হামের টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশের বেশি নিশ্চিত করার সুপারিশ

হাম আক্রান্ত শিশু ও মায়েদের হামের এন্টিবডির ওপর গবেষণা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও কেন এত রোগী তা খতিয়ে দেখতে হবে : মেয়র

আজাদী প্রতিবেদন | বৃহস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বিভাগে হামে আক্রান্ত ২০০ শিশু এবং ১০০ মায়ের হামের এন্টিবডির ওপর পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপ এবং এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহারের নেতৃত্বে দেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের চারটি বড় হাসপাতালের ১৯৬ জন ল্যাবপরীক্ষায় নিশ্চিত হাম আক্রান্ত শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়। এর মধ্যে চমেক হাসপাতালে ৯৭ জন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৪ জন, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ৪৫ জন এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। গবেষণা সহযোগী হিসেবে ছিলেন চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আসমা ফেরদৌসি, ডা. সেলিনা হক, ডা. আয়েশা বেগম, ডা. মোহাম্মদ জাবেদ বিন আমিন চৌধুরী, ডা. সায়েদা হুমায়দা হাসান, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সানজানা ইসলাম, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. এম এস জামান। গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল’স কনফারেন্স হলে আয়োজিত ‘মিজলস আউটব্রেক ২০২৬ ইন সাদার্ন বাংলাদেশ : এপিডেমিওলজিক্যাল প্রোফাইল, ক্লিনিক্যাল ক্যারেক্টারিস্টিকস, জেনেটিক অ্যানালাইসিস উইথ ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড অ্যান্টিবডি স্ট্যাটাস’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

গবেষণায় চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি মোট ২০০ আক্রান্ত শিশুর তথ্য নিয়ে গবেষণায় করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের মধ্যে ৮৬ দশমিক ২ শতাংশ বা ১৯৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে ৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গবেষণায় হাসপাতালে মৃত্যুহার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের পাশাপাশি মায়েদের অ্যান্টিবডির অবস্থাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মায়েদের ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশ বা ৯১ জনের শরীরে মিজলস আইজিজি অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। কিন্তু মাত্র ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ মা জানিয়েছেন, তারা জীবনে হামের টিকা পেয়েছেন। যেসব মায়ের টিকার ইতিহাস ছিল না, তাদের ৫৫ শতাংশ শিশুই গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছে। আর যেসব মায়ের আইজিজি নেগেটিভ ছিল, তাদের ৪০ শতাংশ শিশু গুরুতর জটিলতার শিকার হয়েছে। এছাড়া মায়ের শরীরে আইজিজি পজিটিভ থাকলেও তা শিশুকে নিউমোনিয়া বা হামের গুরুতর জটিলতা থেকে শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারেনি।

গবেষক দল নিয়মিত হাম টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশের বেশি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ক্যাচআপ টিকাদান এবং বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করতে বাড়ি বাড়ি টিকাদানের কথা বলা হয়েছে। ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত রোগী আলাদা করা, রোগীর অবস্থা অনুযায়ী প্রাথমিক বাছাই এবং সংস্পর্শে আসার পর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতিতে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করে ৬ মাস বয়সে এমআর টিকা দেওয়ার সম্ভাবনা এবং মায়েদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের এমআর বা এমএমআর টিকাদানের বিষয় বিবেচনার সুপারিশও করা হয়েছে।

এদিকে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং আগের কয়েক বছরের ব্যর্থতার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যাকসিনেশন ও আইসোলেশন দুটোই নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও এত রোগী কেন এ বিষয়টি দেখতে হবে। যেহেতু হাম উচ্চ সংক্রমণশীল, তাই এখন মূল কাজ আইসোলেশন নিশ্চিত করা। শিশুর মায়েদের পুষ্টিও নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া নগরীর সিআরবিতে অবস্থিত রেলওয়ে হাসপাতালকে হামে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল করার বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলেও জানান মেয়র। তিনি বলেন, রেলওয়ে হাসপাতালকে যদি ডেডিকেটেড হামের হাসপাতাল করা যায়, তাহলে সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্যোগ নিলে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জসিম উদ্দিন, চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন, চমেক উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আনিসুল হোসেন, চমেক হাসপাতাল মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ হাসান চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বী, চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহম্মদ মুসা মিয়া ও চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. সাজেদুর রহমান ও এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান গোলাম বাকী মাসুদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅবশেষে খাগড়াছড়ি-পানছড়ি ও বাঘাইঘাট-মারিশ্যা সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প অনুমোদন
পরবর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা