সবুজ বিপ্লবের অনন্য উচ্চতায় কেইপিজেড লাখ লাখ গাছ লাগিয়ে রেকর্ড

এম. নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা | শনিবার , ২০ জুন, ২০২৬ at ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত কোরিয়ান এক্সপোর্ট এন্ড প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) শিল্পবাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে দেশ সেরা পরিবেশ বান্ধব বিদেশী শিল্প জোনের তকমা পাওয়ার পাশাপাশি বিগত ২৬ বছরে ৩০ লাখ গাছ লাগিয়ে সবুজ শিল্পজোনের এক অনন্য উচ্চতায় এখন কেইপিজেড। সেই সাথে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব বোট্যানির গবেষণা রিপোর্টেও কেইপিজেডে প্রায় ৪০০ প্রজাতির গাছপালা ও উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর আয়োজনে ২০২৫ সালের ৭ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকায় চার দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫’ (বিনিয়োগ সম্মেলন) চলাকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা কেইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত পরিবেশ বান্ধব শিল্পকারখানা ও সবুজায়ন প্রকল্প দেখে মুগ্ধ হন। বিনিয়োগকারীরা এখানে আইটিসহ বিভিন্ন খাতে বিনোয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারই স্বীকৃতি স্বরূপ সরকার কেইপিজেড শিল্পজোনকে দেশ সেরা পরিবেশ বান্ধব জোনের ঘোষণাও দেন। গত বৃহস্পতিবারও চলতি বর্ষা মৌসুমে দুই লাখ গাছের চারা রোপণের কর্মসূচির উদ্বোধন করেন কেইপিজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো.শাহজাহান। এ সময় কেইপিজেডের উপ মহাব্যবস্থাপক মুশফিকুর রহমান সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কোরিয়ান ইপিজেডের পশ্চিম অংশ জুড়ে কর্ণফুলী নদী, দক্ষিণ পূর্বে টানেল সংযোগ সড়ক। আর অদূরে কর্ণফুলী টানেল, পারকি সমুদ্রসৈকত ও বঙ্গোপসাগর। এরই মাঝে প্রায় আড়াই হাজার একর জায়গার ন্যাড়া পাহাড়গুলো রীতিমত সবুজ বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ। সরকারি অনুমোদনের পর গত ২৬ বছরে এখানে লাগানো হয়েছে দেশি বিদেশী ফলদ, বনজ, ঔষুধি ও বিলুপ্ত প্রজাতির প্রায় ৩০ লাখের বেশি গাছ। বাংলাদেশে আর কোনো ইপিজেডে ৩০ লাখ বৃক্ষ রোপণ করে এ ধরনের শতভাগ পরিবেশ বান্ধব সবুজ বিপ্লব শিল্পকারখানা গড়ে তোলার নজির নেই। এটি ইপিজেড বা শিল্পজোনের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।

শুধু সবুজায়নের জন্য গাছ লাগানোই শুধু নয়, কেইপিজেডে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে বেশ কয়েকটি কৃত্রিম হ্রদ। পাহাড়ি ঢাল ও চড়াইউতরাইয়ের মধ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সড়ক ও প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে দৃষ্টিনন্দন কারখানা। সেই সাথে বিনিয়োগকারীদের বিনোদনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিশ্বমানের একটি গলফ মাঠ। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আন্তজাতিক মানের ১০০ বেডের হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ। চালুর অপেক্ষায় আছে দেশের অত্যাধুনিক দৃষ্টিনন্দন প্রযুক্তি নির্ভর টেঙটাইল বিশ্ববিদ্যালয়। এ প্রতিষ্ঠানের মাঠে একাধিকবার জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়।

শুধু তাই নয় বর্তমানে এ শিল্পজোনে নির্মিত হচ্ছে বিশ্ব মানের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল এন্ড কলেজ। ৫০০ বেডের আরো একটি হাসপাতাল নির্মাণ কার্যক্রম পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড় পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে।

কেইপিজেড সূত্র জানায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের শর্ত অনুযায়ী কেইপিজেডের ২ হাজার ৪৯২ একর আয়তনের ভূমির ৫২% জমি অর্থাৎ প্রায় ১৩০০ একর জমি সবুজ ও উন্মুক্ত রাখার কথা এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশ জমিতে গাছ লাগিয়ে সবুজায়ন ও বাকী ১৯% জমি উন্মুক্ত রাখার কথা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী এ শিল্পজোনের প্রায় ৮২২ একর জমিতে লাগানো হয়েছে প্রায় ৩০ লাখের বেশি গাছ। বাকী ৪৭৮ একর জমিতে লেক ও সবুজ মাঠের মাধ্যমে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কেইপিজেডে ২৫টি জলাধার আছে, যাতে ৫০০ মিলিয়ন গ্যালন পানি সংরক্ষিত থাকে। এতে এলাকার পানির সংকট অনেকাংশে কেটে গেছে। লেকগুলোতে প্রতি বছরই বাড়ছে অতিথি পাখির বিচরণ। পরিবেশের এই উন্নতির ফলে কেইপিজেডে প্রায় ১৩৭ প্রজাতির পাখির বসতি তৈরি হয়েছে। কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ জানায়, আর্ন্তজাতিক পরিবেশ সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের প্রতিবেদনেও কেইপিজেডের পরিবেশ বান্ধব কার্যক্রমের ভূয়সী প্রসংশা করা হয়েছে। বর্তমানে এ জোনে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন গড়ে তোলা হয় যেখানে হাজার বছরের বিলুপ্ত দুর্লভ প্রজাতির গাছপালা ও উদ্ভিদের সংগ্রহ করা হয়েছে।

