অধ্যাপক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার বীরত্বগাথা

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী | মঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ

তিনি একজন অধ্যাপক। ৭১–এর মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে তিনি পল্লীবাংলার কোনো এক কলেজের একজন নিরীহ অধ্যাপকই ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হতে না হতে সেই অধ্যাপকের মনোজগতে কী ওলট পালট হয়ে গেল। তিনি হয়ে গেলেন এক ভীষণ দর্শন মুক্তিযোদ্ধা। অধ্যাপকের নাম বিপ্রদাশ বড়ুয়া। যে কলেজে পড়াতেন তিনি, মাত্র ৬৯–এ যার জন্ম, নাম হুলাইন ছালেহ–নূর কলেজ। কলেজের পার্শ্ববর্তী পাঁচরিয়া নামে মামার বাড়িতে থেকে কলেজে পড়াতে যেতেন। মামা অশ্বিনী মাস্টারের মাটির দোতলা বাড়ির একটি কক্ষে তাঁর থাকার জায়গা হয়েছিলো। যে ঘরে থাকতেন, সে ঘরের দরজায় সুধীন দত্তের একটি কবিতার লাইন কাগজে লিখে সেঁটে দিয়েছিলেন-“সহেনা সহেনা আর জনতার জঘন্য মিতালী”। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ত্রিশের বিদগ্ধ আধুনিক কবি, যিনি একান্ত ব্যক্তিস্বাতাস্ত্রবাদী আত্মনিমগ্ন কবি ছিলেন, তাঁরই কাব্যাদর্শে বিশ্বাসী তিনি–সেটা বিজ্ঞাপিত করার জন্যই তিনি ঘরের দরজার চৌকাঠে লিখে রেখেছিলেন দত্ত কবির কবিতার একটি পংক্তি।

এখানে অন্যদের সঙ্গে অধ্যাপক বড়ুয়ার মুক্তিযুদ্ধে যোগদান অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। সেই বন্যপ্রাণীপূর্ণ জনমানবশূন্য অরণ্য থেকে তিনি সছাত্র অক্ষত দেহে নাও বেরিয়ে আসতে পারতেন।

যতই থাকুন তিনি নির্জনতাপ্রিয় আত্মস্বাতন্ত্র্যবাদী কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যবিশ্বাসের অনুরাগী, তাঁর মাতৃভূমির ওপর যখন ট্যাংক চালিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো পাকি জানোয়াররা, অধ্যাপক বড়ুয়ার মানস জগতে ভূমিকম্প হয়ে গেলো। তিনি আর গোবেচারা শান্ত শিষ্ট অধ্যাপক রইলেন না, হয়ে গেলেন এক ভয়ংকর মাতৃসেনা, মুক্তিযোদ্ধা। যে হাতে তিনি কলম ধরতেন, সে হাত রাইফেল ধরার জন্য নিশপিশ করে উঠেছিলো। ইতিমধ্যে তাঁর প্রিয় ছাত্র নাসিরুদ্দিন চৌধুরী, যাকে তিনি সন্তানের ন্যায় স্নেহ করতেন, সেও নিশির ডাক শুনতে পেয়েছিলো। পটিয়া থানার হুলাইন গ্রাম থেকে সবার অলক্ষে মাত্র একটি লুঙ্গি ও সার্ট পরে কীভাবে যেন হেঁটে হেঁটে বোয়ালখালী থানা পেরিয়ে কানুনগোপাড়ায় এক ফুফুর বাড়িতে রাত্রিযাপন করে সাম্পানে কর্ণফুলী পার হয়ে তার পরম শ্রদ্ধাভাজন স্যারকে খুঁজে বের করে ফেলে। রাঙ্গুনিয়ার ইছামতি স্যারের গ্রাম, ‘নদীর পাড়ে ছবির’ মত ছোট গ্রামটি। স্যার তো মহা খুশি, যার সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হতো, ক’দিনের অদর্শনের পর তার দেখা পেয়ে। ছাত্র নাসির বললো স্যার চলেন যুদ্ধে যাই, আমি এসেছি সে কারণে। তিনি বললেন, ঠিক আছে চলো, আমিও ভাবছি সে কথা। ইতিমধ্যে প্রস্তুতি নিতে নিতে সেখানে এসে গেছে পাঞ্জাবি। স্যারের বাড়ির সবার সঙ্গে নদী পার হয়ে যেতে হলো অপর পাড়ে শিলক নামক গ্রামে তাঁদের কোনো আত্মীয় বাড়িতে। সেখানে দুই বা তিন দিন কাটিয়ে আবার ইছামতি এসে যুদ্ধযাত্রার আয়োজন। সে গ্রামের খোঁড়া পায়ের আরো এক ব্যক্তিও যাত্রাসঙ্গী হবেন এমন কথা হয়েছিলো। কিন্তু কাপ্তাই রাস্তায় মিলিটারির গাড়ি চলাচল বেড়ে যাওয়ায় তাঁর আর যাওয়া হলো না। কিন্তু স্যার আর ছাত্রের যাত্রায় তাতে কোন বিঘ্ন ঘটলো না। সন্তর্পণে কাপ্তাই রাস্তা পার হয়ে পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

