হালদায় ফেলে আসা সেই দিনগুলো

মোহাম্মদ নূর উদ্দীন | শুক্রবার , ২২ মে, ২০২৬ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ

এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হলো হালদা নদী। আমার দুরন্ত শৈশবের অনেকটা সময় কাটিয়েছি এই হালদা নদীর পাড়ে। ছোটবেলায় সারাক্ষণ অপেক্ষায় থাকতাম কখন বিদ্যালয় ছুটি হবে। স্কুল ছুটি হলেই ছুটতাম হালদার ওপারে বড় ফুফুর বাসায়। ওপারে অবশ্যই ফটিকছড়ি আর এপারে হাটহাজারী। হালদা নদীর কোল ঘেঁষে জেগে থাকা ফটিকছড়ির রোসাংগিরি (শিলেরহাটের পাশে) গ্রামেই আমার ফুফাদের বাড়ি। সেখানে কখনো একা, কখনো দাদার সাথে হেঁটে হেঁটে যেতাম। কিছুটা কর্দমাক্ত আর কিছুটা ইটের তৈরি সেই চেনা পথ ধরে হাঁটার সময় দাদার অফুরন্ত সব প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াটা ছিল এক নিয়মিত ও মধুর অভিজ্ঞতা। রাতে ঘুমানোর সময় মুসলিম বাল্যশিক্ষা থেকে প্রশ্ন করা দাদার রুটিনমাফিক কাজ। আমাকে বড় নাতি হিসেবে হয়তো একটু বেশি ভালোবাসতো।

যাহোক, সেখানে যাওয়ার আনন্দটাই ছিল অন্যরকম। বড় ফুফু আমায় ভীষণ আদরস্নেহ করতেন। সেখান থেকে ফেরার সময় হাতখরচ হিসেবে দশবিশ টাকা বকশিস তো থাকতোই, তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল প্রিয় হালদা নদীর জল।নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে চলা আর জোয়ারভাটার খেলা দেখার আনন্দ ছিল সীমাহীন। তীরের সবুজ শাকসবজির ক্ষেত সেই সৌন্দর্যকে যেন আরও বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে দিত। হালদা নদী থেকে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার খুব ইচ্ছে থাকলেও নদীর প্রতি এক অজানা ভয়ে তা আর হয়ে ওঠেনি। তবে নৌকায় চড়ে নদী পার হওয়ার সময় হালদার শীতল জল স্পর্শ করার সেই শিহরণ জাগানো অনুভূতি আমার হৃদয়ে সারাজীবন অমলিন হয়ে থাকবে।

এখনো ভীষণ ইচ্ছে জাগে হালদার চরে কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে ক্যাম্প করার যেখানে কোমল বাতাসের পরশ জুড়িয়ে দেবে শরীরের ক্লান্তি, আর সবুজ ঘাসের গালিচায় খালি পায়ে হাঁটার সেই মুগ্ধতা যেন জাগিয়ে তুলবে ঘুমন্ত বিবেককে। পাশে থাকবে শুধু প্রিয়তমা আর হাতে থাকবে এক মুঠো বাদাম। বাদাম খেতে খেতে আমরা হারিয়ে যাবো গল্পের সাগরে, আর আমাদের সব অব্যক্ত কথার সাক্ষী হয়ে পাশে বয়ে যাবে হালদার কলতান। সেদিন আমি তোমার বাবুই পাখির বাসার মতো সুন্দর ও শান্ত নয়নে ডুব দিবো হাজারবার। তুমি পাশে থাকলেই তো আমি প্রাণবন্ত হই, পূর্ণতা পায় আমার এই পৃথিবী। আর সেই পৃথিবীর সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের প্রিয় হালদাকে বাঁচাতে হবে, হালদার প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে। আসুন, আমরা প্লাস্টিক বা কোনো ময়লা ফেলে হালদার জল বিষাক্ত না করি। হালদা বাঁচলে, আমাদের এই স্নিগ্ধ বিকেলগুলোও বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আমি চাই আমাদের জীবনের প্রতিটি সূর্যাস্ত এভাবেই কাটুক, তোমার হাত ধরে, হালদার চরে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্বাধীনতা কমপ্লেক্স দ্রুত সংস্কার করে পুনরায় চালু করা হোক
পরবর্তী নিবন্ধগুণগত ও মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে কাজ করতে হবে