বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে হৃদরোগ মৃত্যুর প্রধান কারণ। বছরে ২০ মিলিয়নের বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে হৃদরোগ এখন মহামারীর পর্যায়ে। একদা পাশ্চাত্য ধনাঢ্য সমাজের বয়স্ক ও প্রধানত পুরুষদের এই রোগ বর্তমানে এদেশের ধনী–নির্ধন, মহিলা–পুরুষ, বুড়ো–বাচ্চা, পাবলিক–ভিআইপি সবাইকে নির্বিশেষে আক্রান্ত করছে। পরিবর্তিত জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস আর রোগতত্ত্বীয় বিভিন্ন রূপান্তর ফলে উন্নত বিশ্বের এই রোগ বর্তমানে বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ সমূহে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। রক্তের উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল, ধূমপানের অভ্যাস, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রাসৃষ্ট মেদবাহুল্য এই রোগ সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। এই সবই হৃদরোগের স্বীকৃত ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান, যা প্রতিরোধযোগ্য। এ বিষয়ক জ্ঞান আহরণ ও সচেতনতা হৃদরোগ প্রতিরোধের প্রথম পদক্ষেপ। তবে এক্ষেত্রে কেবল তাত্ত্বিকজ্ঞান ও সচেতনতাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন তার কার্যকর প্রয়োগ। কাজের মাধ্যমে তার সফল বাস্তবায়ন না করা গেলে তা হৃদরোগ নিবারণে সুফল বয়ে আনবে না। তাই বিশ্ব হার্ট দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যে হৃদরোগ নিবারণে হৃদয় দিয়ে অ্যাকশন (কাজ করা) এর উপর গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। প্রতিবছর এই দিনে হৃদরোগ প্রতিরোধ ও তার নিরাময়ে সারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি সাড়ম্ভরে পালিত হয়। হৃদরোগের সচেতনতামূলক র্যালি, সেমিনার আয়োজিত হয়, বিভিন্ন প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তবে উপস্থাপিত এইসব বিষয়কে কাজে পরিণত করা না গেলে এতে কাঙ্খিত সুফল লাভ হয় না। তা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ এ বর্ণিত মানসিকতাই প্রতিফলিত হয়– ‘আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না। আরম্ভর করি, কাজ করি না। যাহা অনুষ্ঠান করি, তাহা বিশ্বাস করি না। যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না। ভুরি পরিমাণ বাক্য রচনা করতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না।’ একইভাবে বিশ্ব হার্ট দিবসকে কেবল আরম্ভরে সীমাবদ্ধ না রেখে হৃদরোগ নিবারণে অ্যাক্শন (বা কর্মসাধন) এ জোর দেওয়া হয়েছে। আর সেই অ্যাকশন হতে হবে হৃদয় দিয়ে।
অ্যাকশন হৃদয় দিয়ে কেন ? ক্যারিবীয় দ্বীপ রাষ্ট্র জ্যামাইকার লেখক, নাট্যকার ও নায়িকা রাশিদা কস্তা বলেছিলেন “মানুষের কথা আসে ঠোঁট থেকে আর কাজ আসে হৃদয় থেকে।’ হৃদয় তথা হৃৎপিণ্ড মহান সৃষ্টিকর্তার এক অপূর্ব সৃষ্টি। আদিকাল থেকে তা আবেগের উৎপত্তিস্থল, ভালোবাসার উৎস, সাহসের ঠিকানা আর আত্মার আশ্রয়স্থল হিসাবে মান্য হয়ে এসেছে। হৃদয় দিয়ে মানুষের শ্রেণি বিন্যাস করা হয়েছে– ‘হৃদয়বান মানুষ’ কিংবা ‘হৃদয়হীন মানুষ’ ইত্যাদি। বড়ো বড়ো মানুষদের হৃদয়ও বড়ো। তারা সিংহ হৃদয়ের অধিকারী। সংকীর্ণমনা ও কঠোর ব্যক্তিরা হৃদয়হীন। সুখ শান্তি মানুষ হৃদয়ে তথা বক্ষস্থলেই অনুভব করে থাকে। কেউ প্রশংসা করলে হৃদয়ে শান্তি অনুভূত হয়। এভাবে হৃদয়ের স্পন্দন মানব দেহকে শুধু শরীরবৃত্ত্বীয়ভাবেই পরিচালিত করে না। তা দেহ মনের কর্মকাণ্ডকেও সমভাবে প্রভাবিত করে। তাই হৃদয় দিয়ে সম্পাদিত যে কোন উদ্যোগ ও কর্ম সাফল্যমণ্ডিত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। একইভাবে হৃদরোগ নিবারণে হৃদয় দিয়ে অ্যাকশন তাই তাৎপর্যবাহী।
অ্যাক্শনের ক্ষেত্রসমূহ: রোগতত্ত্বীয় দিক– বর্তমানে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর শতকরা ৭৫ ভাগ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ সমূহে। অসচেতনতা, নিম্ন আর্থ সামাজিক অবস্থায় তুলনামূলকভাবে কম বয়সী ব্যক্তিরা তাদের উৎপাদনশীলতার শীর্ষে অবস্থানকালে এই রোগের শিকার হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীই ব্যয় বহুল ও প্রাণঘাতি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। এটা এক বিশাল বৈষম্য। তা দূরিকরণে বৈশ্বিক পদক্ষেপ আবশ্যক।
প্রাকৃতিক দিক– প্রাকৃতিক বিভিন্ন বিপর্যয় হৃদরোগ বাড়ার কারণ হিসাবে কাজ করছে। শতকরা ২৫ ভাগ হৃদরোগের সাথে বায়ু দূষণ সরাসরি সম্পর্কিত। যান্ত্রিকযান, কলকারখানা ও গৃহস্থালি নিঃসৃত ধোয়াস্থ শুক্ষকণা (পিএম ২.৫) উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ সৃষ্টিতে অবদান রাখছে। দ্রুত নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে খেলার মাঠ, প্রাকৃতিক খোলা জায়গা, পার্ক। ফসলী জমিতে অবাধে চাষ হচ্ছে তামাক। বাড়ছে তামাক ও ধূমপানের অভ্যাস। এত দূষিত হচ্ছে বায়ু। প্রাকৃতিক খাবারের বদলে প্রক্রিয়াজাত খাবার, চর্বি, উচ্চ ক্যালরি ও ট্রান্সফ্যাট সমৃদ্ধ খাবার গ্রহনে বাড়ছে মেদবাহুল্য, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে সমানতালে।
ব্যক্তিগত দিক– আর্থিক অসংগতি, গৃহ ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, হতাশা, বৈরী সামাজিক পরিস্থিতি, অলস জীবনযাত্রা আর অপর্যাপ্ত মেডিকেল চেকআপ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ঝুঁকি সনাক্ত হচ্ছে অনেক বিলম্বে। আর্থিক দৈন্য, অসচেতনতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় হৃদরোগ শনাক্তকরণ বিলম্বিত হয়।
হৃদরোগ নিবারণ–বাংলাদেশে চ্যালেঞ্জ: সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশে শতকরা ৩১ ভাগ মৃত্যু হৃদরোগজনিত। এখানে তুলনামূলকভাবে কমবয়সীরা এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হৃদরোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা খরচের পাশাপশি তার আয় উপার্জন বন্ধ হয়ে পড়া নিদারুণ আর্থিক সংকট সৃষ্টি করে। আর এতে মৃত্যু ঘটলে পরিস্থিতি হয় আরো জটিল ও মর্মস্পর্শী। স্বাস্থ্যবীমার অনুপস্থিতি এবং স্বাস্থ্যখাতে অপ্রতুল জাতীয় বরাদ্ধ সাধারণ মানুষের হৃদরোগ চিকিৎসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জনগোষ্টির গড় আয়ু বৃদ্ধি হৃদরোগ সমস্যাকে আরো জটিল করে তোলে। সাধারণভাবে হৃদরোগের প্রকোপ বায়োবৃদ্ধিতে বাড়তে থাকে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস ও জীবনযাত্রা, তামাক ও ধূমপানের অভ্যাস, ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকাশক্তি কমবয়সীদের মধ্যে হৃদরোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে। এখানে গৃহীত অধিকাংশ খাবার হৃদরোগ নিবারণে অনুকূল নয়। এখানে স্বল্পদামে বিভিন্ন তামাকদ্রব্য ও সিগারেট পাওয়া যায় অনায়াসে। এখানে তামাক নিরোধী আইন আছে কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ অনুপস্থিত। ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের বিস্তার ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এখানে ২০২৫ সালের মধ্যে হৃদরোগ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগ ২৫% কমিয়ে আনার জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি অর্জিত হয়নি। এ লক্ষ্য অর্জনের সময়সীমা ইতিমধ্যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। এখানে রয়েছে উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ। কর্মক্ষেত্রে, পরিবার ও সমাজে চলমান মানসিক চাপ ও বৈরিতা হৃদরোগ সৃষ্টিতে অবদান রেখে চলছে। সর্বোপরি হৃদরোগের ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান তথা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তের কোলেস্টোরল পরীক্ষা ও হৃদরোগের উপস্থিতি সনাক্তকরণে রুটিন চেকআপ না হওয়াতে তা ধরা পড়ে অনেক দেরীতে। তখন ঘটে যায় প্রাণহানি কিংবা অন্যান্য জটিলতা।
