‘থুসিডাইডিস ট্রাপ’, এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। থুসিডাইডিস ছিলেন খ্রীস্টপূর্ব ৪৬০–৩৯৫ অর্থাৎ বর্তমান থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগে গ্রীসে বসবাসরত একজন এথেনীয় বীর সেনাপতি। একই সাথে তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী এক রাজনীতি বিজ্ঞানীও। বলা হয় তিনি বিজ্ঞান ভিত্তিক ইতিহাস চর্চার অগ্রণী পুরুষ। এই থুসিডাইডিস এথেন্স এবং স্পার্টার মধ্যে সংগঠিত যুদ্ধ সমূহের বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করেন। সেই সময়ে স্পার্টা ছিল প্রতিষ্ঠিত তবে অবক্ষয়মান শক্তি আর এথেন্স উদীয়মান। দুটি শক্তির মাঝে একধরনের উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা আর সন্দেহের প্রবল স্ প্রবাহমান তখন। প্রতিষ্ঠিত শক্তি স্পার্টার সন্দেহ এথেন্স ক্রমান্বয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে তার শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং পরিণামে এথেন্স সময়ে স্পার্টাকে পরাজিত করতে পারে। এই সন্দেহের উত্তেজনা দুটি শক্তির মাঝে যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে এবং অবশেষে দুটি শক্তি বিপর্যয়কর যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
প্রতিষ্ঠিত অবক্ষয়মান আর উদীয়মান দুটি শক্তির পারস্পরিক সন্দেহের কারণে যে যুদ্ধ সংগঠিত হতে পারে থুসিডাইডিস এর সেই ধারনারকে বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভাড এর অধ্যাপক গ্রাহাম এলিসন বিগত প্রায় ৫০০(পাঁচশত) বছরে সংগঠিত ১৬(ষোল) টি যুদ্ধের উপর গবেষণা পরিচালনা করেন। অধ্যাপক এলিসন থুসিডাইডিস এর সেই ধারনার সত্যতা খুঁজে পান। প্রতিষ্ঠিত শক্তি আর উদীয়মান শক্তির এই দন্ধে জড়ানোর প্রবণতাটিকে অধ্যাপক গ্রাহাম এলিসন নাম করন করেন ‘ থুসিডাইডিস ট্’ (Thucydides Trap) হিসাবে।
বর্তমান বিশ্বে আমেরিকা এবং চীনের অবস্থান এবং কার্যক্রম ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে ‘থুসিডাইডিস ট্্রাপ’ এর আলামত খুঁজে পেতে বেগ পেতে হবে না। শিরোনামের সাথে ওতোপ্রতভাবে সংশ্লিষ্টতার কারণে নিচের লেখাটুকু আমার ২০২০ সালে প্রকাশিত বই ‘শেষ সীমান্তের পর কোথায় যাব আমরা’ থেকে উদ্ধৃত না করার ইচ্ছা সংবরণ করতে পারলাম না।
ছোট বয়সে স্কুল শিক্ষকের প্রশ্ন: পৃথিবীতে কোন দেশ প্রথম কাগজ আবিষ্কার করে? চীন দেশ। এই প্রশ্ন উত্তরের মধ্যে ঐ জানা সীমাবদ্ধ থাকেনি। যে বইয়ের পাতায় এই উত্তর লেখা ছিল সে কাগজ বহুবার ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছি, অনুভব করেছি অন্তর দিয়ে – মানুষের জ্ঞানার্জনের জন্য, অর্জিত জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা রেখে যেতে, পৃথিবীর দেশে দেশে নৈঃশব্দ কোলাহল সৃষ্টির জন্য চীনারা কী এক মহৎ আবিষ্কার না করেছে। চাই লুন (ঞং্থধর খঁহ) ১০৫ খ্রীষ্টাব্দে হান রাজবংশের শাসনামলে মানুষের জন্য এই অমূল্য আবিষ্কারটি করেন। ৭৫১ খ্রীষ্টাব্দে কিছু চীনা কাগজ তৈরীর বিশেষজ্ঞকে আরবরা ধরে নিয়ে যায়। এই সূত্রে বাগদাদ আর সমরকন্দ কাগজ তৈরীর কৌশল জেনে যায়। অবিশ্বাস্য হলেও একথা সত্য মাত্র ১২০০ শতাব্দীতে ইউরোপীয়রা আরবদের কাছ থেকে কাগজ তৈরী করতে শিখে।
আশৈশব খেতে বসে চীনা মাটির তৈজস পত্র, চীন সবসময় মানসিকভাবে কেমন জানি কাছেই টেনেছে। ইস্তাম্বুলে এপ্রিলে লাইলাক ফুল যখন মোহনীয় রূপে ছোট ছোট পাহড়গুলিকে আবেশিত করে রেখেছিল – বসফরাসের বুকে হেলে পড়া সূর্যের সুবর্ণ আলো যখন ঝিলমিল তেমন এক রমনীয় বিকেলে তুর্কী জাদুঘরে ঢুকে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ থেকে দেখেছি, সিল্ক রোড ধরে – অটোমান সম্রাটদের কাছে চীনা সম্রাটদের সব উপহার। অনিন্দ্য সুন্দর শিল্প সৌকর্যের চরম উৎকর্ষে সৃষ্ট সব চীনা মাটির শিল্পকর্ম। যতই দেখেছি ততই বহু শতাব্দী আগের সেইসব চীনা সৃষ্টিশীল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধায় হৃদয় মন আনত হয়েছে। সেই শৈশবে হুজুরের কাছে পড়তে বসে প্রিয় নবীর হাদিস আত্মস্ত করেছি “জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশেও যাও”।