সে এক ভয়ানক বিপদসঙ্কুল পথে শ্বাসরুদ্ধকর যাত্রা। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে জীবন তখন অন্তর্হিত। কোন সুদূরে, কোন শাপলা শালুকের বিলে, কোন পদ্মদিঘির মাঝে ফুটে থাকা রক্তকমল ছিনিয়ে আনার জন্য তিনি যাত্রা করেছিলেন। কোন তমসাবৃত প্রদেশে লুকিয়ে ছিলো সূর্যটা, তাকে ছিনিয়ে আনার অভিযানে যাত্রা করেছিলেন সছাত্র বিপ্রদাশ বড়ুয়া। তিনি কাঁটা বিছানো এক দুর্গম পথে সূর্য আনতে গিয়েছিলেন। তাঁর সেখানে পৌঁছার সম্ভাবনা ছিলো কম, ফেরার আশা একেবারেই ছিলো না।

ঘন বনের ফাঁক গলিয়ে পাহাড়ি পথের বন্ধুরতায় আপনা থেকেই চলার গতি শ্লথ হয়ে আসে। নিকটেই কোথাও ডেকে ওঠে কোনো হিংস্র বন্য প্রাণী, যা শুনে অতি বড় সাহসী পুরুষেরও বুক কেঁপে ওঠার কথা। কিন্তু যারা যাচ্ছে রণাঙ্গনে শত্রু হননের সংকল্পে, তাদের তো ভয় করলে চলে না। ভয়কে জয় করে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেন। দূরে ছাড়া ছাড়া দু’একটি মাচার ওপর আদিবাসী জনবসতি দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু তারা ছিলো সন্ত্রস্ত। তাদের কাছে পানি খেতে চাইলে বললো তোমাদেরকে খেতে দিলে বাঙালিরা আমাদেরকে আস্ত রাখবে না। বাঙালি মানে মুসলমান অর্থাৎ মুসলিম লীগের লোক। স্যার আর ছাত্র হাঁটতে থাকেন, তাদেরকে ভারতে যেতেই হবে।