বাংলাদেশে হৃদরোগ নিবারণে করণীয়: প্রাণঘাতি হৃদরোগ নিবারনে এদেশে প্রয়োজন সমন্বিত কর্ম পদ্ধতি গ্রহণ ও তার বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগ। তা হতে পারে পারিবারিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।
পারিবারিক– শুরুটা হতে হবে পরিবার থেকে। ঘরে কম–চর্বি ও ক্যালরীযুক্ত, শাক সবজী, ফলমূল সমৃদ্ধ হৃৎ–বান্ধব খাবার গ্রহণ, গৃহপরিবেশ ধূমপানমুক্ত রাখা, সদা কর্মমূখর থাকা, টেনশন মুক্ত থাকা, পর্যান্ত বিশ্রাম ও ঘুম, প্রত্যহ ব্যয়াম, মেডিটেশন, প্রার্থনা ও নিয়মিত চেক আপের ব্যবস্থা গ্রহণ।
সামাজিক– কর্মস্থলে হৃৎবান্ধব খাবার, টেনশনমুক্ত কর্মপরিবেশ, শারীরিক ফিটনেট ব্যবস্থা, ধূমপান, দূষণ ও মাদকমুক্ত পরিবেশ। নিয়মিত হাটার অভ্যাস, সাইকেল চালানোর ব্যবস্থা, ব্যায়াম ও ফিটনেসের জন্য পর্যাপ্ত মাঠ ও খোলা জায়গার ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রীয়– হৃদরোগ ও তার ঝুঁকি সনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার, তামাক নিরোধী আইন, ট্রান্সফ্যাট সীমিত করণ ও ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্ধ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যবীমা প্রচলন, জন্মগত হৃদরোগের পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীদের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা ও হার্ট অ্যাটাকের দ্রুত সনাক্তকরণে প্রতি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইসিজি ও রক্তের ট্রপোনিন পরীক্ষা পূর্বক হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের নিকটস্থ সিসিইউ ও ক্যাথল্যাবে দ্রুত স্থানান্তর এর মাধ্যমে এনজিওপ্লাষ্টি ও অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা। এ দেশে ক্রমবর্ধমান হৃদরোগের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা আবশ্যক। এক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশের সাথে তথ্য আদান প্রদান ও সমন্বিত কর্মপদ্ধতি গ্রহণ জরুরি।
উপসংহার: বাংলাদেশে হৃদরোগ নিবারণে তার বিভিন্ন প্রতিরোধ কর্মসূচির বাস্তবায়ন আবশ্যক। এক্ষেত্রে কেবল সচেতনতাই শেষ কথা নয়। প্রয়োজন দৃশ্যমান কর্মসাধন তথা অ্যাক্শন। তার মাধ্যমে হৃদরোগ ঝুঁকি সৃষ্টি বন্ধ হবে। ঝুঁকি দ্রুত সনাক্তের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করে হৃদরোগ সৃষ্টি প্রতিহত করা যাবে আর দুর্ভাগ্যবশত হৃদরোগ দেখা দিলে তা দ্রুত সনাক্ত করে তার জটিলতা ও মৃত্যু প্রতিহত করা যাবে। এভাবে হৃদরোগ নিবারণের মাধ্যমে এদেশের জনগোষ্ঠীর সুস্থ ও উৎপাদনশীল জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করা যাবে। হৃদয় দিয়ে হৃদরোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকার কর্মকাণ্ডই এই প্রাণঘাতি রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। বিশ্ব হার্ট দিবসকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখলে এই লক্ষ অর্জিত হবে না। হৃদয়ের ভালোবাসা, সাহস ও আবেগের যৌক্তিক প্রয়োগে কর্মসাধনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। কেবল কথার ফুলঝুড়ি নয়; প্রয়োজন কাজ। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন তাই বলেছিলেন– well done is better than well said (ভালো কথা বলার চেয়ে ভালো কাজ করে দেখাই উত্তম)।
লেখক: মহাসচিব, চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশন, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, হৃদরোগ বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।












