আধুনিক নারীর জীবনে বিয়ে কি ক্যারিয়ারের বাধা?

রাজিয়া সুলতানা | শনিবার , ২৫ জুলাই, ২০২৬ at ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ

একসময় একটি প্রচলিত কথা ছিলমেয়েদের পড়াশোনা শেষ হলেই বিয়ে। এখন সেই চিত্র বদলেছে। বাংলাদেশের অসংখ্য নারী উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, উদ্যোক্তা হচ্ছেন, গবেষণা, চিকিৎসা, গণমাধ্যম, প্রশাসন কিংবা প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। কিন্তু পরিবর্তিত এই বাস্তবতার মাঝেও একটি প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিকবিয়ে কি আধুনিক নারীর ক্যারিয়ারের পথে বাধা? প্রশ্নটির সহজ উত্তর নেই। কারণ বিয়ে নিজে বাধা নয়; বাধা হয়ে ওঠে বিয়েকে ঘিরে তৈরি সামাজিক প্রত্যাশা, পারিবারিক ভূমিকার অসম বণ্টন এবং কর্মজীবী নারী সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ধারণা।

অনেক নারী বিয়ের আগে নিজের সময়ের ওপর মোটামুটি স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু বিয়ের পর সেই স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রে ভাগ হয়ে যায়। অফিসের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে সংসারের দায়িত্ব, রান্নাবান্না, অতিথি আপ্যায়ন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাএসবের বড় অংশ এখনও নারীর কাঁধেই এসে পড়ে। সন্তানের জন্মের পর সেই চাপ আরও বেড়ে যায়। ফলে কর্মক্ষেত্রে সমান দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও নিজের উন্নতির জন্য অতিরিক্ত সময় বা শক্তি ব্যয় করা অনেক নারীর পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। সমস্যাটি বিয়ে নয়, বরং দাম্পত্যে কাজের অসম বণ্টন। এমন অসংখ্য পরিবারও আছে, যেখানে স্বামীস্ত্রী দুজনেই সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব ভাগ করে নেন। সেখানে নারীর ক্যারিয়ার থেমে যায় না; বরং আরও বিকশিত হয়। আবার এমন পরিবারও আছে, যেখানে কর্মজীবী হওয়ার পরও নারীকে প্রায় একাই সংসারের সব দায়িত্ব সামলাতে হয়। ফলে কর্মক্ষেত্রে তাঁর সম্ভাবনা ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসে।

মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছেন, একজন মানুষের পেশাগত সাফল্য শুধু মেধার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তাঁর মানসিক শক্তি, বিশ্রাম, পারিবারিক সহায়তা এবং নিজের জন্য সময় পাওয়ার ওপরও। একজন নারী যদি প্রতিদিন অফিস শেষে দ্বিতীয় একটি পূর্ণকালীন কাজের মতো সংসারের দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তাঁর ক্লান্তি, মানসিক চাপ এবং পেশাগত অগ্রগতিতে তার প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। আবার বিয়ের পর নারীদের সামনে আরেক ধরনের অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়। চাকরিতে পদোন্নতির জন্য অন্য শহরে যেতে হবে কি না, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করবেন কি না, নতুন ব্যবসায় ঝুঁকি নেবেন কি নাএসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় তাঁরা একা নিতে পারেন না। পরিবার, সন্তান, শ্বশুরশাশুড়ি কিংবা সামাজিক প্রত্যাশার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে একই পরিস্থিতিতে পুরুষদের ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন তুলনামূলক কম ওঠে। এই বৈষম্যই নারীর পেশাগত পথকে জটিল করে তোলে।

তবে অন্য একটি বাস্তবতাও রয়েছে। অনেক নারী মনে করেন, একটি সহায়ক দাম্পত্য তাঁদের ক্যারিয়ারের শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে। মানসিক সমর্থন, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং পারস্পরিক সম্মান থাকলে বিয়ে কোনো বাধা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সাফল্যের সহায়ক হয়ে ওঠে। তাই একই প্রতিষ্ঠান, একই যোগ্যতা বা একই শহরে থেকেও দুই নারীর অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। পার্থক্য তৈরি করে সম্পর্কের গুণগত মান। আধুনিক সমাজে ক্যারিয়ারকে শুধু আয়ের উৎস হিসেবে দেখা হয় না; এটি একজন মানুষের পরিচয়, আত্মসম্মান এবং সৃজনশীলতারও অংশ। তাই বিয়ের পর যদি একজন নারী ধীরে ধীরে নিজের পছন্দের কাজ ছেড়ে দেন, কিংবা প্রতিটি পেশাগত সিদ্ধান্তের আগে অপরাধবোধে ভোগেন, তাহলে ক্ষতিটা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নয়; সমাজও একজন দক্ষ পেশাজীবীর সম্ভাবনা হারায়। এ কারণেই প্রশ্নটি হওয়া উচিতনারীরা বিয়ে করবেন কি করবেন না, তা নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমাদের পরিবারগুলো কি এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারছে, যেখানে একজন নারী বিয়ের পরও নিজের স্বপ্ন, পেশা এবং ব্যক্তিসত্তাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে পারেন?

বাংলাদেশে শিক্ষিত কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে পারিবারিক মানসিকতার পরিবর্তন সব সময় সমান গতিতে এগোচ্ছে না। এখনও অনেক নারী মনে করেন, নিজের সাফল্যের চেয়ে পরিবারের শান্তি রক্ষা করা বেশি জরুরি। আবার অনেক পুরুষও সংসারের কাজকে যৌথ দায়িত্বের বদলে নারীর স্বাভাবিক কর্তব্য হিসেবেই দেখেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে নারীর কর্মজীবনের পথে অদৃশ্য বাধাগুলো থেকেই যাবে।

বিয়ে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেটি কোনো নারীর সম্ভাবনার শেষ সীমা নয়। বরং একটি সুস্থ সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত, যেখানে দুজন মানুষই একে অপরের স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেন। কারণ সফল দাম্পত্যের ভিত্তি শুধু ভালোবাসা নয়, পারস্পরিক সম্মান এবং সমান সুযোগও। শেষ পর্যন্ত তাই বলা যায়, আধুনিক নারীর জীবনে বিয়ে বাধা নয়; বাধা সেই চিন্তধারা, যেখানে নারীর স্বপ্নকে এখনও সংসারের পরে স্থান দেওয়া হয়। যে পরিবার এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, সেখানে বিয়ে ক্যারিয়ারের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়সহযাত্রী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকেলেঙ্কারিতে স্ত্রী-ই রক্ষাকবচ; দায় নাকি ক্ষমতার রাজনীতি
পরবর্তী নিবন্ধকাপ্তাই শহীদ শামসুদ্দিন বালিকা বিদ্যালয়ে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান