প্যারিসের ক্যাফে দ্য ফ্লোর–এর টেবিলে জমে ওঠা সিগারেটের নীল ধোঁয়া আর কফির তীব্র গন্ধের সমান্তরালে যে জীবনটি বয়ে যেত, তা কেবল এক ফরাসি বুদ্ধিজীবীর রোজনামচা ছিল না। সেটি ছিল একটি সময়ের কম্পন, যা মানুষের বুকের ভেতরের আদিম শূন্যতা আর স্বাধীনতাকে একাকার করে দিয়েছিল। জঁ–পল সার্ত্রে নামের সেই চশমা পরা, ঈষৎ টেরা চোখের মানুষটি যখনই কোনো কাগজে কলম ছোঁয়াতেন, মনে হতো বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে। তাঁর দর্শন কোনো ঠান্ডা লাইব্রেরির আলমারিতে বন্দি থাকা নিস্পৃহ তত্ত্ব ছিল না, তা ছিল ফুটপাথের ধুলো, যুদ্ধের বারুদ আর রাজপথের স্লোগানের মধ্য দিয়ে রক্তমাংসের মানুষ হয়ে ওঠার এক অবিরাম আর্তি।
সার্ত্রের এই যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র আর একাকীত্বের বোধ, তার শিকড় লুকিয়ে ছিল তাঁর শৈশবের ধূসরতায়। মাত্র পনেরো মাস বয়সে পিতাকে হারিয়ে মাতামহ চার্লস সোয়াইৎজারের বইয়ের সাম্রাজ্যে তাঁর আশ্রয় নেওয়া। চোখের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা আর অদ্ভুত শারীরিক গড়নের কারণে লা লাক্সেমবার্গ গার্ডেনের খেলার সাথীদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়া সেই ছোট্ট বালকটি বুঝেছিল, মানুষের আদি রূপটি আসলে নিঃসঙ্গতার। অন্যের বিচারক চোখের তীব্র চাউনি কীভাবে নিজের ভেতরের সত্তাকে দুমড়ে–মুচড়ে দেয়, তা তিনি নিজের হাড় দিয়ে টের পেয়েছিলেন। শৈশবের সেই বিচ্ছিন্নতা ও বইয়ের পাতার কাল্পনিক জগৎই পরবর্তীতে তাঁর দর্শনের মূল কাঠামো গড়ে দিয়েছিল, যেখানে প্রতিটি মানুষ এক চিরন্তন শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে।
প্যারিসের একোল নরমাল (ফ্রান্সের সরকারি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) সুপিরিয়রে দর্শন পড়ার দিনগুলোতে সার্ত্রের মেধার দীপ্তি ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে নাড়া দিতে শুরু করে। সেখানেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে–সিমন দ্য বোভোয়ারের সাথে সাক্ষাৎ। সিমন কেবল তাঁর প্রেমিকা ছিলেন না, ছিলেন তাঁর চিন্তার সমান্তরাল এক ক্ষুরধার প্রতিপক্ষ এবং আজীবনের বুদ্ধিবৃত্তিক সহযাত্রী। প্রাতিষ্ঠানিক বুর্জোয়া জীবন আর বৈবাহিক শৃঙ্খলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৯২৯ সালে তাঁরা এক আশ্চর্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা একে অপরকে “অপরিহার্য ভালোবাসা”র বন্ধনে জড়িয়ে রাখার পাশাপাশি নিজেদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন, যেখানে অন্য যেকোনো সম্পর্কের টানাপোড়েনকে কোনো লুকোচুরি ছাড়াই পরস্পরের সামনে উন্মোচন করার অসীম সাহস ছিল। এই বন্ধনটি ছিল তাঁদের দুজনের অস্তিত্ববাদী দর্শনের এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি, যেখানে মানুষের স্বাধীনতাকে কেবল খাতায় না লিখে প্রতিদিনের যাপনে প্রমাণ করা হতো।
কিন্তু এই তত্ত্বের ল্যাবরেটরিকে ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতার মুখে ঠেলে দিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৯ সালে সার্ত্রে যখন সেনাবাহিনীতে আবহাওয়াবিদ হিসেবে যোগ দিলেন, তখন যুদ্ধকে তাঁর কাছে এক শান্ত ও কাব্যের মতো মনে হয়েছিল। তবে ১৯৪০ সালে জার্মানদের হাতে বন্দি হয়ে যখন তিনি Trier–এর যুদ্ধবন্দি শিবিরে দীর্ঘ নয়টি মাস পার করলেন, তখন তাঁর ভেতরের নিষ্ক্রিয় দার্শনিক সত্তাটি চূর্ণ–বিচূর্ণ হয়ে গেল। সেই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ব্যারাকে বসে মার্টিন হাইডেগারের জটিল দর্শনগ্রন্থ পড়ার ফাঁকে তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের আসল পরীক্ষা শুরু হয় যখন সে সমস্ত দেয়াল ভেঙে চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ায়। চোখ ও শরীরের অসুস্থতার ভান করে কিংবা কোনো রহস্যময় উপায়ে ভিশি সরকারের চুক্তি ব্যবহার করে যখন তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে অবরুদ্ধ প্যারিসে ফিরলেন, তখন তাঁর মনে এক অব্যক্ত অপরাধবোধ বাসা বেঁধেছিল। প্যারিসে ফিরে নাৎসি প্রতিরোধে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অংশগ্রহণ এবং ‘সোশ্যালিজম এত লিবের্তে’ গঠন ছিল সেই অপরাধবোধ ও নৈতিক দায়বদ্ধতারই এক রক্তাক্ত প্রকাশ। এই অবরুদ্ধ প্যারিসের বুকেই যুদ্ধের ভয়াবহতাকে সাক্ষী রেখে ১৯৪৩ সালে জন্ম নিল তাঁর মহত্তম সৃষ্টি ‘ল্য এত্রে এ ল্য নেওঁ’ (Being and Nothingness)।
যুদ্ধোত্তর ফ্রান্সে সার্ত্রে যখন তাঁর অস্তিত্ববাদের মূল বাণীটি প্রচার করলেন-“অস্তিত্ব সারবত্তার পূর্বগামী” (Existence precedes essence)-তখন তা এক সর্বনাশা যুদ্ধের ধাক্কায় বিধ্বস্ত তরুণদের বুকে এক নতুন আশার আলো জ্বেলে দিল। সার্ত্রে বললেন, কাগজের ছুরি বা কোনো জড় বস্তু তৈরি করার আগে তার একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা ছাঁচ থাকে, কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এমন কোনো ছাঁচ বা ঈশ্বরপ্রদত্ত নিয়তি নেই। মানুষ প্রথমে পৃথিবীতে আসে, শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়ায়, এবং তারপর নিজের প্রতিটি কাজ ও পছন্দের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় নিজে নির্মাণ করে। এই অবাধ স্বাধীনতাই মানুষকে এনে দেয় এক ভয়ঙ্কর উদ্বেগ, কারণ নিজের যেকোনো ভুলের জন্য সে অন্য কাউকে, এমনকি ঈশ্বর বা সমাজকেও দায়ী করতে পারে না। সার্ত্রের ভাষায়, মানুষ “স্বাধীনতার জন্য দণ্ডিত”। এই স্বাধীনতার ভয় থেকে বাঁচতে মানুষ যখন নিজেকে কোনো পূর্বনির্ধারিত সামাজিক ভূমিকা, পেশা বা নিয়তির আড়ালে লুকিয়ে ফেলে এবং দাবি করে যে পরিস্থিতির কারণে সে নিরুপায়, সার্ত্রে তাকেই তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বলেছেন ‘ব্যাড ফেইথ’ বা স্ব–প্রতারণা। তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘নো এক্সিট’–এর চরিত্রগুলো যখন নরকের অগ্নিশিখা না খুঁজে একে অপরের বিচারের দৃষ্টির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছটফট করে, তখনই উচ্চারিত হয় সেই অমোঘ সত্য-”নরক হচ্ছে অন্য মানুষ”।
পঞ্চাশের দশকে পা রেখে সার্ত্রের এই ব্যক্তি–স্বাধীনতার দর্শন এক বিশাল বাঁক নেয় সমষ্টির মুক্তির আন্দোলনে। তিনি উপলব্ধি করেন, যে সমাজে কোটি কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য আর শোষণের শিকার, সেখানে কেবল তাত্ত্বিক স্বাধীনতার কথা বলা এক নির্মম পরিহাস। ফলে তাঁর চিন্তা মার্ক্সবাদের কোল ঘেঁষে প্রবাহিত হতে শুরু করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রভাবশালী পত্রিকা ‘লে তঁ মদের্ন’ পুঁজিবাদ ও স্টালিনবাদী একনায়কতন্ত্র–উভয়ের বিরুদ্ধেই এক তীব্র প্রতিবাদের মঞ্চ হয়ে ওঠে। এই সময় তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লড়াই ছিল উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ফরাসি রাষ্ট্রের বর্বরতার