হাঁটতে হাঁটতে রাত হয়ে যায়, অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে আর পথ চলা দুষ্কর হয়ে পড়ে। শ্বাপদ সংকুল জনবিরল জঙ্গলে হিংস্র বন্য প্রাণীর ভীতিকর আওয়াজের মধ্যে এমন এক উপত্যকায় নিজেদের আবিষ্কার করেন তাঁরা, চারিদিকে পাহাড়, মাঝখানে একটি সমতল জায়গায় উপনীত হয়েছেন তাঁরা। এখন কী করা ? স্যার আর ছাত্র একে অপরের মুখের দিকে তাকান। তারপর দেখেন দূরে একটি মাচার ওপর একটি পাহাড়ি পরিবারের বাস। আশান্বিত হয়ে তাঁরা সেদিকে গিয়ে মাচায় উঠে ডাক দিতেই দা হাতে বেরিয়ে আসলো এক পাহাড়ি। বললেন তোমরা কী চাও। যথাসম্ভব অনুনয় বিনয় করে স্যার বললেন, আমরা পথিক। মানিকছড়ি যাচ্ছিলাম, রাত হয়ে গেছে, আমাদেরকে যদি আজকের রাতটা একটু আশ্রয় দেন। পাহাড়ি বললেন, না, তোমাদেরকে আশ্রয় দিলে রাউজানের বাঙালিরা এসে আমাদেরকে মেরে ফেলবে। তবুও তিনি কাতর মিনতি করতে থাকায় পাহাড়ি বললেন, ঠিক আছে, আমাদের গোয়াল ঘরে তোমরা থাকতে পারবে। দয়া করে কিছু খেতেও দেন। তারপর সারারাত গরু–ছাগলের মলমূত্রের দুর্গন্ধের মধ্যে নাক, মুখ চেপে ধরে কোন মতে রাতটা কাটিয়ে দিলেন অধ্যাপক বড়ুয়া ও ছাত্র। সকালে ওঠে আবার হাঁটা এবং সেই হাঁটা গিয়ে থামল মানিকছড়ি ‘মানরাজার বাড়ি’। সেখানে তখন অগণিত মুক্তিযোদ্ধা, শরণার্থীর ভিড়। রাজবাড়িতে জিরিয়ে নিয়ে আবার অবিরাম হাঁটা, অবশেষে পৌঁছলেন যেস্থানে, নাম তার রামগড়, বাংলাদেশের সর্বশেষ সীমান্ত, ওপারে ভারত। সেখানে নাসির দেখা পেলেন যুবনেতা এস এম ইউসুফের, তাঁর পাশের গ্রাম মনসার অধিবাসী। কিছুদিন পূর্বেও তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বললেন নাসির এসেছ, ভালো হয়েছে, আজকেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপকে আমরা ট্রেনিংয়ের জন্য ভারতে পাঠাচ্ছি। তুমি তাদের সঙ্গে ট্রেনিংয়ে যাও। স্যারকে দেখলেন, তিনিও একদল শিল্পী সাহিত্যিকের দেখা পেয়ে গেছেন, তিনি বললেন নাসির আমি মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করবো। নাসির বললো, স্যার আমিও মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছি। আজই ট্রেনিংয়ে যাচ্ছি। সেই ছাড়াছাড়ি ছাত্র, শিক্ষকের। ছাত্র নাসির রামগড়ে বিদায়ের সময় বলেছিলো, স্যার আপনি তো কলম সৈনিক হতে যাচ্ছেন, আমি হব সশস্ত্র সৈনিক; আপনার হাতে কলম, আমার হাতিয়ার রাইফেল।

মুক্তিযুদ্ধে আরো অধ্যাপক গেছেন, কিন্তু অধ্যাপক বড়ুয়ার মুক্তিযুদ্ধে যোগদান যেখানে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও তাৎপর্যখচিত, তাহলো শুধু অধ্যাপক নয়, খুব বেশি মুক্তিযোদ্ধাও তখন ভারতে যাননি। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারও আত্মপ্রকাশ করেনি। অধ্যাপক বড়ুয়া সীমান্ত পার হন ১৫ এপ্রিল, আর অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ এপ্রিল।

স্বাধীন বাংলা বেতারও তখন কলকাতায় গিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারেনি। এসব বিষয় ছাড়া অধ্যাপক বড়ুয়ার যুদ্ধযাত্রার যে দিকটা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে, সেটি হলো তিনি এমন এক ভয়ার্ত সময়ে এমন দুর্গম গিরিপথে ভারত যাত্রা করেছিলেন, প্রচণ্ড রকম কোনো দুঃসাহস অভিযাত্রী পুরুষ ছাড়া স্বাভাবিক কোনো মানুষের পক্ষে সেই ভাষণ সময়ে ভীষণ সমরে মৃত্যুকে আলিঙ্গণ করার ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়া বোধ হয় সম্ভব ছিলো না।

