অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন অনন্যসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব

মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

| রবিবার , ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

দৈনিক আজাদীর প্রয়াত সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন অনন্যসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব। শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের অগ্রগণ্য অভিভাবকরাজনীতিক ও সৎসততার জ্ঞানাঙ্কুর পথিকৃৎ ছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। সাধারণ থেকে অসাধারণ ব্যক্তিত্বে নিজেকে উন্নীত করার এক জ্ঞানস্ফীত পাঠশালা তিনি। ত্রৈকালিক অভিযাত্রায় প্রণিধানযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহের সমন্বয় ঘটিয়ে রচনা করেছেন জীবনদর্শনের তৌর্যত্রিক পান্ডুলিপি। উপমহাদেশের ইতিহাসে খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীশিক্ষাবিদরাজনীতিবিদসাংবাদিকসুশীল ও সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করার মোহময় শক্তিময়তায় ঋদ্ধ মোহাম্মদ খালেদ পূর্ণাঙ্গ সার্থক হয়েছিলেন স্বকীয় সত্তার নিগূঢ় অবগাহনে। অনুপম অনুপ্রেরণা ও তেজোদীপ্ত মহিমায় আত্মপ্রত্যয়ীআত্মসংযমীআত্মত্যাগী হওয়ার অপার সম্ভাবনার দ্বারউন্মোচক সকলের সর্বাধিক জনপ্রিয় চট্টগ্রামের বিবেকখ্যাত এই মহান পুরুষ। মনুষ্যত্বমানবিকতা বিকাশে, পরার্থে মাঙ্গলিক জীবনচরিত নির্মাণে প্রায়োগিক জ্ঞানের প্রসারমান ঋদ্ধতায় অনবদ্য কৃতি মানসের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। শুধু পরিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন নয়; আদর্শিক চেতনায় জ্ঞানসৃজন ও বিতরণে সামাজিক অসঙ্গতি পরাভূত করার লক্ষ্যে তাঁর সকল কর্মযজ্ঞই ছিল জ্ঞাপিত।

কি সাংবাদিকতা, কি সমাজসেবা, কি শিক্ষা, কি রাজনীতি, কি সংস্কৃতি, প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। প্রতিটি বিষয়ে তিনি ছিলেন সমান ওয়াকিবহাল। সব বিষয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা ছিল বলে যে কোনো সভাসমাবেশে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করতে সক্ষম হতেন। তিনি যখন বক্তৃতা দিতেন, তখন সুন্দর সরল ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ শুনে উপস্থিত সকলেই মুগ্ধ হতেন। বেশি সময় ধরে বক্তৃতা দিতেন না। স্বল্পকথায় কংক্রিট বক্তব্য উপস্থাপন করতেন। ঋজু, দিকনির্দেশনামূলক ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যদানে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। একই দিনে অনেকগুলো সভায় বক্তৃতা দিতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু কোনো জায়গায় বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি থাকতো না। সকল বক্তৃতা হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র প্রকৃতির।

সাংবাদিকতায় আগমন বিষয়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকই আমাকে নিয়ে এলেন সাংবাদিকতায়। এমন একজন মহাত্মার পরশ নিয়ে আমি বড় হয়েছি, যিনি ছিলেন নিখাদ খাঁটি মানুষ। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে এসে তাঁর ইচ্ছে হলো চট্টগ্রাম থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা বের করবেন। একদিন আমাকে ডেকে নিয়ে বসালেন। বললেন, খালেদ আমার দীর্ঘ দিনের সখ ও ইচ্ছা, চট্টগ্রাম থেকে একটি দৈনিক প্রকাশ করার। তুমি যদি আমার সাথে ওয়াদা করো, পত্রিকার সাথে থাকবে, তাহলে আমি উদ্যোগ গ্রহণ করবো। আমি তাঁর কাছে ওয়াদা করলাম। তিনি কঠোর পরিশ্রম করে সত্যি সত্যি দৈনিক আজাদী নামে একটি পত্রিকার অনুমোদন নিয়ে এলেন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজাদীর যাত্রার সাথে তিনি আমাকে সাংবাদিক বানালেন। তাঁর মৃত্যুর পর আমি হলাম সম্পাদক। এই হলো আমার সাংবাদিকতা জীবনের পদযাত্রা।’

অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন একজন আদর্শবান সাংবাদিক। সাংবাদিকতার নীতি থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। পরমতসহিষ্ণুতার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সংবাদপ্রতিবেদন আর সম্পাদকীয় মন্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার দুরূহ কাজটি সুচারুরূপে সম্পাদন করেছেন অধ্যাপক খালেদ। সংবাদ পরিবেশনের ব্যাপারে তিনি যেমন সত্যনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করেছেন, তেমনি সম্পাদকীয় নীতিতে দেশের সঙ্গে বিশ্বের সম্পর্কের নীতির সম্মানজনক সঙ্গতি রক্ষা করেছেন। সংবাদ প্রতিবেদনে যার যা প্রাপ্য কিংবা পাওয়া উচিত, তা তিনি অকৃপণভাবে দিয়ে গেছেন এবং এর পাশাপাশি সম্পাদকীয় মন্তব্যে বিষয় কিংবা ঘটনা বিশেষের মূল্যায়নপূর্বক নির্দেশনা দিয়েছেন।

অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন একজন নির্লোভ ও নিঃস্বার্থ মানুষ। এরকম মানুষ সমাজে বিরল। সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করেও তিনি পায়ে দলে গেছেন সব রকমের লোভলালসার ভিত্তি, উপেক্ষা করেছেন যাবতীয় হাতছানি। অনেক সুযোগ তাঁর কাছে অবারিত ছিলো। কিন্তু সেই বিত্ত সম্পদআরামআয়েশের লোভ সামলে নিয়ে সমাজের অনন্য বটবৃক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সব মানুষ এ ধরনের লোভ সংবরণ করতে পারেন না, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের মতো প্রবল মানসিক শক্তির অধিকারী মানুষরাই কেবল পারেন।

একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ হয়েও আপাদমস্তক তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। সব শ্রেণির, সব ধর্মের মানুষের প্রতি তাঁর ছিল মমত্ববোধ। উন্নত মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ বলতে যা বোঝায়অধ্যাপক খালেদ তাই। আজ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে