হল্যান্ড থেকে

সত্তর ও আশি দশকের বাংলা ছায়াছবির গান এখনো স্মৃতিকাতর করে তোলে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

সেই কবে পড়েছিলাম ‘If music be the food of love, play on. এরাব সব excess of it; that surfeiting, the appetite may sicken and so die‘ যার বাংলা করলে দাঁড়ায় এমনটি– ‘সংগীত যদি হয় প্রেমের খাদ্য, তবে গেয়ে যাও। আমায় দাও তার প্রাচুর্য– যাতে সেই অতি–আধিক্যে তৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা ক্লান্ত হয়ে মরে যায়।’ কালজয়ী ইংরেজ কবি সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের লেখা কমেডি নাটক, ‘Twelfth Night‘-এর শুরু এই শব্দগুলি দিয়ে। ইংরেজ লেখিকা জেইন অস্টিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘Pride and Prejudice‘ ছিল আমাদের পাঠ্য। সংগীত সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘সংগীত ছাড়া জীবন আমার কাছে এক শূন্যতা।‘ বাস্তবিক সংগীত এমন একটি বিষয় যা সবাইকে কম বেশি নাড়া দেয়। সংগীত মানুষকে পাগল করে। সুখে–দুঃখের একমাত্র অবলম্বন সংগীত। গানের মাঝে দুঃখী তার দুঃখ, মনের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করে। কাছের জনের বিয়োগ ব্যথায় রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন– ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু, দহন বিরহ লাগে/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।‘ অনেকের মত সংগীত আমায় টানে। সুর আর কথা মনের মত হলে তো কথা নেই। রাত পার করতে পারি এখনো। আশির দশকের শুরুতে দেশে যখন সাংবাদিকতা শুরু করি মনে আছে, কিছু টাকা হাতে আসতেই এগারশো টাকা দিয়ে একটি সেকেন্ড হ্যান্ড ‘টুই–ইন–ওয়ান’ কিনেছিলাম এক সহপাঠীর কাছ থেকে। তখন নুতন কেনার সামর্থ ছিলনা। টাকা হাতে এলেই গানের ক্যাসেট কিনতাম। অনেক রাতে অফিস থেকে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে খেয়ে ঘুমাবার আগে লো–ভল্যুমে গান শুনতাম। অনেক রাত অবধি। পরদিন নেহায়েৎ ঘুম থেকে কাজের কারণে উঠতে হবে তাই শুয়ে পড়তাম। কিন্তু মনের মধ্যে শেষ–শোনা গানের রেশটি লেগে থাকতো ঘুম না আসা তক। গান গাইতে পারতাম না। কিন্তু শ্রোতা হিসাবে নির্ভেজাল ছিলাম। এমনই ছিল গানের নেশা। সে–নেশা এখনো রয়ে গেছে। যে সময়কার কথা বলছি তখন মান্না দে, শ্যামল মিত্র, লতা, আশা, হেমন্ত মূলত এরাই কাছে টানতো। পাশাপাশি রবীন্দ্র সংগীতে হেমন্ত, সাগর সেন, চিন্ময়, দেবব্রত বিশ্বাস ইত্যাদি। অন্যদিকে নজরুল সংগীতে ফিরোজা বেগম।

