সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, হার্ট ভালো রাখতে হলে নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন এবং নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প নেই। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। যাদের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি। তাই এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জরুরি।
গতকাল শুক্রবার নগরীর প্রবর্তক এলাকায় প্রবর্তক সংঘ (বাংলাদেশ), চট্টগ্রামের মাস্টারদা সূর্যসেন মিলনায়তনে আয়োজিত ‘হার্ট অ্যাটাক : প্রতিকার ও প্রতিরোধ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শাহাদাত বলেন, হৃদরোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে চিকিৎসকদের আরো বেশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। হার্টের ব্লক, স্টেন্টিং কিংবা বাইপাস সার্জারি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। এসব বিষয়ে মানুষের ভয় ও বিভ্রান্তি দূর করতে চিকিৎসকদের আরো বেশি করে সচেতনতামূলক ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। উদ্বোধকের বক্তব্যে একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব ও দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, আজকে এখানে হার্টের প্রতিকার এবং প্রতিরোধ বিষয়ে সেমিনার আয়োজিত হচ্ছে। আপনারা জানেন, প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর। অর্থাৎ রোগ নিরাময়ের চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা শ্রেয়। আবার যদি রোগ প্রতিরোধ করতে পারি তবে হার্ট অ্যাটাক থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব। আরেকটি কথা, আমি যতটুকু জানি, ১৯৬৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কার্ডিয়াক সার্জন ডা. বার্নার্ড প্রথম সফলতার সাথে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করেছিলেন। কিন্তু সেই রোগী দুই দিন কি তিন দিন বেঁচে ছিলেন। আপনারা দেখেন, এই যে দুই–তিন দিন বেঁচে ছিলেন, সেটা কি কম কথা! এই পৃথিবীতে তিন দিন যদি আপনি আপনার জীবনটাকে একটু বাড়িয়ে নিতে পারেন, সেটাই তো আপনার সবচেয়ে বড় পাওয়া। কারণ আমাদের জীবন তো একটাই।
এম এ মালেক বলেন, আমি একটা বিষয় সব সময় বলি, নাথিং ইজ ইম্পসিবল ইন দিস ওয়ার্ল্ড। সবকিছুকে পসিবল করতে করতে ডাক্তাররা আমাদেরকে এমন একটা অবস্থায় নিয়ে আসছেন, আমরা সবকিছুর প্রতিষেধক বের করতে সক্ষম হয়েছি। মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। মানুষ সবকিছু পারে। আমরা যদি লক্ষ্য স্থির করতে পারি, তাহলে কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। কিন্তু এখানে একটা কথা আছে। কথাটা হচ্ছে, সামবডি উইল হ্যাভ টু স্টার্ট। সেই স্টার্টটা কি? আমরা কী করব? কোথায় যাব? সেই লক্ষ্যটা স্থির করে যদি আমরা সেই আরম্ভটা করতে পারি, তাহলে সেটা হয়তো আমি শেষ করতে পারব না। কিন্তু ওই অন্য আরেকজন সেটা করতে পারবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি জেনারেল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার দাশ। তিনি বলেন, হৃদপিণ্ডে রক্ত পৌঁছানোর পথে চর্বি জমে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক হয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তবে ইসিজি পরীক্ষার মাধ্যমে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি রক্তের ট্রোপোনিন পরীক্ষার মাধ্যমেও রোগের উপস্থিতি ও তীব্রতা নির্ণয় করা যায়। হার্ট অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণের মধ্যে রয়েছে তীব্র বুক ব্যথা, বুকের মাঝখানে চাপ অনুভব করা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমিভাব, দুর্বলতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়া। অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা বুক থেকে হাত, কাঁধ, ঘাড় কিংবা চোয়ালেও ছড়িয়ে যেতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ডা. প্রবীর কুমার দাশ বলেন, হার্ট অ্যাটাকের পর রোগীরা শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। চাকরি হারানোর ভয়, চিকিৎসা ব্যয় এবং পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি করে। তাই রোগীর শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তাও জরুরি। এখানে সেমিনারে মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অঙিজেন সরবরাহ, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, জমাট রক্ত গলানোর ইনজেকশন এবং জরুরি এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্ট বসানোর মাধ্যমে রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের পর সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু হলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক কমে আসে। হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান বর্জন, ওজন নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক চাপ কমানোর পরামর্শ দেন বক্তারা। পাশাপাশি খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও চর্বি কমানো, বেশি ফল ও সবজি খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সেমিনারে অন্য বক্তারা বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে হার্ট অ্যাটাক। দেশে তুলনামূলক কম বয়সীদের মধ্যেও এ রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, ধূমপান, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ও শরীরচর্চা না করার কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আগে তুলনামূলক বেশি বয়সীদের মধ্যে এ রোগ দেখা গেলেও এখন তরুণদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বাড়ছে। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, ধূমপান, মাদকাসক্তি, মানসিক চাপ এবং অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে তরুণদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই তরুণ বয়স থেকেই শরীরচর্চা, নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন প্রবর্তক সংঘ চট্টগ্রামের সভাপতি ইন্দু নন্দন দত্ত। বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হৃদরোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক চৌধুরী, ডা. এ কে এম মনজুর মোর্শেদ, ডা. আশীষ দে, প্রবর্তক সংঘের সাবেক সভাপতি সুভাষ চন্দ্র লালা, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ডা. শ্রীপ্রকাশ বিশ্বাস এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক উপকমিটির আহ্বায়ক ডা. বিদ্যুৎ বিশ্বাস, ডা. দুলাল চন্দ্র দাশ প্রমুখ।














