প্রতি মাসে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন সূচক নিয়ে ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংস্থাটির সবশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১৮ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকার। একই সময়ে সুদ–আসল পরিশোধ করা হয়েছে ১৬ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। ফলে এ দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকায়। অথচ আগের ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধির এ সংখ্যা ছিল ঋণাত্মক ৬২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের সুদহার হ্রাস ও পুঁজিবাজারের মন্দা পরিস্থিতির কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে আবারো সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই–আগস্ট) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতে মূল্যস্ফীতির তুলনায় আমানতের সুদহার কিছুটা কমে যাওয়া ও পুঁজিবাজারে টানা মন্দার ফলে আমানতকারীরা জমানো অর্থ নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করতে চাইছেন। শতভাগ সরকারি নিশ্চয়তা ও নির্দিষ্ট হারে মুনাফার কারণে ছোট ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে আবারো সঞ্চয়পত্রকেই বেছে নিয়েছেন। টানা তিন অর্থবছর নিট বিক্রি ঋণাত্মক থাকার পর ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের বাজার ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসে। চলতি অর্থবছরেও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কখনই ভালোভাবে বিকশিত হয়নি। বিনিয়োগের পরিধি কম থাকায় সাধারণ মানুষ ব্যাংকের দিকেই বেশি ঝোঁকেন। অথচ দেশের ব্যাংক খাতেও নাজুক অবস্থা। নানা অনিয়ম–দুর্নীতি ও তারল্য সংকটে এক ডজনেরও বেশি ব্যাংক মৃতপ্রায়। এ পরিস্থিতিতে তুলনামূলক ভালো ব্যাংকগুলোয় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন গ্রাহকরা। অতিরিক্ত তারল্যের চাপে ব্যাংকগুলোও আমানতের সুদহার কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নবিত্ত, নিম্ন–মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য দেশে নিরাপদ বিনিয়োগের বিকল্প কম। বয়স্ক অনেক মানুষ তাঁদের জীবনযাপনের ব্যয় সঞ্চয়পত্রের আয় থেকে করে থাকেন। অনেক অবসরপ্রাপ্ত ও বয়স্ক নাগরিক আছেন, যাঁদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের অর্থ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে সঞ্চয়পত্রের আয় থেকেই চলেন। তাই সঞ্চয়পত্রের আয় বৃদ্ধি পেলে তাঁদের দৈনন্দিন খরচ নির্বাহ করা সহজ হবে। বলা বাহুল্য, সঞ্চয়পত্র এক প্রকার নিরাপদ বিনিয়োগরূপে বিবেচিত হয় সমাজে। অনেকে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে পেনশনাররূপে তাঁর অর্থ সরকারের নিকট জমা রাখেন। তা থেকে প্রাপ্ত মুনাফাই ঐ সকল ব্যক্তির আয়ের প্রধান উৎস হয়ে থাকে। অনুরূপ পারিবারিক সঞ্চয়পত্রও রয়েছে এবং বলা জরুরি যে, এই মুনাফার ওপর সমগ্র পরিবার নির্ভরশীল। নির্দিষ্ট মুনাফার উপর জীবিকা নির্বাহ এদের কঠিন হলেও অনেকের বিকল্প উপায়ও থাকে না। কিংবা অন্যান্য ব্যবসা বা বিনিয়োগের সামর্থ্যও থাকে না। তারা সরকার নির্দিষ্ট মুনাফা দেখেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকেন এবং সেই অনুপাতে ব্যয় নির্বাহ করেন। কিন্তু হঠাৎ মুনাফার হার হ্রাস পেলে ব্যয়ের খাতে চাপ পড়া স্বাভাবিক। তাই যেভাবেই হোক, দেশের সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য সঞ্চয়পত্রকে লাভজনক রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিভাবে মুনাফার হার বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায় তজ্জন্য জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরকে আরও তৎপর হতে হবে। বিশ্লেষকরা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ একেবারেই সন্তোষজনক নয়। সাধারণ মানুষ তাঁদের সঞ্চিত অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করবেন, সেটা নিয়ে তাঁরা অস্থির। সমস্যার গোড়ায় সমাধান করে ব্যবসা–বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব সরকারের। কেননা, সঞ্চয়পত্রের মূল গ্রাহক মূলত দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। তাদের অনেকের সংসার খরচের একটা বড় অংশ আসে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে। বড় কোনো অসুখ কিংবা সংকটের সময় তারা সঞ্চয়পত্র ভেঙে পরিস্থিতি সামাল দেয়। আমরা মনে করি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির কারণে বিপুলসংখ্যক নাগরিক যখন সংকটে আছে, তখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বাড়ানো উচিত। দেশের সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য সঞ্চয়পত্রকে লাভজনক রাখতে হবে।







