মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য একটি বহিরাগত সংকট। ফলে সংকুচিত হচ্ছে বিদেশের শ্রমবাজার। গত ১৭ অক্টোবর দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা এবং আন্তর্জাতিক ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতায় একের পর এক বাধার মুখে পড়েছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত। একদিকে যুদ্ধের অভিঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলোতে নতুন নিয়োগের গতি কমেছে, অন্যদিকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পেয়েও ভিসা, দূতাবাসের সাক্ষাৎকার ও বিমান চলাচলের জটিলতায় আটকে যাচ্ছেন অনেক কর্মী। ছুটিতে দেশে এসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়ায় কর্মস্থলে ফিরতে না পারার অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের অনুমতিপত্র পেয়েও ভারতে গিয়ে পাসপোর্ট জমা দিতে না পারায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অনেকে। এর সঙ্গে সৌদি আরবে নিরাপত্তাঝুঁকি ও ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সব মিলিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি চাকরি হারানো, নিয়োগ বাতিল, আর্থিক ক্ষতি এবং দেশে ফিরে আসার আশঙ্কা বাড়ছে। অথচ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় এখনো ঊর্ধ্বমুখী। তবে অর্থনীতির এই আপাত স্বস্তির আড়ালে নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার ধারাবাহিক পতন ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি নিয়ে সংশয় তৈরি করছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। কারিগরি শিক্ষার কথা বলা হলেও বাস্তবে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে (টিটিসি) বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীরা দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও নেই কারিগরি কোর্স। ফলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নতুন বাজার ধরতে পারছে না বাংলাদেশ। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশ গেছেন, যার দুই–তৃতীয়াংশই অর্থাৎ,৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন গেছেন সৌদি আরবে। পাশাপাশি কাতারে ১ লাখ ৭ হাজার ৫৯৮ জন, কুয়েতে ৪২ হাজার ৭৪৬ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ১৩ হাজার ৭৫০ জন এবং অন্যান্য দেশে গেছেন ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩২২ জন। আর চলতি বছর গতকাল পর্যন্ত বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন। এর মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনই সৌদি আরবের। বলা যায়, সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে ৫৮৪ কোটি ৯১ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এসেছে ১১৪ কোটি ৫৯ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হওয়া কিংবা নতুন কর্মী নিয়োগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কর্মীদের আয় ও দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা চাপে পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশ সরকারকে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো, কাজে যোগদানের সময়সীমা শিথিল এবং নিয়োগচুক্তি বহাল রাখার উদ্যোগ জরুরি। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দায় কনস্যুলেটের মাধ্যমে আটকে পড়া কর্মীদের আবাসন, খাবার, চিকিৎসা ও বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নিহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসা সহায়তাও অগ্রাধিকার পেতে হবে। কার্যকর কূটনীতি এবং প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান রক্ষা মানে শুধু তাঁদের জীবন–জীবিকা রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। তাঁরা বলেন, যেকোনো একক দেশ বা অঞ্চলের ওপর পুরো শ্রম খাতকে নির্ভরশীল না রেখে শ্রমবাজারের দ্রুত বহুমুখীকরণ বা অলটারনেটিভ মার্কেট তৈরি করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দেশের শ্রমবাজারের পাশাপাশি বিদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারিত করতে হবে।