বিরুদ্ধে তিনি যেভাবে গর্জে উঠেছিলেন, তা ছিল প্রায় আত্মহননের শামিল। ১৯৬১ সালে বিপ্লবী মনস্তাত্ত্বিক ফ্রান্ত্জ ফানোঁর ‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’ গ্রন্থের মুখবন্ধে সার্ত্রে যে অগ্নুৎপাত ঘটিয়েছিলেন, তা ফরাসি বুর্জোয়া সমাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তিনি ফানোঁর ধারণাকে সমর্থন করে জোর দিয়ে বলেছিলেন, উপনিবেশবাদীদের দীর্ঘদিনের চাপিয়ে দেওয়া সহিংস শৃঙ্খল ভাঙতে শোষিত মানুষের সশস্ত্র প্রতিরোধ কেবল রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লড়াই নয়, বরং তা শোষিতের নিজের মানবিক গৌরব ও সত্তা ফিরে পাওয়ার এক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর।
১৯৬৮ সালের মে মাসে যখন প্যারিসের রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠল ছাত্র ও শ্রমিকদের ব্যারিকেডে, তেষট্টি বছর বয়সী সার্ত্রে তখন কোনো আরামদায়ক অ্যাকাডেমিক দূরত্ব বজায় রাখেননি। তিনি সরাসরি রাজপথে নেমে ক্ষুব্ধ তরুণদের সাথে কাঁধ মিলিয়েছিলেন, ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সুবিধাবাদী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং নিষিদ্ধ বামপন্থী পত্রিকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজে হাতে বিলি করেছিলেন। তাঁর কাছে মে ৬৮–র সেই বিদ্রোহ ছিল মানুষের আত্মপ্রতারণার খোলস ভেঙে এক মুক্ত ও বৈপ্লবিক সত্তায় রূপান্তরিত হওয়ার শ্রেষ্ঠ উৎসব।
সার্ত্রের এই যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে মাথা নত না করার জেদ, তার চরম পরীক্ষা হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। সুইডিশ একাডেমি যখন তাঁর আত্মজীবনী ‘লে মো’–র জন্য তাঁকে সাহিত্যের নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে, তখন তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি লিখেছিলেন, একজন লেখককে কখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীকে পরিণত হতে দেওয়া উচিত নয়, কারণ তা পাঠকের ও লেখকের মাঝখানের স্বাধীন শব্দগুলোকে কলুষিত করে। পুরস্কারের বিপুল অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের জন্য সহজ ছিল না, কারণ সেই অর্থ দিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনকে সাহায্য করতে পারতেন। কিন্তু সাময়িক সামাজিক উপকারের চেয়ে নিজের অস্তিত্ববাদী সততা আর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলমুক্ত থাকাকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
১৯৮০ সালের ১৫ এপ্রিল যখন প্যারিসের এক হাসপাতালে এই মহৎ চিন্তাবিদের ফুসফুসের স্পন্দন চিরতরে থেমে গেল, তখন প্যারিসের রাস্তায় নেমেছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের এক মৌন মিছিল। তাঁরা কোনো মৃত রাজাকে বিদায় জানাতে আসেননি, তাঁরা এসেছিলেন সেই মানুষটিকে বিদায় জানাতে যিনি তাঁদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নিজের স্বাধীনতার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়। আজ একবিংশ শতাব্দীর এই কর্পোরেট ও ভার্চুয়াল নিয়ন্ত্রণের যুগে দাঁড়িয়েও, যখন মানুষ নিজের আসল পরিচয় হারিয়ে যন্ত্রের পুতুলে পরিণত হচ্ছে, তখন সার্ত্রের সেই ক্ষুরধার কণ্ঠস্বর আমাদের বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো আঘাত করে–মানুষ পরিস্থিতির দাস নয়, সে তার নিজের প্রতিটি সিদ্ধান্তের এক জীবন্ত দলিল।











