হেমন্ত : ভালোবাসা ছিল, আশাও ছিল, আর পূরণ হলো না

রতন বিশ্বাস | সোমবার , ১২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি এই ধরাধাম ত্যাগ করেন। আসছে শারদীয় উৎসবে তাঁর রেখে যাওয়া হাজারো কালজয়ী গানে মুখরিত হয়ে উঠবে পুজো মন্দির, পুজো মন্ডপ। তাঁর জন্মদিবস ও প্রয়াণ দিবস আমরা প্রতি বছর পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। ভাববার বিষয় ঐ মাসের প্রথম দিকে তিনি ঢাকায় আসেন রেঁনেসা শিল্পীগোষ্ঠীর আমন্ত্রণে। মাইকেল মধুসুদন দত্ত অ্যাওয়ার্ড নিতে। সেই উপলক্ষ্যে বহু সরকারি বেসরকারিভাবে অনেক অনুষ্ঠান করেন ঢাকায়। তাঁর সর্বশেষ অনুষ্ঠান ছিলো রজতজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশনে। সাক্ষাৎকারে ছিলেন প্রবাদপ্রতিম গীতিকার, সুরকার, গবেষক, প্রফেসর ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। অনুষ্ঠানে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের অনেক প্রশ্নের জবাব তিনি দেন। এর ফাঁকে তাঁর কালজয়ী গানও পরিবেশন করেন। হঠাৎ তিনি বলে উঠেন আমার শরীর মোটেই ভালো নেই। প্লিজ আর অনুরোধ করবেন না। পরদিন সরকারিভাবে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানান। সাথে ছিলেন তাঁর স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায় ও কন্যা রানু। কলকাতায় ফিরে গিয়ে তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ১১ টায় তিনি চিরবিদায় নেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ঢাকায় আসার পর আয়োজকদের সাথে কিছু মতবিরোধ হলে তাঁকে সরকারিভাবে রাখা হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। সে সময় আমাদের চট্টগ্রামের সাংবাদিক শিশির বাবু মহোদয় অল্প সময়ের জন্য কথা বলার সুযোগ পান। আলাপচারিতায় শিশির বাবুকে বলেন, যদি বাংলাদেশে আসি আর ঢাকা নয়, চট্টগ্রামেই আসবো। শিশির বাবু আনন্দিত হয়ে বলেন, নিশ্চয় সমস্ত ব্যবস্থা আমরাই করবো। চট্টগ্রাম–কোলকাতা যাতায়াতের বিমান আছে। তিনি আরো বলেন, বহু আগে থেকেই আমার সাথে চট্টগ্রামের যোগাযোগ রয়েছে, চিঠিপত্র দিয়ে ওরা আমার খোঁজখবর নেন এবং একটি সংগঠনও আছে ‘চট্টল ইয়ুথ কয়ার’। এরা আমার কোলকাতা বাড়িতে এসেও দেখা করেন চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য, কিন্তু আমার শরীর মোটেও ভালো নেই। শিশির বাবু সব শুনে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে বলেন, কোনো চিন্তা করবেন না আমরা সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা করবো। এর অনেক পূর্বে তাঁর সাথে দেখা করার জন্য যান আমাদের স্বনামধন্য ডাক্তার, গিটারিস্ট বি.কে. সেনগুপ্ত (তিনি গুণীশিল্পী অনিরুদ্ধ সেনগুপ্তের পিতা), সাথে ছিলেন ভারতের বিখ্যাত গিটারিস্ট বটুক নন্দী। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে ডাক্তার বি.কে. সেনগুপ্ত বিনয়ের সাথে অনুরোধ করেন আপনাকে চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ রইলো। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ ও ১৯৮৯ দু’বার বাংলাদেশে আসেন। তিনি আরো একবার এসেছিলেন ১৯৭০–র আগে একদিনের জন্য। একটি সিনেমার গান রেকর্ডিং করার জন্য। সকালে আসেন, সন্ধ্যে চলে যান। সেই ছবিটির নাম ‘ধীরে বহে মেঘনা’।

পরিশেষে চট্টগ্রামের লোকমুখে এও শোনা যায় জেএমসেন হলে মাস্টারদা সূর্যসেনের আবক্ষ মূর্তির প্রতিষ্ঠার জন্য উল্কাট্রেন যোগে আসেন চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, ভানু বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ। এ গ্রুপের কর্ণধার হয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও আসার কথা ছিল, কিন্তু ব্যস্ততা ও সঙ্গত কারণেই আসতে পারেনি। আমরা চট্টগ্রামবাসী এই বলে সান্তনা পাবো এই মহান শিল্পী, মহা গায়ক চট্টগ্রামকে মনে রেখে ভালোবাসা দিয়ে গেছেন। তিনি যুগযুগ ধরে আমাদের অন্তরে চির অমর হয়ে থাকবেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসবুজকে বাঁচাই, সবুজে বাঁচি
পরবর্তী নিবন্ধঅক্টোবর যখন ফিরে আসে