ইতিমধ্যে পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণের সুযোগ আমার হয়েছে, চীন দেশে এখনও যাওয়া হয়নি বলে, প্রিয় নবীর বাণী বার বার কানে বাজে। স্কুলের গণ্ডি পেরুতেই চীনের মহা প্রাচীর – অবাক করেছে। কেমন করে অত শত পাহাড়ের পর পাহাড় চুড়া ডিঙ্গিয়ে শত প্রতিকুলতাকে ভ্রকূটি করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ঐ প্রাচীর সর্পিল ভঙ্গিতে চীনকে ঘিরে আছে। আরো অবাক হয়ে জেনেছি চাঁদ থেকে ভূপৃষ্টের যে কয়টি বস্তু দৃশ্যমান তার মধ্যে চীনের প্রাচীর অন্যতম। বয়স আর বোধ যখন দুটোই বেড়েছে – তখন জেনেছি প্রাচ্যে বারুদ আবিষ্কার করেছে চীনারা অথচ পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী আরো পরে পুঁজিবাদী শক্তি সেই বারুদকে গোলা বানিয়ে শাসন আর শোষণ করেছে এই প্রাচ্যকেই।
ইতিহাসের ছাত্র না হয়েও অবিনিবেশিত মন নিয়ে পাঠ করেছি খৃষ্টের জন্মেরও ৫৫০ বছর পূর্বের চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াসের লেখা যিনি যথার্থ মানুষকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে জেন এবং লি যথাক্রমে ‘ভালবাসা’ এবং সৎ আচার আচরণ, প্রথা সৎ গুণ ইত্যাদিকে নির্দেশ করে উল্লেখ করেছেন, What you do not went done to yourself, do not do to others. অর্থাৎ তুমি নিজের জন্য যা চাওনা তা অন্যের জন্য কামনা করো না।
চীনের দার্শনিক ইতিহাসের আরেক উজ্জল নক্ষত্র লাও ঝু (Lao Tzu)। ‘তা ও’ ইজম এর জনক। ‘তা ও’ অর্থ প্রকৃতির অনুশাসন। লাও ঝু’র শিক্ষা The Tao cannot be defeated one should Instead try to live in conformity with it . এর মর্মার্থ, প্রকৃতিকে পরাজিত করা যাবে না, সুতরাং প্রকৃতিকে পরাজিত করার চেষ্টা না করে প্রকৃতির অনুশাসন মেনে চলাই শ্রেয়। লাও ঝু তার তা ও’ দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পানিকেই উপজীব্য করেছেন, তিনি পানির অশেষ নমনীয়তা, এর নিম্নমুখী প্রবাহমানতা, সামন্য প্রতিবন্ধকতায়ও নির্বিবাদ সাড়া দেওয়ার বিষয় উল্লেখ করে মানুষকে কঠোর না হয়ে নমনীয় হতে বলেছেন কারণ পাথর কঠিন – ক্ষয়ে ক্ষয়ে তা বিলীন হয়ে যায় আর পানি ক্ষয়হীন অবিনশ্বর।
সামরিক বিষয়ের ছাত্র হিসাবে ২০০০ বছরেরও আগেকার চৈনিক সমর বিশেষজ্ঞ Sun Tzu’র মেধা, দার্শনিক উপলব্ধি আর দূরদর্শিতাপূর্ণ লেখা মুগ্ধ হয়ে পাঠ করেছি। সান ঝু’র লেখা What matters in war is not decimating the enemy army physically but breaking his will so as to make him concord defeat in the mind . যুদ্ধ ক্ষেত্রে পর্য্যুদস্ত করা নয় বরং যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই শত্রুর ইচ্ছা শক্তির উপর এমন প্রভাব বিস্তার করা উচিত যেন সে মানসিকভাবে পরাজিত হয়ে পড়ে, এটাই যুদ্ধের মূল কৌশল হওয়া উচিত। যুদ্ধের উপর হাজার বছর আগেকার চীনাদের কী গভীর উপলব্ধি।
যে জাতি দর্শনে, নির্মাণে, সৃষ্টিতে, বোধ আর মননে এমন সমৃদ্ধ সে জাতি বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটেও এক অবাক বিস্ময় সৃষ্টি করে চলেছে। ডন ডেনিং ‘Australian Resource and mind Report’ এর সম্পাদক, চীন সম্পর্কে তার এক সামপ্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন “Chaina is consuming Iron, Ore nature gas Copper Zinc and crude oil at a pace we Ove naver seen before in human history”. মর্মার্থ হল চীন বর্তমানে যে হারে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ ব্যবহার করছে পৃথিবীর ইতিহাসে তা নজিরবিহীন।
চীনের অর্থনীতি বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম, বাণিজ্যেও আমেরিকার পর পর তাদের স্থান, বাণিজ্য উদ্বৃত্তে তারা পৃথিবীতে অদ্বিতীয় আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চীনই বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের দেশ। কার্নেগি এ্যানডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পীস এর অর্থনীতিবিদ – গবেষক আলবার্ট কাইডেল তার সামপ্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের অর্থনীতি আমেরিকান অর্থনীতিকে দ্বিতীয় আসনে ঠেলে দেবে। তিনি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন “The dramatic economic change will make help chaina became a more important power in other areas including military and diplomatic affairs ”.
