একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এখন কয়েক সেকেন্ডে প্রবন্ধের খসড়া লিখে ফেলতে পারে। একজন গ্রাফিক ডিজাইনার মিনিটের মধ্যে পোস্টারের ধারণা তৈরি করছেন। একজন প্রোগ্রামার কোড লিখতে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন। আবার একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিজ্ঞাপনের লেখা, পণ্যের ছবি কিংবা গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর তৈরিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এআই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে–বাংলাদেশ কি শুধু এই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হয়ে থাকবে, নাকি একদিন নির্মাতাও হবে? প্রযুক্তির ইতিহাস বলছে, যে দেশ শুধু অন্যের উদ্ভাবন ব্যবহার করে, সে সুবিধা পায়; কিন্তু নেতৃত্ব দেয় না। নেতৃত্ব দেয় সেই দেশ, যারা প্রযুক্তি তৈরি করে, নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই খুঁজে বের করে এবং নতুন বাজার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সামনে এখন ঠিক এই চ্যালেঞ্জ।
গত এক দশকে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তার, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সিং এবং সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশ তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার বড় অংশই বিদেশে তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমরা ঈযধঃএচঞ, এবসরহর, ঈষধঁফব কিংবা গরফলড়ঁৎহবু ব্যবহার করছি, কিন্তু এ ধরনের প্রযুক্তি তৈরির দৌড়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও খুব প্রাথমিক। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। বরং এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। কারণ এআই বিপ্লব এখনও চলমান। যেসব দেশ আজ গবেষণা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করবে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অর্থনীতিতে তারাই এগিয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায়ও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সাফল্য পাচ্ছেন। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়–এই মেধা কি গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ পাচ্ছে? একটি বড় সমস্যা হলো ভাষা। আধুনিক এআই প্রযুক্তির বড় অংশ ইংরেজিকেন্দ্রিক। অথচ বাংলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষা। বাংলা ভাষাভিত্তিক মানসম্মত তথ্যভান্ডার, গবেষণা, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং ভাষা–প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। ফলে আন্তর্জাতিক এআই মডেলগুলো বাংলা বুঝলেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে ভুল করে, প্রেক্ষাপট বুঝতে পারে না কিংবা সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতা ধরতে ব্যর্থ হয়। এই সীমাবদ্ধতা দূর করার কাজ বাংলাদেশি গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য একটি বড় সুযোগ হতে পারে। তবে শুধু সফটওয়্যার প্রকৌশলীরাই এআই বিপ্লবের অংশ হবেন–এমন ভাবার কারণ নেই। চিকিৎসা, কৃষি, শিক্ষা, আইন, সাংবাদিকতা, চলচ্চিত্র, ব্যবসা–প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। একজন কৃষক ফসলের রোগ শনাক্ত করতে এআই ব্যবহার করতে পারেন, একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে সহায়তা পেতে পারেন, একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর জন্য ব্যক্তিগত শেখার পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। অর্থাৎ এআই একটি নির্দিষ্ট পেশার প্রযুক্তি নয়; এটি প্রায় সব পেশার সহকারী হয়ে উঠছে।
অবশ্য আশার পাশাপাশি সতর্কতারও কারণ আছে। যদি আমরা শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকি, তাহলে ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতেও নির্ভরশীলতাই বাড়বে। প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হওয়া সহজ, কিন্তু নির্মাতা হতে হলে দরকার গবেষণা, বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়দি নীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্পখাতের সহযোগিতা। বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে রয়েছে বহু বছরের গবেষণা ও ঝুঁকি নেওয়ার সংস্কৃতি। বাংলাদেশেও কিছু আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা বাড়ছে, বিভিন্ন স্টার্টআপ স্থানীয় সমস্যার সমাধানে এআই ব্যবহার শুরু করেছে, সরকারও দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের জন্য জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এগুলোকে আরও কার্যকর করতে হলে গবেষণায় বিনিয়োগ, ওপেন ডেটাসেট তৈরি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। তরুণদের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় বার্তা। আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কে বেশি এআই ব্যবহার করতে পারে, তা নিয়ে হবে না; বরং কে এআইকে নতুন কিছু শেখাতে পারে, নতুন সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং নতুন পণ্য তৈরি করতে পারে–সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। শুধু সফটওয়্যার ব্যবহার শিখলেই হবে না; ডেটা, অ্যালগরিদম, ভাষা–প্রযুক্তি, নৈতিকতা এবং গবেষণার ভিত্তিও শক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারের নৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। ভুয়া ছবি, ডিপফেক, ভুল তথ্য, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা কিংবা কপিরাইট–এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে প্রযুক্তির অন্ধ ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে। তাই প্রযুক্তি শেখার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখাও সমান জরুরি। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, সীমিত সম্পদ নিয়েও এই দেশের তরুণরা অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন। তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবার দ্রুুত বিস্তার তার প্রমাণ। এআইয়ের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার জন্য শুধু ব্যবহারকারী মানসিকতা নয়, উদ্ভাবকের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে, “এই প্রযুক্তি দিয়ে আমি কী করতে পারি?” “এই প্রযুক্তিতে আমি নতুন কী যোগ করতে পারি?”
এআই বিপ্লবের এই সময়ে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। আমরা চাইলে অন্যের তৈরি প্রযুক্তির গ্রাহক হয়েই থাকতে পারি। আবার চাইলে নিজেদের ভাষা, সমাজ ও বাস্তবতার জন্য নতুন সমাধান তৈরির পথেও হাঁটতে পারি। সিদ্ধান্তটি শুধু সরকারের নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানেরও নয়; এটি আজকের তরুণদেরও। কারণ আগামী দিনের ইতিহাসে হয়তো প্রশ্ন করা হবে না, বাংলাদেশ এআই ব্যবহার করেছিল কি না। প্রশ্ন করা হবে–বাংলাদেশ কি এআই যুগে নিজের স্বাক্ষর রেখে যেতে পেরেছিল?









