দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কাটা, সরকারি খাসজমি দখল, অবৈধ প্লট বাণিজ্য, মাসিক চাঁদা আদায়, সালিশ নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে জঙ্গল সলিমপুর। এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কেটে পরিবেশের সর্বনাশ করা হচ্ছে। ভয়, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, নিখোঁজ, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং অদৃশ্য ক্ষমতার ইশারায় জঙ্গল সলিমপুরে এখনো সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত। বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বিশাল এই জনপদে দখলদারিত্ব যেনো প্রাত্যহিক ঘটনা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে বিগত ৪০ বছর ধরে বসতি গড়ে উঠে। সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে হাজার হাজার মানুষ অবৈধ বসতি স্থাপন করে। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের বিস্তৃত এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পায়। জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় দেড় লাখ লোকের বসতি গড়ে ওঠেছে উল্লেখ করে স্থানীয় সূত্রগুলো বলেছে, সরকারি খাস জায়গায় হাজার হাজার প্লট বিক্রি করে শত কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। সেসব প্লটে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনাও।
যাতে বিদ্যুতের সংযোগও দেয়া হয়েছে অবৈধভাবে। এলাকাটি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনীর অপতৎপরতা চলে বছরের পর বছর। শহরের সন্নিকটে হলেও সীতাকুণ্ড থানা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্ন এক জনপদে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন বাহিনীর শাসন শোষণ এবং নির্যাতন চলেছে এ এলাকায়। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, প্রশাসনের লোকজনও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতো। দাগী ভূমিদস্যু এবং সন্ত্রাসীদের দেয়া পরিচয়পত্র ছাড়া বাইরের কেউ এলাকায় প্রবেশ করতে পারতো না। পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে সার্বক্ষণিক পাহারা বসিয়ে নজরদারি করা হতো। চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা এলাকার বহু পাহাড় ইতোমধ্যে সাবাড় করে দিয়েছে। পাহাড় কাটার মহোৎসব চলেছে হরদম।
এলাকাটি ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলেছে। বিভিন্ন সময় প্রশাসনের উপর হামলা চালানো হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে র্যাবের কর্মকর্তাকে।
পাহাড় কেটে অবৈধভাবে বসতি গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের দ্রুত বিস্তার শুরু হয়। আশ্রয়হীন ও নিম্নআয়ের মানুষের বড় অংশ সেখানে বসতি স্থাপন করে। ধীরে ধীরে সরকারি খাসজমির উপরও গড়ে ওঠে বিশাল অনিয়ন্ত্রিত জনপদ। জমি দখল, প্লট বাণিজ্য, পাহাড় কাটা, মাটি বিক্রি ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে অঘোষিত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। একসময় এলাকার প্রবেশপথে নিয়ন্ত্রণমূলক গেট বসানো হয়েছিল বলেও জানান তারা। বহিরাগতদের চলাচলও ছিল নজরদারির মধ্যে।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি র্যাবের উপর হামলার পর পরিস্থিতি জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানকালে বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার ও ২২ জনকে আটকের কথা জানানো হয়।
বর্তমানে এলাকায় আইনশৃক্সখলা বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেছেন, অভিযান হলেও মানুষের মনে ভয় এখনো রয়ে গেছে। তাদের ভাষায়, অস্ত্রের ঝনঝনানি কমেছে, কিন্তু ভয় ও আতঙ্ক কমেনি।
স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। কিন্তু মূল অভিযুক্তরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। আর এই গ্রেপ্তার না হওয়ার কারণে এলাকায় আতংক রয়ে গেছে বলেও স্থানীয়রা মন্তব্য করেছেন।
এদিকে সরকার এলাকাটিতে দুটি পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং ও নিরাপত্তা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জঙ্গল সলিমপুরের ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, ওখানে এখন আর কোনো সমস্যা নেই। দুইটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পুরো এলাকা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। ওখানে বর্তমানে যারা বসবাস করছেন তাদের স্বাস্থ্য ও পানির সংস্থান করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকাটিকে যোগাযোগ নেটওয়ার্কে নিয়ে আসার লক্ষ্যে অচিরেই রাস্তাঘাট উন্নয়নের কাজ শুরু করা হবে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলেছে, প্রশাসনসহ সবার জন্য অবাধ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সন্ত্রাসীরা আর অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে পারবে না।