তার মতে চীনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক অগ্রগতি চীনকে সামরিক – কূটনৈতিক বিষয়সহ সকল ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে গড়ে তুলবে। এসব বিষয় স্মরণ রেখেই আমি আমার পূর্বের লেখা আমেরিকা – রাশিয়ার দ্বিতীয় স্নায়ু যুদ্ধে চীনের ভুমিকা কী হবে তার উপর আলোকপাত এর আশা ব্যক্ত করেছিলাম।
এ প্রসঙ্গে পাঠকের মনে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক আর সামরিক পরাশক্তি চীনের সাথে আমেরিকা বা রাশিয়ার স্নায়ূ যুদ্ধ নয় কেন ? এ প্রশ্নের উত্তর সুদূর অতীত থেকে সমসাময়িক বিশ্বের ঘটনা প্রবাহের উপর নজর রাখলে পাওয়া যাবে। রাশিয়ানরা জারদের আমল থেকে এই সেদিনের সোভিয়েত কালীন সময়ে, সর্বশেষ উদাহরণ আফগানিস্তান – কোথাও আদর্শ প্রচারের মাধ্যমে মনস্তাত্বিকভাবে, কোথাও সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বলয় সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছে। আমেরিকানরা পৃথিবীর হেন বিবাদ নেই যেখানে নিজেদের জড়িত করেনি। এই প্রেক্ষাপটে কোরীয় উপদ্বীপ ছাড়া চীনারা কোথাও সামরিকভাবে নিজেদের তেমনভাবে জড়িত করেনি। এই আলোকে আমি রাশিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে সম্ভাব্য স্নায়ু যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছি। এই যুদ্ধে চীনের ভূমিকা কী হবে?
বিশ্ব অর্থনীতির দৃশ্যপটে এক নাম্বার আসন থেকে চীনই আমেরিকাকে হঠাতে যাচ্ছে – রাশিয়াকে নয়। এক্ষেত্রে রাশিয়া চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অনুগামী হলে চীন আমেরিকাকে নয় স্নায়ু যুদ্ধে রাশিয়াকেই মদদ যোগাবে। সামপ্রতিক তিব্বত নিয়ে পশ্চিমা প্রচার প্রপাগান্ডায় আমেরিকাই চীনের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। এমনকি আমেরিকানরা বেজিং অলিম্পিক বয়কটের হুমকিও সৃষ্টি করেছিল। এই বিষয়টি নিশ্চিতভাবে চীনাদের জাতীয়তাবোধকে নাড়া দিয়ে থাকবে। বলাবাহুল্য এই জাতীয়তাবোধ ভবিষ্যতে আমেরিকার জন্য নেতিবাচক ফলই বয়ে আনবে।
তাইওয়ানে সর্বাধুনিক যুদ্ধ বিমান প্রেরণ, মিসাইল স্থাপন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে মার্কিনীদের বিপুল উপস্থিতি, আর্ন্তজাতিক সমস্ত আইন কানুন ভঙ্গ করে সাম্প্রতিকের ইরান আক্রমণ চীন কখনও ভালো চোখে দেখেনি। ভারতের সাথে আমেরিকার পারমানবিক নিরাপত্তা চুক্তিও চীন খুব একটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেখেনি, পাশাপাশি তিব্বত নিয়ে রাশিয়া শব্দটিও উচ্চারণ করেনি। ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্য, তাইওয়ান, উত্তর কোরিয়া, জাপান ইত্যাদি বিষয়ে চীন এবং রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গী প্রায় অভিন্ন। (চলবে)
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












