সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর শনি ঠাকুরপাড়ার পলাশ দাশ প্রতিদিনের মতো গতকালও ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে যান। যাওয়ার সময় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ভূমিকা দাশকে বলে যান বাড়িতে তাড়াতাড়ি ফিরবেন। স্ত্রীকে দেয়া কথা তিনি রাখলেন। তবে জীবিত না, ফিরলেন লাশ হয়ে। শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনার সংবাদ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে যান পলাশ দাশের ছোট ভাই শুভ দাশ। এ সময় তিনি দেখেন তার ভাই পলাশ দাশের নিথর দেহ ইয়ার্ডের এক কোণায় পড়ে আছে। ঘটনাস্থলে পলাশ দাশের স্ত্রী ভূমিকা দাশ স্বামীকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, আমাদের এখন কে দেখবে? পেটের বাচ্চা পৃথিবীতে আসার আগেই বাবাকে হারিয়ে ফেললো।
এদিকে ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন বাবা হরেন্দ্র দাশ। কারো সাথে তিনি কোনো কথা বলছেন না। কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছেন। অভাবের সংসারে হরেন্দ্র দাশ ৬০ বছর বয়সেও দিনমজুরের কাজ করেন। তার তিন মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে পলাশ বড়। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে পলাশের বিয়ে হয়েছে। তিনি গত ১৫ বছর ধরে জাহাজ কাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ভেবে কয়েকবার এই কাজ ছেড়ে দেয়ার চিন্তাও করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু এই কাজে দক্ষতা অর্জন করেছেন, তাই সিদ্ধান্ত নিয়েও বেশ কয়েকবার পিছু হঠেন। এছাড়া সংসারের অভাব–অনটন তো আছেই।
পলাশ দাশের ছোট ভাই শুভ দাশ দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমার ভাইসহ আরো অনেককে সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি। মালিকপক্ষের লোকজনের গাফিলতির কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা পেলে হয়তো আমার ভাই বেঁচে যেতো। তিনি বলেন, জাহাজ কাটার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য ওদের কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাই ছিল না। শুধুমাত্র এক জোড়া গামবুট ও মাথায় একটি হেলমেট দিলেই তো নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যায় না। সেখানকার মালিকরা শ্রমিকদের কুকুরের সম্মানও দেয় না। তারপরেও পেটের দায়ে আমার ভাইয়ের মতো অনেকে কাজ করতো।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শুভ দাশ আরো বলেন, আমার ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমার সহজ সরল ভাইটি এভাবে আমাদের এভাবে একা করে চলে যাবেন, কখনো ভাবতে পারিনি। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে– তার স্ত্রী ৮ মাসের অন্ত্বঃসত্তা, তার সন্তানের মুখ দেখাটাও হলো না।
পলাশ দাশের প্রতিবেশী দিলীপ দাশ বলেন, আমি মাছ ধরার পেশায় আছি। সকালে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ছিলাম। জাহাজে দুর্ঘটনার খবর শুনে আমরা ইয়ার্ডে গিয়ে ভিতরে ঢুকতে পারিনি। সেখানে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ ছিল। অথচ তখনও অনেক লোক জীবিত ছিল। প্রায় ২–৩ ঘণ্টা পর ওদের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ততক্ষণে অনেকে মারা যান। কিন্তু শিপ ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ যদি তৎপর থাকতো, তবে কয়েকটি প্রাণ হয়তো বেঁচে যেতো।
উল্লেখ্য, গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি জাহাজ কাটার কাজ করার সময় হঠাৎ ট্যাঙ্কার থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় ৯ জন শ্রমিক মারা যান। এছাড়া আরও কয়েকজন শ্রমিককে আহত অবস্থায় চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।











