কুমিল্লায় মহাসড়কের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর লাশ গোপালগঞ্জে তার গ্রামের বাড়ি পৌঁছেছে। গতকাল রোববার বিকাল ৫টার দিকে টুঙ্গিপাড়ার ডুমরিয়া ইউনিয়নের বাবুপাড়া গ্রামে কফিনবন্দি হয়ে ফেরেন এই রাজস্ব কর্মকর্তা। খবর বিডিনিউজের।
লাশ বাড়ির আঙিনায় ঢুকতেই স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। শোকে স্তব্ধ স্ত্রী ঊর্মি হীরা শেষবারের মতো স্বামীকে স্পর্শ করেন। স্বামী–স্ত্রীর চিরবিদায়ের মুহূর্তটি দেখে চোখে পানি চলে আসে উঠোনভর্তি মানুষের। স্বামীর মৃত্যু নিয়ে ঊর্মির খুব বেশি জিজ্ঞাসা ছিল না। তিনি শুধু জানতে চাইছিলেন, শুক্রবার রাতে তার স্বামীর সঙ্গে কী ঘটেছিল? শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন বুলেট। পরের দিন সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে তার লাশ পাওয়া যায়। বুলেটের মুখে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা বলেছে পুলিশ। বুলেট বৈরাগী ৪১তম বিসিএস নন–ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে চাকরি শুরু করেন। তিনি চট্টগ্রামে একটা কর্মশালায় অংশ নিয়ে ফিরছিলেন। সবশেষ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কুমিল্লার বিবির বাজার স্থলবন্দরে দায়িত্বরত ছিলেন বুলেট। তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন কুমিল্লার রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায়। বুলেট মা–বাবার একমাত্র সন্তান। রোববার ছেলের লাশ বাড়ি পৌঁছানোর পর মা নীলিমা বৈরাগী বলেন, ‘বুলেট আমার বুকের ধন। চরম দারিদ্রতার মধ্যে, অনেক কষ্ট করে তাকে মানুষ করেছি । এ শোক আমি সইতে পারছি না। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’ বুলেটের শাশুড়ি মমতা হীরা বলেন, আমার একমাত্র মেয়ে ঊর্মি। তার বিয়ে হয়েছে চার বছর ৩ মাস আগে। তাদের একটি ছেলে আছে, সোমবার (২৭ এপ্রিল) তার প্রথম জন্মদিন ছিল। তিনি বলেন, আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি। বুলেটের চাচা বিমল বৈরাগী বলেন, জীবনে কাউকে সে নখের আঁচড়ও দেয়নি। সেই শান্ত ছেলেটির লাশ সড়কের পাশে পাওয়া গেল! আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। বুলেটকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে স্বজনরা বলছেন, তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
চাচাতো বোন বৃষ্টি বৈরাগী বলেন, আমার ভাইকে এতটা নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে যে, মুখ দেখে চেনাই যাচ্ছে না। তার দাঁত ভেঙে ফেলা হয়েছে।
ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে বুলেট শুক্রবার কুমিল্লায় ফিরছিলেন বলে জানান স্ত্রী ঊর্মি। ‘জন্মদিন পালন করে রোববার ভোরেই বুলেট চট্টগ্রামে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ হলো না।’
বুলেটের মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন মা নীলিমা বৈরাগী। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। রোববার দুপুর পর্যন্ত হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তবে পাঁচজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য দিয়েছেন র্যাব–১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৫ জনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি, তারা সবাই পেশাদার ছিনতাইকারী।
স্বজনদের তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে ঢাকাগামী বাসে ওঠেন বুলেট। তার কুমিল্লা বাইপাসে নেমে যাওয়ার কথা ছিল। পরিবারের সঙ্গে তার সবশেষ কথা হয় রাত ২টা ২৫ মিনিটের দিকে। তখন তিনি কুমিল্লার টমছন ব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছানোর কথা বলেন। মা নীলিমা বৈরাগীর ভাষ্য, শেষবার যখন কথা হয়, তখন ছেলের ফোন থেকে আসা কণ্ঠটি অপরিচিত মনে হয়।
স্বজনরা জানান, একটা সময় গিয়ে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। খোঁজাখুঁজি করে বুলেটের সন্ধান না পেয়ে তারা শনিবার সকালে বিষয়টি পুলিশকে জানান। একটা জিডিও করেন। এর কিছুক্ষণ পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এ আসা ফোনের সূত্র ধরে সন্ধান মেলে নিথর বুলেটের।














