হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার দাবি করা হলেও গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে গতকাল শুক্রবার ভোর পর্যন্ত কৌশলগত এই জলপথে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান দাবি করেছে, তাদের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলার পর তারা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর ওপর ‘উসকানিবিহীন হামলা’ চালিয়েছে ইরান। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে সৌদি আরব ও কুয়েতের নতুন সিদ্ধান্ত। এতদিন আপত্তি থাকলেও এখন তারা যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক তৎপরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রথমে বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করে। সেখানে ঘটনাটিকে ইরানি বাহিনী ও ‘শত্রুপক্ষের’ মধ্যে সংঘটিত ‘গুলিবিনিময়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সমপ্রচারমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালিতে একটি ইরানি ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর পর সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। ইরানের দাবি, এরপর তারা প্রণালিতে অবস্থানরত ‘শত্রুপক্ষের ইউনিটগুলোকে’ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একইসঙ্গে ইরানের বিভিন্ন সামরিক সূত্র বলছে, জাস্ক বন্দরের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাবে দ্রুত প্রতিশোধমূলক অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, ওমান উপসাগরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ ইরানের হামলার মুখে পড়ে। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, ইউএসএস ট্রাকস্টন, ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা এবং ইউএসএস ম্যাসনকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযান ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। তবে মার্কিন বাহিনী হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে এবং কোনো যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য, হামলার জবাবে তারা ‘আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ নেয় এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ড্রোন ঘাঁটি, কমান্ড সেন্টার ও নজরদারি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা বাড়াতে চায় না, তবে মার্কিন বাহিনী ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। রাষ্ট্রীয় সমপ্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়া একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের কাছে আরেকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের দাবি, বান্দার খামির, সিরিক ও কেশম দ্বীপের উপকূলীয় এলাকাতেও আকাশপথে হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন সামরিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষতি’ করেছে বলে দাবি করা হয়। যদিও এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনীও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে তারা জানায়, জাস্ক বন্দরের কাছে একটি ইরানি ট্যাংকারে হামলার পর ‘তীব্র বিস্ফোরক ওয়ারহেড’ ব্যবহার করে পাল্টা আক্রমণ চালানো হয়। তাদের দাবি, হামলার পর ‘শত্রুপক্ষের তিনটি অনুপ্রবেশকারী জাহাজ দ্রুত এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।’
এদিকে ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ ও রাজধানী তেহরানে একাধিক বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করেছে। আধা–সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স ও তাসনিম জানিয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে এসব বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক প্রতিবেদক দাবি করেন, বন্দর আব্বাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কোনো হতাহত হয়নি এবং পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ রয়েছে।
সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে। এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ঘটনাকে ‘হালকা ধাক্কা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের হামলায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলায় ইরানি বাহিনীর ‘বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। ট্রাম্প লেখেন, আমাদের ডেস্ট্রয়ারগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো সহজেই প্রতিহত করা হয়েছে। শত্রুপক্ষের নৌ সক্ষমতা দ্রুত ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনও ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেবে না। একইসঙ্গে তিনি জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, আলোচনা খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। তবে চুক্তি না হলে ইরানকে বড় মূল্য দিতে হবে।
জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন সমপ্রতি একটি ১৪ দফা সমঝোতা কাঠামো বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, যা ভবিষ্যৎ পারমাণবিক আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও ইরানের পার্লামেন্টের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য একে ‘ইচ্ছার তালিকা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও সমপ্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘অবিশ্বাস’ থাকা সত্ত্বেও তেহরান কূটনৈতিক আলোচনায় প্রস্তুত রয়েছে। তবে দেশটির প্রকৃত ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় আইআরজিসি ও সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।
বর্তমানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও সামরিক কর্তৃত্ব মোজতবা খামেনির হাতে। দুই মাস আগে তিনি তার বাবার স্থলাভিষিক্ত হন। দায়িত্ব গ্রহণের পর জনসমক্ষে খুব কম দেখা গেলেও তার নামে প্রচারিত বার্তাগুলোতে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দৃঢ় অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সৌদি আরব ও কুয়েতের সিদ্ধান্ত। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযানের জন্য এখন নিজেদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে দুই দেশ। এর আগে তারা এই বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। তবে সামপ্রতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে অবস্থান পরিবর্তন করেছে রিয়াদ ও কুয়েত সিটি।
মার্কিন ও সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আবারও বাণিজ্যিক জাহাজকে সামরিক পাহারায় হরমুজ প্রণালি পার করানোর পরিকল্পনা করছে। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে পরিচিত এই কার্যক্রম চলতি সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টা চালু থাকার পর সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। এখন পেন্টাগন নতুন করে এর সময়সূচি নির্ধারণ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। সামপ্রতিক সংঘর্ষের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দুই দশমিক তিন শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৪০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে মার্কিন ক্রুডের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬ দশমিক ৮০ ডলারে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে তেল সরবরাহ ব্যাহত হলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।











