স্ক্র্যাপ জাহাজে গ্যাস লিকেজ, শিপইয়ার্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু

ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিংয়ে এ দুর্ঘটনা । ইয়ার্ডে বিক্ষুব্ধ জনতার ভাঙচুর, তদন্ত কমিটি । একটি ইয়ার্ডে ২৫ বছরে এত লোকের প্রাণহানি ঘটেনি । ইয়ার্ড বন্ধ ছিল : কর্তৃপক্ষ । শুক্রবার বন্ধ থাকার কথা, কিন্তু মালিকপক্ষ বন্ধ রাখেনি : নিহতদের স্বজন

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি | শনিবার , ১৫ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে এলএনজি নামে স্ক্র্যাপ জাহাজে গ্যাস লিকেজ হয়ে বিষক্রিয়ায় সেফটি ইনচার্জসহ ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় আহত হয়েছেন ১০ জনের বেশি। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট এবং স্থানীয়দের। এদিকে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতা ইয়ার্ডে ভাঙচুর করেছে বলে দাবি করেছে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনা তদন্তে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শিপইয়ার্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা একটি সংস্থা বলছে, এ দুর্ঘটনা ছিল ভয়াবহ। গত ২৫ বছরে কোনো একটি ইয়ার্ডে এত লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এই ইয়ার্ডটি গ্রিন ইয়ার্ড, অথচ শ্রম আইন ভঙ্গ করায় এদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। বারবার নোটিশ, পরিদর্শন এবং নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও এরা যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ভাটিয়ারী উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ৫ বছর আগে আনা এলএনজি নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজে অন্য দিনের মতো প্রায় ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। এ সময় গ্যাসের ট্যাংকে লিকেজ হয়। এতে করে শিপইয়ার্ডে কার্বন মনোঙাইড বিষক্রিয়ায় ঘটনাস্থলে ২০ জনের বেশি শ্রমিক আহত হন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে ইয়ার্ডে প্রধান ফটকের সামনে নিয়ে এলে ৩ জনের মৃত্যু হয়। বাকিদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেনাবাহিনীও উদ্ধার কাজে অংশ নেয়।

চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন সীতাকুণ্ডের আকবর আলী হাটের দুই ভাই মোহাম্মদ সেকান্দরের ছেলে মোহাম্মদ মনসুর (৫৫) ও মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন (৫১), পাবনার সুজানগর ছৈয়দপুরের মোহাম্মদ আলীর ছেলে মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সুজন (৩৬), গাইবান্ধা সদরের উত্তর কুপতলার মোহাম্মদ হারুন মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ রানা মিয়া (২৩), সীতাকুণ্ডের খাদেমপাড়ার আবদুল মালেকের ছেলে হাবিবুর রহমান (৫১), ভাটিয়ারীর শনি ঠাকুরপাড়ার হরেন্দ্র দাশের ছেলে পলাশ দাশ (৩৫), একই এলাকার প্রদীপ দাশের ছেলে সানি দাশ (২৩), গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ কিমাত হলুদিয়া এলাকার মোহাম্মদ রানা মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ খোকন মিয়া (২৩) ও সীতাকুণ্ডের মতিউর রহমান (১৯)

জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম আজাদীকে বলেন, নিহত ৯ জনের মধ্যে একজনের ময়নাতদন্ত হয়েছে। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই বাকিদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।

ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। কিন্তু সকাল ৯টার সময় এলএনজি জাহাজে একটি ট্যাংক লিকেজ হয়। খবর পেয়ে স্থানীয় ও বহিরাগত কিছু লোক তা দেখতে আসে। তখন কয়েকজনের মৃত্যু হয়। কয়েকজন আহত হয়েছে। তাদের সংখ্যা ও নামপরিচয় জানাতে পারেননি তিনি।

তবে নিহত পলাশ দাশের স্বজন মমতা রানী দাস ও সানি দাসের স্বজনদের অনেকে অভিযোগ করে বলেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু মালিকপক্ষ ইয়ার্ডটি বন্ধ রাখেননি। অন্যদিনের মতো কাজ চলছিল। ঘটনার পর অনেক ব্যক্তিকে বাঁচানো যেত, কিন্তু তারা গেট খোলেননি। সেজন্য গেটের সামনে আহত কয়েকজন মারা গেছেন।

কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আব্দুল্লা আল মামুন বলেন, সকাল ৯টার দিকে খবর পেয়ে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস ও কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। ঘটনাস্থলে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত তিনজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেছি। আহত অন্যদের আমরা ও স্থানীয়রা উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর অন্যান্য ক্লিনিকে পাঠাই।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, স্ক্র্যাপ জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজ হয়ে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

এদিকে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার সময় চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ফখরুল ইসলাম, ওসি মহিনুল ইসলাম, পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর এবং র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি : বাংলানিউজ জানায়, ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের দুর্ঘটনা তদন্তে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক ও সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সদস্যসচিব করা হয়েছে। সদস্য করা হয়েছে সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রতিনিধিকে। তদন্তের স্বার্থে কমিটি প্রয়োজনে এক বা একাধিক সদস্য কোঅপ্ট করতে পারবে।

কমিটিকে দুর্ঘটনার উৎস ও কারণ উদঘাটন, দুর্ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়দায়িত্ব আছে কি না তা উদঘাটনপূর্বক ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধকল্পে সুপারিশসহ সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআজ দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন