একটি দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ধারিত হয় তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে, কিন্তু শিশুর শেখার অভ্যাস, কৌতূহল, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, সামাজিকতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক শিক্ষায়। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে দেখলে শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরটিকেই সংকুচিত করা হয়।
চীনের শিক্ষা–অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে চীনকে অনুকরণ নয়; বরং তার সাফল্য, সংস্কার ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের বাস্তবতার উপযোগী শিক্ষা–দর্শন নির্মাণই হওয়া উচিত লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও OECD–এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীনে প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ, সামাজিক দায়িত্ব ও শিশুর সামগ্রিক বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে। ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতা, শারীরিক শিক্ষা, শিল্প এবং ব্যবহারিক কার্যক্রমও পাঠ্যক্রমে স্থান পেয়েছে।
মুখস্থবিদ্যা নয়, ভিত্তিমজবুত শিক্ষা : বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিশু বিদ্যালয়ে গেলেও সে কতটা শিখছে, তা সবসময় নিশ্চিত হচ্ছে না। UNICEF–এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৭–১৪ বছর বয়সী বাংলাদেশের শিশুদের প্রায় ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পাঠদক্ষতা এবং ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা রয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে যাওয়া ও শিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ বাড়লেও foundational learning এখনও বড় ঘাটতির জায়গা।
এখানেই চীনের প্রথম শিক্ষা প্রথমে ভিত্তি, পরে বিস্তার। শিশু প্রথম কয়েক বছরে ভালোভাবে পড়তে, লিখতে, বুঝতে, প্রশ্ন করতে ও মৌলিক গণিত করতে না পারলে পরবর্তী শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। তাই কতটি অধ্যায় শেষ হলো তার চেয়ে শিশু আসলে কী শিখল এই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বই হাতে তুলে দেওয়া যথেষ্ট নয়; তাকে বুঝে পড়তে শেখাতে হবে। গণিতের সূত্র মুখস্থ করানোর বদলে দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা দিয়ে তাকে গণিত ভাবতে শেখাতে হবে।
শিশুর সামগ্রিক বিকাশ : চীনের শিক্ষা সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো all-round development বা শিশুর সামগ্রিক বিকাশ। নৈতিকতা, ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, শিল্প, শারীরিক শিক্ষা এবং ব্যবহারিক কাজের সমন্বয় তারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশেও ভালো শিক্ষার্থী বলতে শুধু ভালো পরীক্ষার ফল করা শিশুকে বোঝানো উচিত নয়। কৌতূহল, সৃজনশীলতা, সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ, যোগাযোগ, সহযোগিতা, শারীরিক সক্ষমতা, প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ফল। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্য শুধু বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের নম্বর দিয়ে মাপা যথেষ্ট নয়।
খেলাকে শিক্ষার মাধ্যম করা : চীনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হলো খেলাভিত্তিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়া। ২০০১ সালের পর শিশুকেন্দ্রিক ও play-based learning–এর ওপর গুরুত্ব বাড়ে। Zhejiang–এর Anji Play, Shandong–এর Lijin Play এবং Jiangsu–এর gamification–এর মতো উদ্যোগে খেলা, অনুসন্ধান, স্বাধীনতা ও শিক্ষক–পর্যবেক্ষণকে শেখার অংশ করা হয়েছে। গবেষণায় উন্মুক্ত খেলার পরিবেশ, পর্যাপ্ত সময়, শিক্ষকের পরিবর্তিত ভূমিকা এবং শিশুকেন্দ্রিক মূল্যায়নের গুরুত্ব উঠে এসেছে। সামপ্রতিক গবেষণাতেও স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশকে playful learning–এর সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা স্পষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ছোট পরীক্ষার হল নয়, ছোট্ট শেখার জগৎ করতে হবে। গ্রামের শিশু গাছ, পাখি, নদী, মাটি, কৃষি, বৃষ্টি ও মাছের মধ্যেই বিজ্ঞান শিখতে পারে; শহরের শিশু রাস্তা, যানবাহন, বাজার, পানি, বর্জ্য ও নগর সবুজায়ন থেকে গণিত ও বিজ্ঞান শিখতে পারে। শিক্ষা হতে পারে আরও স্থানীয়, আনন্দময় ও জীবনঘনিষ্ঠ।
