দুষ্টচক্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ‘সতর্ক’ করলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। তিনি বলেন, আপনি যদি দুষ্টচক্র এবং দালালচক্র থেকে বের হতে না পারেন, তাহলে তারা আপনার ক্ষতি করবে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করতে চাই, তারা কিন্তু আপনার বন্ধু না, যারা তৈল মর্দন করে তারা কখনো বন্ধু না। তারা তাদের নিজের স্বার্থে, নিজের পজিশন ধরে রাখার জন্য তৈল মর্দন করে। একটা উপযুক্ত লোক কারো কাছে গিয়ে তৈল মর্দন করবে না। জাতীয়তাবাদী সংগঠনে সুকৌশলে স্বৈরাচারের দোসররা আশ্রয় নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাচ্ছে। আশা করি প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টা অনুধাবন করবেন। তাকে যে চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছে, এই বেষ্টনি ভঙ্গ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম জিয়ার মর্যাদা তিনি রক্ষা করবেন।
গতকাল রোববার বিকালে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত ‘গণভোটের রায় জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও চট্টগ্রাম মহানগরীর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিনের সঞ্চালনায় এতে প্রধান আলোচক ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এমপি, দক্ষিণ জেলা জামায়াতের অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম এমপি, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, জাতীয় নাগরিক পাটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি উপ–প্রধান সরোয়ার তুষার ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির।
সাবেক মন্ত্রী অলি আহমদ বলেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। তাদের থেকে আপনারা বিচ্ছিন্ন হন নাই? বিচ্ছিন্ন হয়েছেন তো? এটা কি আপনাদের জন্য ভালো? কখনো না। প্রধানমন্ত্রীকে এই বিষয়গুলি ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে, আইন মানুষের উপকারের জন্য, এটা কোনো কোরআন–হাদিসও না, আল্লাহর ওহিও না। আমাদের জন্য যেটা ভালো সেটাই আপনাকে করতে হবে। ৭০ পার্সেন্ট লোক চেয়েছে, এই জিনিসটা আমাদের জন্য করতে হবে, সুতরাং আপনাকে এখানে আইন–গাইন কিছুই নাই।
তিনি বলেন, আমি যখন ১৯৭১ সালে বিদ্রোহ করি, আমি কি সংবিধান পড়ে পরে বিদ্রোহ করেছিলাম? আমরা যখন পাকিস্তানিদের গুলি করে রাস্তায় ফেলায়া রাখি, তখন কি আমরা সংবিধান পড়ে করেছিলাম? তখন কি আমরা চিফ জাস্টিস থেকে অনুমতি নিয়েছিলাম? ইংলিশে বলে নেসেসিটি নিডস নো ল, প্রয়োজন আইনের কোনো তোয়াক্কা করে না। মানুষ যেটা চায় আপনাকে সেটাই করতে হবে।
অলি আহমদ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আমার ছেলে সমতুল্য। আপনার যখন কষ্ট হয়, স্বাভাবিকভাবে আমারও কষ্ট হয়। কারণ আপনার পরিবারের সাথে আমি ১৯৭১ সালের পর থেকে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এখনো সময় আছে। আমরা হাতি–ঘোড়া কিছু চাই নাই। আপনি আজকে ক্ষমতায় আছেন, কালকে থাকবেন না। জামায়াত আসবে, অন্য কেউ আসবে বা ১১ দলীয় ঐক্যজোট আসবে। তখন তো আপনার এই জিনিসগুলি প্রয়োজন পড়বে। আমরা যে সংস্কারগুলি চাচ্ছি, এটা তো শুধু ১১ দলীয় জোটের জন্য না। এটা যখন যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের জন্য। যখন যারা বিরোধী দলে আছে তাদের জন্য। আমরা চাচ্ছি একটা ভারসাম্য সমাজে থাকুক।
তিনি বলেন, আমরা আপনাদের (বিএনপি) মঙ্গল চাই। কিন্তু তার বদলে আমাদের অধিকার কেড়ে নেবেন, এটা কখনো হতে দেব না। আমরা মুভমেন্টের জন্য প্রস্তুত। মানুষ যেটা ৭০ ভাগ ভোট দিয়েছে সেটা যেন অক্ষর অক্ষরে পালন হয়।
অলি আহমদ বলেন, ২৪–এর আন্দোলনে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের একটা বিরাট অংশগ্রহণ ছিল। দলিল দস্তাবেজ দেখলে পাবেন অধিকাংশ মানুষ ১১ দলীয় ঐক্য জোটের ছিল। আবার কিন্তু আমরা সেদিকে ধাবিত হচ্ছি। ধাবিত কেন হচ্ছি? প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। ক্ষমতায় যদি কেউ থাকতে চায়, থাকতে পারে না, আল্লাহর সাহায্য প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশের অবস্থা কী? সারের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং এটা আরো বাড়বে। আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্যের যে যুদ্ধ হচ্ছে, এই অশান্তির কারণে প্রত্যেকটা জিনিসের উৎপাদন খরচ বেড়ে চলেছে। এই সরকারের পক্ষে এটা সামাল দেওয়া সম্ভব না। প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশে যেই টিম তিনি গঠন করেছেন, এই টিম দিয়ে গোলপোস্টে গোল বল ঢুকানো সম্ভব না। কারণ সাধারণ জিনিস যখন উনারা গ্রহণ করতে পারছেন না তাহলে বড় বড় জিনিসগুলি কীভাবে গ্রহণ করবেন?
