শৈশবের ভ্রমণ, ভবিষ্যতের পর্যটন : ভ্রমণে গড়ে উঠুক সচেতন, মানবিক ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম

মোঃ নুরুল আনোয়ার | শুক্রবার , ৬ নভেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ

একটি শিশুকে শুধু বই পড়ে দেশকে চেনানো যায় না; তাকে দেশের প্রকৃতি, মানুষ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির কাছেও নিয়ে যেতে হয়। শৈশবের ভ্রমণ তাই নিছক বিনোদন নয়–এটি শিশুর মনে অজান্তেই মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও দেশকে ভালোবাসার বীজ বপনের একটি কার্যকর মাধ্যম। আজ যে শিশু নদী, পাহাড়, সমুদ্র, বন কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখে বড় হবে, আগামী দিনে সেই অভিজ্ঞতাই তার চিন্তা ও আচরণে প্রতিফলিত হতে পারে।

ভ্রমণ হোক জীবন্ত শিক্ষা

শিশুর শেখার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো নিজের চোখে দেখা ও অভিজ্ঞতা অর্জন। পাহাড়ে গিয়ে সে প্রকৃতির বৈচিত্র্য দেখে, নদীর কাছে গিয়ে পানির গুরুত্ব বোঝে, জাদুঘর বা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে গিয়ে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয়। নতুন মানুষের সঙ্গে মিশে সে ভিন্ন জীবনযাপন ও সংস্কৃতিকে জানতে শেখে।

শৈশবে আনন্দ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা আসে, তা অনেক সময় শিশুর মনে গভীরভাবে গেঁথে যায় এবং ভবিষ্যতে স্বাভাবিক আচরণের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে ভ্রমণ হতে পারে শ্রেণিকক্ষের বাইরের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন।

প্রকৃতি দেখা থেকে প্রকৃতি রক্ষার শিক্ষা : শিশুকে শুধু প্রকৃতি দেখালেই হবে না; প্রকৃতিকে রক্ষা করার শিক্ষাও দিতে হবে। ভ্রমণের সময় তাকে শেখানো যেতে পারে– আবর্জনা যেখানে–সেখানে ফেলা যাবে না, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে, পানি অপচয় করা যাবে না এবং গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করা যাবে না।

একটি শিশু যখন নিজের চোখে নদী, পাহাড় বা বন দেখে এবং জানতে পারে মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডে এসব সম্পদ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তখন পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি তার কাছে শুধু বইয়ের কথা থাকে না। শৈশবে তৈরি হওয়া এই অভ্যাস ভবিষ্যতে তার জীবনাচরণের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

ভ্রমণ থেকে মানবিকতা ও দেশপ্রেম : বাংলাদেশের একেক অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন একেক রকম। শহরের শিশু গ্রামে গিয়ে কৃষকের জীবন দেখতে পারে, নদীবিধৌত অঞ্চলে গিয়ে জেলেদের সংগ্রাম জানতে পারে, পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। এসব অভিজ্ঞতা শিশুকে সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও মানুষের প্রতি সম্মান করতে শেখায়।

একইভাবে দেশের নদী, পাহাড়, সমুদ্র, বন, প্রত্নসম্পদ ও লোকসংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার মধ্য দিয়ে শিশুর মধ্যে নিজের দেশের প্রতি মমত্ববোধ তৈরি হয়। দেশপ্রেম শুধু জাতীয় দিবসে পতাকা হাতে নেওয়া নয়; দেশের মানুষ, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াও দেশপ্রেমের অংশ।

নিরাপত্তা ও সামর্থ্য–দুটিই জরুরি : শিশুদের ভ্রমণে নিরাপত্তা হতে হবে প্রথম শর্ত। বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী গন্তব্য নির্বাচন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সার্বক্ষণিক নজরদারি, পানিতে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, জরুরি যোগাযোগ নম্বর ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা এবং ভ্রমণের আগে আবহাওয়া ও স্থানীয় ঝুঁকি সম্পর্কে জানা জরুরি।

পর্যটনসেবা প্রদানকারীদেরও নিরাপদ পরিবহন, শিশুবান্ধব আবাসন, প্রশিক্ষিত কর্মী, প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুদের পর্যটন মানেই ব্যয়বহুল বিদেশ ভ্রমণ নয়। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী কাছের নদী, পার্ক, জাদুঘর, গ্রাম, ঐতিহাসিক স্থান বা প্রাকৃতিক গন্তব্যে একদিনের ভ্রমণও শিশুর জন্য মূল্যবান শিক্ষার অভিজ্ঞতা হতে পারে।

আজকের শিশু, আগামীর পর্যটনের দূত : শৈশবের ভ্রমণের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না। আজ একটি শিশু যেখানে আবর্জনা না ফেলার শিক্ষা পেল, প্রকৃতিকে সম্মান করতে শিখল, অন্য মানুষের জীবনকে বুঝতে শিখল এবং নিজের দেশের সৌন্দর্য অনুভব করল–বহু বছর পর সেই শিক্ষাই তার আচরণে প্রকাশ পেতে পারে।

তখন সে শুধু একজন পর্যটক থাকবে না; সে হবে দায়িত্বশীল নাগরিক, প্রকৃতির বন্ধু এবং পর্যটনের দূত। তার অভিজ্ঞতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও পর্যটনসম্পদের পরিচয় অন্যদের কাছেও পৌঁছাতে পারে।

এখনই শুরু হোক : বাংলাদেশের পর্যটনের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র, হোটেল বা যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির ওপর নির্ভর করে না। কেমন মানুষ ভবিষ্যতে এই পর্যটনসম্পদ ব্যবহার করবে, সংরক্ষণ করবে এবং বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে–তার ওপরও পর্যটনের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল।

তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পর্যটন ব্যবসা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে শিশুদের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী, শিক্ষামূলক ও পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিশুকে শুধু কোথায় বেড়াতে নিয়ে গেলাম–তা নয়; ভ্রমণ থেকে সে কী শিখল এবং সেই শিক্ষা ভবিষ্যতে কীভাবে কাজে লাগাবে–সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

আজকের শিশুর মনে যদি ভ্রমণের মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি মমতা, পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং নিজের দেশের প্রতি গভীর অনুরাগ তৈরি করা যায়, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ পাবে আরও সচেতন, মানবিক ও দেশপ্রেমিক একটি প্রজন্ম। শৈশবের ভ্রমণ তাই শুধু সুন্দর স্মৃতি নয়–এটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও একটি বিনিয়োগ।

লেখক : প্রাবন্ধিক, ডিরেক্টর ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)

পূর্ববর্তী নিবন্ধচিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন
পরবর্তী নিবন্ধজুম্‌’আর খুতবা