চট্টগ্রাম নগরে তিন দিনব্যাপী ভূমি সেবা মেলা উদ্বোধন করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে এবং ফিতা কেটে মেলা উদ্বোধন করা হয়। এরপর জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় যৌথভাবে মেলা উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করে। পরে সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভার। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন।
তিনি বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় জনগণের ভোগান্তি লাঘবে ‘জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা : সুরক্ষিত ভূমি, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’ স্লোগানকে সামনে রেখে ভূমি মন্ত্রণালয় সারা দেশে একযোগে তিন দিনব্যাপী (১৯–২১ মে) ভূমিসেবা মেলার আয়োজন করেছে। আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম একটি ক্ষেত্র হলো জনবান্ধব ভূমিসেবা। বাংলাদেশে বেশ কিছু সেবা ডিজিটালাইজড হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক সেবা নিতে এখন আর অফিসে যেতে হয় না। ভূমি সংক্রান্ত সেবা পেতে জনগণকে যাতে অফিসে যেতে না হয় এবং সুবিধামতো সময়ে একটি ডিভাইস ব্যবহার করে সহজেই সেবাগুলো নিতে পারেন সে লক্ষ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ আমাদের অফিসগুলো কাজ করে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসন জানায়, মেলায় ৫ জন ভূমিহীনকে কৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের কবুলিয়ত ও সেবা প্রত্যাশীদের হাতে খতিয়ান বিতরণ করা হয়েছে। মুহাম্মদ শওকত আলম নামে একজন বয়স্ক ব্যক্তি হাটহাজারীর ‘মাইজপট্টি’ মৌজার স্থলে ‘ফটিকা’ মৌজা লিখে বিএস ও আরএস খতিয়ানের জন্য আবেদন করে না পেয়ে ভূমিসেবা মেলায় এসে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জানান। পরে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে পুনরায় ‘মাইজপট্টি’ মৌজার আবেদন নেওয়া হয়। ভূমি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় তাৎক্ষণিক তিনি খতিয়ান গ্রহণ করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের আওতায় ‘অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা সিস্টেম : পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আগামী ২১ মে সকাল ১০টায় বিতর্ক, পুরস্কার বিতরণী, ভূমি জনসচেতনতামূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলার সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
আলোচনা সভায় বিভাগীয় কমিশনার বলেন, এই মেলার মাধ্যমে আমরা ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় সেবা হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছতার সাথে প্রদান করব। মেলায় এসে জনগণ যে সেবাগুলো পাবেন, আমাদের অফিসগুলোতেও সেভাবে সেবা পাবেন। এটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। ধীরে ধীরে আমাদের যে ট্রান্সফরমেশন হচ্ছে, এই ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে সেবা প্রার্থীরা স্বশরীরে হাজিরা থেকে মুক্তি পাবেন। এই স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জনবান্ধব ভূমিসেবা নিশ্চিত করা জনগণের দাবি। সেই দাবি বাস্তবায়নে সরকার ও আমরা সরকারি কর্মকর্তারা বদ্ধপরিকর। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ভূমিসেবা মেলা উদ্বোধন হয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতসহ হয়রানি বন্ধে আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ রয়েছে। আমরা চাই, জনগণের হয়রানি বন্ধ হোক, স্বল্প সময়ে কাঙ্ক্ষিত ভূমিসেবা নিশ্চিত হোক।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নিজেদেরকে আপগ্রেড করতে হবে। প্রযুক্তি মানুষের সৃষ্টি একটি ফর্মুলা। আমরা যেন প্রযুক্তিকে কোনোভাবে দূরে ঠেলে না দিই, প্রযুক্তিকে ভয় না পাই। আপনাকে কেউ সহযোগিতা না করলে তা আমরা শনাক্ত করতে পারব, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারব। আগামীতে ভূমি ব্যবস্থাপনায় হয়রানি বন্ধে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন–আমরা এ নিশ্চয়তা দিতে চাই।
তিনি বলেন, প্রতি বুধবার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গণশুনানি হয়। প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা চট্টগ্রাম। ইতোমধ্যে প্রবাসীদের গণশুনানি বাংলাদেশে সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম জেলা থেকে শুরু করি। লন্ডন, কাতার, সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে চট্টগ্রামের প্রবাসী ভাইয়েরা আছেন। আমরা তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারি, অধিকাংশ সমস্যাই ভূমি সংক্রান্ত। আমাদের কাছে মানুষ যখন কোনো সমস্যা নিয়ে আসে, সেখানেও দেখি ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা বেশি। আইন–আদালতের চাপ্টারে দেখলে সেখানেও দেখি ৭০ শতাংশ সমস্যা জায়গা–জমির মামলা সংক্রান্ত। কবরস্থান দখলেরও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দেশ–বিদেশের সেবা প্রত্যাশীরা যদি তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় বা আমরা হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে পারি তাহলে মনে করব এ আয়োজন সফল হয়েছে।
বাকলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিফাত বিনতে আরার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) শারমিন জাহান ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত রেঞ্জ ডিআইজি মো. নাজমুল হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাখাওয়াত জামিল সৈকত। অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলোকপাত করেন কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হুছাইন মুহাম্মদ।