ছাত্র জীবনে রাজনীতিক সঙ্গে দূরবর্তী সংযোগ ছিলো অধ্যাপক বড়ুয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ছেন, তখন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূতিকাগার প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাতির মধ্যগগনে প্রচণ্ড মার্তণ্ডের ন্যায় দীপ্তি ছড়াছিলো। বাংলা বিভাগকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটছিলো। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে যখন পটিয়ায় হুলাইন ছালেহ–নূর কলেজে শিক্ষকতা করতে এসেছিলেন, তখনও তাঁর অন্তরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছে, জেগে আছে স্বাধীনতার স্বপ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাঙালি চেতনায় জেগে ওঠেন তিনি এবং সেই চেতনার আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিলেন নিজের মধ্যে; সেই প্রজ্জ্বলন্ত আগুনেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতে না হতে জ্বলে উঠেছিলো অধ্যাপক বড়ুয়া।

একদিন সূর্য ওঠার পালা হলো শেষ। অধ্যাপক বড়ুয়া বরাবর কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতারেই ছিলেন। কথিকা, গীতি নকশা, গল্প লিখতেন তিনি। স্বদেশে ফিরে আসলেন অধ্যাপক বড়ুয়া, ছাত্রও ফিরলো যুদ্ধ জয় করে।

যুদ্ধ জয় করে দেশে ফিরে অধ্যাপনা ছেড়ে কিছুদিন ব্রাক–এ তারপর দীর্ঘ সময় শিশু একাডেমিতে কাটিয়ে সাহিত্যের জন্যই পরিপূর্ণ সময় দেবেন বলে স্থির করলেন। প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, গবেষণা, ভ্রমণ, নিসর্গ, ছোটদের গল্প অজস্র সৃষ্টির বান ডেকেছিলো তাঁর কলমে, প্রায় শত বই লিখে ফেললেন। এক বহুপ্রজ সাহিত্যিকের সাক্ষাৎ পেলো বাংলা সাহিত্য।

বিপ্রদাশ বড়ুয়া ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২০ সেপ্টেম্বর রাঙ্গুনিয়া থানার ইছামতী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ডা. অরুণ কুমার বড়ুয়া, মা সুষমা বড়ুয়া।

ইছামতি ক্যাং ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর মাধ্যমিক শ্রেণিতে প্রথমে রাঙ্গুনিয়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন এবং পরে রাঙামাটি সরকারি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে সেখান থেকে এসএসসি পাস করেন। তিনি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ অনার্স ও এম.এ পাস করেন। ছাত্রজীবনে রাঙামাটির কৃতী ফুটবলার ছিলেন বিপ্রদাশ বড়ুয়া।

আগেই বলা হয়েছে বিপ্রদাশ বড়ুয়া অধ্যয়নশেষে শিক্ষকতা পেশা অবলম্বন করে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে পটিয়া থানায় নবপ্রতিষ্ঠিত হুলাইন ছালেহ–নূর কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ছালেহ–নূর কলেজে অধ্যাপনা করেন। এরপর ১৯৭৬–৭৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাক–এর পাক্ষিক গণকেন্দ্রের স্টাফ রাইটার, ১৯৭৭–১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর সহকারী পরিচালক, সহকারী সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (খণ্ডকালীন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দেশের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক সমালোচনা ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ছোটদের ও বড়দের মিলিয়ে এ পর্যন্ত শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে ।