সংগীত নির্ভর কোন সংবাদ চোখে পড়লে তাতে চোখ বুলাই। গেল সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে এক সংগীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। ‘ছায়াছন্দ’ শীর্ষক এক সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজক ‘আনন্দ সাংস্কৃতিক অঙ্গন’। যে পোস্টারটি ছাপা হয়েছে তাতে দেখলাম সুহৃদ কবি সাহিত্যিক রাশেদ রউফ তাতে প্রধান সংবর্ধিত অতিথি। অর্থাৎ অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ তিনি। লেখালেখি, সফল সংগঠক হিসাবে তার যে পরিচিতি ও সুনাম তা অনেকের মত আমার অজানা ছিল না। কিন্তু তার বাইরেও যে তার ভেতর আর এক সুপ্ত প্রতিভা লুকিয়ে আছে তার কিঞ্চিৎ আভাহ পেলাম সেদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে। সে প্রসঙ্গে আসছি একটু পর। অনুষ্ঠানের খবরটি দেখেছিলাম সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া তাঁর এক পোস্টে। তাতে উনি লিখেছেন, ‘সত্তর ও আশির দশকের চলচ্চিত্রের গান: বাংলাদেশের সোনালি দিনের সিনেমাগুলোর গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আজো সমান জনপ্রিয় হয়ে আছে মানুষের কাছে। সোনালি যুগের সিনেমায় এমন অনেক গান রয়েছে যা আমার মন ছুঁয়ে যায়।’ কেবল কি রাশেদ রউফের মন ছুঁয়ে যায়? আশির দশক ফেলে এসেছি অনেক আগেই। কিন্তু এখনো মনের মধ্যে সেই যুগের, সে সময়ের অনেক বাংলা ছায়াছবি, সেই ছবিগুলির দৃশ্যায়িত গান এখনো মনকে আন্দোলিত করে। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কেউ আমার চেনা নয়। সংগঠনের নামটিও ছিল আমার অজানা। কিন্তু তাদের আয়োজিত অনুষ্ঠানের নাম ‘ছায়াছন্দ’ আমাকে ‘ম্যাগনেটের’ মত টানতে থাকে। ঠিক করি, নাইবা হলো চেনা–জানা। অনুষ্ঠানের নাম, সে সময়কার গানগুলি আমার চেনা জানা। তার চাইতে বড় হলো যিনি সেদিনের অনুষ্ঠানে প্রধান সম্বর্ধিত ব্যক্তি, তিনি তো আমার ভালো জানাশোনা, কাছের লোক। আর তাই কোন ‘ডাকের’ অপেক্ষা না করে, কোন আমন্ত্রণ/নিমন্ত্রণের অপেক্ষা না করে স্রেফ গানের টানে অনেকটা অনাহুত, কিংবা বলতে পারেন, রবাহুতের মত গেলাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে। সাথে আমার দুই প্রিয়ভাজন– সিনিয়র সাংবাদিক এম নাসিরুল হক এবং প্রাক্তন রেলওয়ে কর্মকর্তা ও সাংবাদিক শফিকুল আলম খান। সে–সন্ধ্যায় আমার ডিনারের প্রোগ্রাম ছিল। তাই সময়ের একটি ব্যাপার ছিল। কিন্তু ভাবলাম যেহেতু রাশেদ রউফ এই অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত, ঠিক সময়ে যে অনুষ্ঠান শুরু হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ঠিক তাই হলো। সময়ের ব্যাপারে আমি বেশ খুঁতখুঁতে। এদিক–ওদিক হবার নয়। সময় মেনে চলা আমার সহজাত স্বভাব। দেশে আমার জানাশোনা যে–কয়েক ব্যক্তি বা বন্ধু আছেন তাদের মধ্যে রাশেদ রউফ যে অন্যতম তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাবলাম–এই অনুষ্ঠানের আয়োজক তিনি না হলেও যেহেতু তিনি আছেন মধ্যমণি হয়ে, অতএব ধরে নিতে পারি অনুষ্ঠান শুরু হবে নির্দিষ্ট সময়ে। তাই হলো। ঘোষণাপত্রে উল্লেখ ছিল অনুষ্ঠান শুরু হবেই সন্ধ্যা সাতটা পনের মিনিটে। আমরা ‘হলে’ প্রবেশ করলাম ঠিক সাতটা পাঁচ মিনিটে। সামনের সারিতে বসা বন্ধুবর রাশেদ রউফ। আমাদের দেখে অনেকটা অবাক, পাশে বসার আমন্ত্রণ জানালেন। আমাদের স্থান করে দিয়ে এক ভদ্রলোক তার জায়গাটি আমার নিষেধ সত্ত্বেও ছেড়ে দিলেন। অনুষ্ঠান শুরু হলো নির্দিষ্ট সময়ে।