কর্ণফুলী ইপিজেডে প্রবেশের মুখে নজর কাড়ে সারি সারি আম গাছ। মূল সড়ক থেকে আরেকটু দক্ষিণে গেলে দেখা মেলে নারিকেল গাছের বাগান। সবুজের এমন সমারোহের মাঝে শোনা যায় কারখানার গড়গড় আওয়াজও। কোথাও জুতা বানানো হচ্ছে। কোথাওবা জামা। একটি কারখানা থেকে আরেকটি কারখানার দূরত্ব বেশ। মেহগনি, গর্জন, হরীতকী, নিম, আমলকী কিংবা আগরজাতীয় ঔষধি গাছ দিয়ে এ দূরত্ব তৈরি করা হয়েছে; যেন সবুজের সামিয়ানা। এভাবে সবুজকে প্রাধান্য দিয়ে কেইপিজেডের এগিয়ে চলা। বাংলাদেশের অন্য কোনো ইপিজেডে নেই এত গাছের সমাহার।

কেইপিজেডে ঢুকলেই কর্ণফুলী সু ফ্যাক্টরির পাশে দেখা যাবে সেগুন গাছের বাগান। কর্ণফুলী গার্মেন্টের চারপাশে আছে মেহগনি গাছের সারি। কর্ণফুলী পলিয়েস্টার প্রোডাক্ট ও এভারটপ প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির চারপাশে দেখা গেছে অর্জুন, বহেড়া, হরীতকী, নিম, আমলকী ও আগরজাতীয় ঔষধি গাছ। গায়া প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ও দেইগু প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির কারখানার পাশে অঙিজেন দিচ্ছে আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল, সফেদা, কামরাঙা, কুল, পেয়ারাসহ নানা ফলদ গাছ।

কেইপিজেডের উপ মহা ব্যবস্থহাপক মুশফিকুর রহমান বলেন, কেইপিজেডে শতভাগ পরিবেশ বান্ধব রপ্তানি অঞ্চলের স্বীকৃতি ইতিমধ্যে অর্জন করেছে। এ পর্যন্ত ৩০ লাখের বেশি গাছ লাগানো হয়েছে। সবুজের সমারোহ ঘটাতে এ বছরও দুই লাখ গাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে।

জানা যায়, বর্তমানে কেইপিজেডে রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ সেগুন গাছ, ৩ লাখ মেহগণি গাছ, দেড় লাখ গামারি গাছ, ৫০ হাজারের বেশি গর্জন গাছ। এক লাখের বেশী হাইব্রিড প্রজাতির গাছ আছে। এছাড়াও রয়েছে অর্জুন, বহেরা, হরীতকী, নিম, আমলকী ও আগরজাতীয় প্রায় ১ লাখ ঔষধি গাছ।

আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল, সফেদা, কামরাঙা, কুল, পেয়ারাসহ ফলজ গাছ আছে দুই লাখের বেশী। শুধু তাই নয় জারুল, সোনালু, তেলসুর, শিলকড়ই, রেইনট্রি, কৃষ্ণচূড়া, ছিকরেশি, চম্পা, ঝাউ, চাপালিশ, বকুল, কাঠবাদামসহ বিভিন্ন জাতের প্রায় আরো ৮ লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য দেশিবিদেশী প্রজাতির কয়েক লাখ গাছও রয়েছে।

১৯৯৬ সালে দক্ষিণ কেরিয়া ভিত্তিক সফল ব্যবসায়িক কোম্পানী ইয়ংওয়ান করপোরেশন লিমিটেডকে কেইপিজেড স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়। ইয়াং ওয়ান করপোরেশন জমি বরাদ্দ পায় ১৯৯৯ সালের আগস্টে। কেইপিজেডের পরিবেশ ছাড়পত্র ইস্যু করা হয় ২০০৯ সালে। এরপরও নানা জটিলতায় বার বার বাধাগ্রস্ত হয় কেইপিজেডের কাজ। বর্তমানে এখানে পরিবেশ বান্ধব ৫০টি কারখানায় উৎপাদন চলছে। এসব কারখানায় ৩৫ হাজারেও বেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআজ ডাচদের ঘুরে দাঁড়ানোর পরীক্ষা
পরবর্তী নিবন্ধনগরের নিচু এলাকায় হাঁটুপানি