বিপ্রদাশ বড়ুয়ার পিতা ডা. অরুণ কুমার বড়ুয়া কলকাতা ন্যাশনাল হাসপাতাল থেকে এল.এম.পি ডিগ্রিধারী। ছাত্রাবস্থায় গান্ধীজীর অনুসারী ও কংগ্রেস–এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ডাক্তারি পাস করে গ্রামে ফিরে স্বাধীন চিকিৎসা পেশা অবলম্বন করেন। এই স্বাধীন জীবিকা ও পৈতৃক জমিজমায় চাষবাস করে অতিবাহিত করেন অবশিষ্ট জীবন। গ্রামোন্নয়ন ও কলেরাপীড়িত আর্তের সেবা করে সুখ্যাতির অধিকারি হন। শল্যচিকিৎসায় তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিলো। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক মৃত্যুর শিকার হন।

বিপ্রদাশ বড়ুয়ার পিতামহ ডা. অনন্তকুমার বড়ুয়া কলকাতার ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুল থেকে পাস করে মানিকছড়ির রাজার ডাক্তার ছিলেন। রানি নিউমাকে জটিল রোগ থেকে আরোগ্য লাভের কৃতিত্বের জন্য স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। পিতামহীর নাম বাসন্তী বড়ুয়া। ছেলেবেলায় তাঁর কাছে প্রকৃতি, পশুপাখি ও জীবজন্তু সমৃদ্ধ জাতকের গল্প শুনে প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট হন বিপ্রদাশ বড়ুয়া।

বিপ্রদাশ বড়ুয়ার প্রপিতামহ ভৈরব বড়ুয়া ছিলেন মুহুরী। তাঁর পিতা তিলককুমার বড়ুয়াও ছিলেন মুহুরী। ইছামতী গ্রাম পত্তনে তাঁর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ইছামতি গ্রামটি ইছামতি ও কর্ণফুলী নদীর সঙ্গমস্থলে চর থেকে উৎপন্ন। প্রাচীন লোকদের মত অনুযায়ী জানা যায়, পলি দিয়ে গড়ে ওঠা – এই গ্রামে তাঁরা প্রথম বসতি স্থাপন করেন এবং ইছামতির মোহনায় বলে গ্রামের নাম রাখেন ইছামতি। তিলককুমার বড়ুয়া ইছামতী গ্রামের স্বনামধন্য পুরুষ।

খুব অল্প বয়সে মা সুষমা বড়ুয়াকে হারান বিপ্রদাশ বড়ুয়া। মাতামহ পটিয়া থানার পাঁচরিয়া গ্রামের বিখ্যাত শিক্ষক বিপিন বড়ুয়া। অঙ্কবিদ হিসাবে তিনি খ্যাত ছিলেন। শিক্ষকতাই ছিল তাঁর মূল পেশা। পৈতৃক জমিজমা চাষ করতেন। বিখ্যাত পাঁচরিয়া দিঘির মালিক তিনি। পরবর্তীকালে এই দিঘির উত্তরপাড়ে সরকারি অফিস ইত্যাদির জন্য সরকারকে জমি দান করেন তাঁর পুত্র অর্থাৎ বিপ্রদাশ বড়ুয়ার মামা অশ্বিনী রঞ্জন বড়ুয়া। মাতামহ তৎকালে বিখ্যাত পত্রিকা বৌদ্ধবন্ধু সম্পাদনা করেছেন। বিপ্রদাশ বড়ুয়ার মামারা হলেন ডা. রোহিনী রঞ্জন বড়ুয়া, অশ্বিনী রঞ্জন বড়ুয়া, ভরণী রঞ্জন বড়ুয়া ও কৃত্তিকারঞ্জন বড়ুয়া। বিপ্রদাশ বড়ুয়া কলকাতার বিদূূষী নারী রুবী বড়ুয়ার পাণি গ্রহণ করেন। তিনি এম.এ কম্পরেটিভ ফিললজি ও লিঙ্গুইস্টিকস–এ এম এ পাস করে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন। তিনি একজন বিশিষ্ট লেখক, তিনটি বই প্রণেতা ।

লেখক : সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক সংগঠক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা : সম্ভাবনার দুয়ার কতদূর
পরবর্তী নিবন্ধসাংবাদিক জাহাঙ্গীর টুটুলের মায়ের ইন্তেকাল