থেরোর পরিচালনায় সংক্ষিপ্ত ধ্যান–ভাবনার পর একক ধর্মদেশনা দেন উক্খট্ঠা পঞ্ঞা থেরো। পরে আষাঢ়ী পূর্ণিমার তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেন প্রকৌশলী পরিতোষ বড়ুয়া, বিনয়ভূষণ বড়ুয়া, বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি মংহ্লা চিং রাখাইন, শিক্ষক সমীরণ বড়ুয়া, স্বদেশ কুসুম চৌধুরী, অসীম বড়ুয়া মুকুল, প্রকৌশলী জয়সেন বড়ুয়া, অলক বড়ুয়া বিটু, কাজল কান্তি বড়ুয়া, রবীন্দ্র লাল বড়ুয়া, শ্যামল বড়ুয়া, প্রদীপ কুমার বড়ুয়া ও শিক্ষক তপন বড়ুয়াসহ অন্যরা।
হাটহাজারী প্রতিনিধি জানান, উপজেলার আটটি বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকার ১৪টি বৌদ্ধ বিহারে দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমা উদযাপন করা হয়েছে। ভোরে পবিত্র ত্রিপিটকের মঙ্গলবাণী ও সূত্রপাঠের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ভিক্ষু সংঘের প্রাতঃরাশ, জাতীয়, ধর্মীয় ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলন, বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও উপোসথ শীল গ্রহণ, বর্ষাসাঠিক (পরিধেয় বস্ত্র) দান, পিণ্ডদান এবং মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠিত হয়।
দুপুরে বিভিন্ন বিহারে আষাঢ়ী পূর্ণিমার তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে বুদ্ধ কীর্তন, আলোকসজ্জা এবং সন্ধ্যায় প্রদীপ পূজা ও গিলান–প্রত্যয় পূজা করা হয়। দেশ, জাতি ও বিশ্বের শান্তি, দেশের মঙ্গল–সমৃদ্ধি এবং প্রয়াত স্বজনদের নির্বাণ সুখ কামনায় বিশেষ প্রার্থনা ও পুণ্যদান করা হয়। খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমা পালিত হয়েছে। সকাল থেকে বুদ্ধপূজা, সীবলী পূজা, সংঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান, ধর্মদেশনা, সূত্রপাঠ, প্রদীপ প্রজ্বলন, শীল গ্রহণ এবং দেশ–জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও সকল প্রাণীর কল্যাণ কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকেই শুরু হয়েছে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসব্যাপী বর্ষাব্রত বা বর্ষাবাস, যা আশ্বিনী পূর্ণিমা বা প্রবারণা পূর্ণিমা পর্যন্ত চলবে। বিহারে আসা নিরানা চাকমা ও যুথিকা চাকমা বলেন, আষাঢ়ী পূর্ণিমা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি গৌতম বুদ্ধের জীবন, ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও মানবকল্যাণের শিক্ষাকে স্মরণ করার দিন। এ দিনের শিক্ষা মানুষকে অহিংসা, মৈত্রী, করুণা ও সত্যের পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে।