সত্তর ও আশির দশকের বাংলাদেশী ছায়াছবির গান দিয়ে ভরা ছিল গোটা অনুষ্ঠান। যারা সেই সময়কার গান গাইলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, গীতা আচার্য্য, রাব্বি গোলাম মইনুদ্দিন, উর্মি শর্মা, ববি চৌধুরী, মোঃ মনোয়ার হোসেন এবং আরো বেশ কয়েক শিল্পী। সময়ের কারণে আমাদের পক্ষে সব গান শোনা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যখন নিতান্ত বাধ্য হয়ে হল ত্যাগ করতে হলো তখন মন হলো মনটাকে বুঝি রেখে এলাম। অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত ব্যক্তি রাশেদ রউফের উচ্চারিত কথাগুলি মনে হলো যেন আমারই মনের কথা। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘সত্তর এবং আশির দশকের সিনেমার গান যখন বাজে তখন আমরা স্মৃতিকাতর হই। কারণ ওই সময় যারা গান লিখতেন তারা ছিলেন সাহিত্যাঙ্গনে প্রথম সারির কবি ও লেখক। তখন গান লিখতেন বিখ্যাত কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামালের মত ব্যক্তি। এদের পাশাপাশি গাজী মাজহারুল হকের মতো বিখ্যাত গীতিকার। যার কারণে ওই সময়কার গানগুলির কথা আমাদের অন্তরকে ছুঁয়ে যেতো।‘ এই প্রসঙ্গে তিনি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা, কালজয়ী গান, ‘তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে’, কিংবা ‘যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে, ওগো তুমি নও সেকি তুমি নও’ গানের উল্লেখ করেন। আসলেও সত্তর আশির দশকের গানের সুর, কথা– উভয়ে মিলে দর্শক–শ্রোতাদের সম্মোহিত করতো। এখনো মনে পড়ে সিনেমা দেখে ‘হল‘ থেকে বের হয়ে হলের সামনে ছোট্ট পুস্তিকা আকারের দেখা ছায়াছবির গানের বই পাওয়া যেত। সেগুলি কিনতাম। বাসায় মাঝে মধ্যে তা দেখে গাইতাম। আজ থেকে কয়েক দশক আগের দেখা ছায়াছবি যেমন, আবির্ভাব, আলোর মিছিল, পিচ ঢালা পথ, স্বরলিপি, দর্পচূর্ণ, বিনিময়, বাবলু, মধুমিলন, জীবন থেকে নেয়া, যোগবিয়োগ –কত নাম বলবো। সবকটি ছবি এখনো মনে আছে, সব গানের কথা পুরোপুরি মনে না থাকলেও অবাক করা ব্যাপার, এখনো অনেক কথা মনে আছে। এখনো মাঝেমধ্যে গুনগুন করি গেয়ে উঠি কখনো–সখনো, যখন একা থাকি। মন যখন বিষণ্ন থাকে নানা কারণে তখনও। মন যখন ভালো থাকে তখনও। অনেক বছর বাংলাদেশের ছায়াছবি দেখা হয়না। প্রবাসে সে–সুযোগও কম। তারপরও যদ্দুর জানি– সত্তর–আশি দশকের বাংলা ছায়াছবির গানের যে কথা আর সুর– তা এখন আর নেই। নেই অমর সংগীত পরিচালক সত্য সাহা, খান আতাউর রহমান, আহমদ ইমতিয়াজ বুলবুল, মকসুদ জামিল মিন্টু, আনোয়ার পারভেজ প্রমুখের মত সংগীত পরিচালক।

ফিরে আসি আনন্দ সাংস্কৃতিক অঙ্গন‘ আয়োজিত অনুষ্ঠানে। পুরানো দিনের ভালো দিকটা বর্তমানে নিয়ে আসার জন্যে তাদের জানাই ধন্যবাদ ও অভিনন্দন। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক, আশরাফ মাসুদের উপস্থাপনা, বাচনভঙ্গি বেশ ভালো। সংগঠনের কর্ণধার লিটন মিত্রকে অভিনন্দন পুরানো দিনকে মনে করিয়ে দেবার জন্যে, যদিওবা সময়ের কারণে পুরো অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়নি। লেখা শেষ করবো যে–কথাটা দিয়ে শুরু করেছিলাম তা দিয়ে। শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম বন্ধুসম রাশেদ রউফের সুপ্ত প্রতিভার কথা। আমার মত অনেক পাঠক/দর্শক/শ্রোতার হয়তো জানা নেই, রাশেদ রউফ গানও গাইতে পারেন। তিনি যে পারেন তার প্রমাণ রাখলেন পুরানো দিনের একটি জনপ্রিয় গানের কয়েক কলি গেয়ে। কথা প্রসঙ্গে তিনি গাইলেন, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা ও আব্দুল আহাদের সুরে শিল্পী বশির আহমদের গাওয়া জনপ্রিয় গান – ‘তোমার কাজল কেশ ছড়ানো বলে, এই রাত এমন মধুর’। রাশেদ রউফ যখন এই গানের কটি কলি গাইলেন, তখন পুরো হল করতালিতে ভরে উঠলো। আর মুহূর্তে আমায় নিয়ে গেলো ফেলে আসা সেই পুরানো দিনে। (২৩–০৯–২০২৬)।

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅস্থিরতা ও মানবিক বিপর্যয়
পরবর্তী নিবন্ধশ্রীমাই খালে যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