তিনি বলেন, ফুটপাতে আট আনা পয়সার খানা পাবেন। কিন্তু ভালো খানা খাইতে হলে আপনাকে বড় বড় হোটেলে যাইতে হবে। ওই হোটেল কিন্তু আপনি ফুটপাতে পাবেন না। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ফুটপাতের খাওয়াগুলি বেছে নিয়েছেন। ফাইভ স্টারের খাওয়ার দিকে যায় নাই। যার কারণে দেশে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
অলি বলেন, আপনি পাবলিক সার্ভিস কমিশনে একটা চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন, তার সম্বন্ধে কিছুই জানবেন না। শুধু দলীয় আনুগত্য আর দালালি করে, যে জন্য বানায়ে দেবেন, এটা তো হয় না। আমরা চেয়েছি প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানে সরকারি দল এবং বিরোধী দল দুটি সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে নিয়োগ দেওয়া হোক। আমরা তো এটা চাই না, যে ১১ দলের পক্ষে কাজ করার জন্য দেওয়া হোক। আমরা তো চাচ্ছি, এই লোকটার মাধ্যমে দেশ উপকৃত হোক।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হওয়া উচিত মন্তব্য করে অলি আহমদ বলেন, শুভেন্দু যে কাজটা করেছেন, এটা চরম মানবতা বিরোধী অপরাধ। তার এই অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে যেটা আছে, সে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হওয়া উচিত। এটা আমাদের পক্ষ থেকে দাবি থাকল। আশা করি ভারত সরকার মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়গুলি দেখবেন।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হয়েছে, পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন জায়গায় দেখলাম বাংলাদেশে যে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে, শেখ হাসিনা ওখানে মোদিকেও দীক্ষিত করেছে। হাসিনার পরামর্শে মমতা ব্যানার্জিকে পরাজিত করে শুভেন্দু ওখানে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে যে বক্তব্যগুলি দিয়েছেন এগুলো অত্যন্ত আপত্তিকর, আমাদের জন্য অপমানকর ও গ্রহণযোগ্য নয়।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তার পক্ষে সালাউদ্দিন সাহেব ঘোষণা দিয়েছেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন জায়গায় এমন কথা বলেছেন। কিন্তু উনারা ‘গণভোট অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে’ বলছেন না কেন? কারণ বিএনপি জুলাই সনদ জুলাইয়ের স্পিরিটে নয়, নিজেদের মতো করে বাস্তবায়ন করতে চান।
তিনি বলেন, বিএনপি জুলাই সনদে যে ১০টি বিষয়ে নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছেন সেগুলোই স্বৈরাচার উৎপাদনের হাতিয়ার। এসব নোট অফ ডিসেন্ট ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়ে খারিজ করে দিয়েছে। বল এখন জামায়াতের কোর্টে নেই। বল আপনাদের কোর্টে। আপনারা যদি ভুল করেন তাহলে আপনাদের বারেই ঢুকে যাবে। তিনি বলেন, জনগণের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করুন, পাঁচ কোটি মানুষের গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে দেশে নতুন সংকট তৈরি করবেন না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন, তা না হলে যারা অতীতে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ বেছে নিয়েছিল, তাদের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে।
অ্যাডেভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, গণভোট জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি দলের অবস্থান নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, গণভোট জনগণের সরাসরি মতামত প্রকাশের সাংবিধানিক পদ্ধতি এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত চতুর্থ গণভোটে ৭০% ভোটে জয়ী রায় উপেক্ষা করে বিএনপি সরকার রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। সালাহউদ্দিন আহমদকে জুলাই গাদ্দার আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ দাবি করেন তিনি।
শাহাজাহান চৌধুরী এমপি বলেন, আপনারা আওয়ামী লীগকে আনবেন? আমরা পার্লামেন্টে আছি। ইন্ডিয়ার প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশে চিকিৎসা করবেন, সেটা কোনো দিন হতে পারে না।
সেমিনারে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি মাওলানা এমদাদ উল্লাহ সোহাইল, এনসিপির নেতা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর যুগ্ম সমন্বয়ক মীর শোয়াইব ও আরিফ মঈনউদ্দীন, খেলাফত মজলিস উত্তর জেলা নায়েবে আমির মুফতি শিহাবুদ্দিন, বাংলাদেশ নেজাম ইসলাম পার্টির চট্টগ্রাম মহানগরীর আমির মাওলানা জিয়াউল হোসাইন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পাটির মহানগরীর সভাপতি আবু মোজাফফর মুহাম্মদ আনাস, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির মহানগরীর সভাপতি সৈয়দ গিয়াস উদ্দিন আলম, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চট্টগ্রাম মহানগরীর সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মোতালেব, লেবার পার্টি চট্টগ্রাম মহানগরীর সহসভাপতি মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান, চট্টগ্রাম মহানগরীর অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি মোহাম্মদ উল্লাহ, ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুস ও মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী।