কিন্ডারগার্টেন থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মসৃণ উত্তরণ : চীনের অভিজ্ঞতা এখানে একটি সতর্কবার্তাও দেয়। খেলাভিত্তিক kindergarten থেকে তুলনামূলক বেশি কাঠামোবদ্ধ প্রাথমিক শিক্ষায় হঠাৎ প্রবেশ শিশুদের জন্য কঠিন হতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, সফল school transition–এর জন্য শুধু একাডেমিক প্রস্তুতি নয়; আবেগীয়, আন্তঃব্যক্তিক ও আচরণগত দক্ষতা, শেখার অভ্যাস এবং self-care ability–ও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, kindergarten ও primary school–এর সহযোগিতাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশেও kindergarten ও primary school–এর বিচ্ছিন্নতা কমানো জরুরি। পাঁচ বছর বয়সে যে শিশু খেলতে খেলতে শেখে, ছয় বছর বয়সে তার সামনে হঠাৎ খাতা, বাড়ির কাজ ও পরীক্ষার চাপ হাজির করা উচিত নয়। transition period হওয়া উচিত ধীরে ধীরে শেখার অভ্যাস গড়ে তোলার সময়।
শিক্ষককে পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলা : চীনের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি শক্তি হলো শিক্ষক পেশাগত উন্নয়ন। বিশেষ করে Shanghai–এর অভিজ্ঞতায় lesson observation, mentoring, demonstration lesson এবং subject-based teaching-studz group–এর মাধ্যমে শিক্ষকরা নিয়মিত নিজেদের পাঠদানের পদ্ধতি উন্নত করেন। OECD–ও শিক্ষক–সহযোগিতা ও professional learning–কে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো বছরে একবার প্রশিক্ষণ দিয়ে ভালো শিক্ষক তৈরি করা যায় না। প্রয়োজন continuous professional development। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত আলোচনা করতে পারেন কোন শিশু পিছিয়ে আছে, কেন পিছিয়ে আছে, কোন পদ্ধতিতে সে ভালো শেখে এবং কীভাবে পাঠ আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করা যায়। এমন teacher learning community গড়ে উঠলে শিক্ষক প্রশিক্ষণের অর্থই বদলে যাবে।
কেন্দ্রীয় মানদণ্ড, স্থানীয় স্বাধীনতা : চীনে জাতীয়, আঞ্চলিক ও বিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ্যক্রম ব্যবস্থাপনার সমন্বয় রয়েছে। জাতীয়ভাবে কিছু মূল লক্ষ্য ও মানদণ্ড নির্ধারিত হলেও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার সুযোগও আছে। বাংলাদেশেও প্রয়োজন এমন ভারসাম্য। জাতীয়ভাবে নির্ধারিত হতে পারে সব শিশুর কী শেখা অপরিহার্য; কিন্তু বিদ্যালয় পর্যায়ে কিছু স্বাধীনতা থাকতে পারে কীভাবে শেখানো হবে।
চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, বরেন্দ্রভূমি, হাওর, চর, উপকূল ও নগরের শিশুর জীবন–অভিজ্ঞতা এক নয়। সেই বৈচিত্র্যকে পাঠ্যক্রমে ব্যবহার করা গেলে শিক্ষা আরও অর্থবহ হবে।
পরীক্ষার চাপ কমানো, শিক্ষার মান নয় : চীনের ২০২১ সালের Double Reduction policy–এর উদ্দেশ্য ছিল অতিরিক্ত homework ও off-campus academic tutoring–এর চাপ কমানো। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ভিত্তিক after-school service বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের একটি longitudinal গবেষণায় Beijing–এর চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে homework কমানো ও school-based after-school service–এর সঙ্গে subjective বিষষ-being বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে, অথচ সামগ্রিক academic performance নষ্ট হয়নি। তবে private tutoring নিয়ন্ত্রণের প্রভাব নিম্ন–আর্থসামাজিক পরিবারের ক্ষেত্রে জটিল ছিল।
অতএব শুধু homework কমালেই হবে না; বিদ্যালয়কে আরও কার্যকর করতে হবে। বাংলাদেশেও বাড়ির কাজের চাপ কমানোর পাশাপাশি বিদ্যালয়ে অনুশীলন, পাঠ–সহায়তা, খেলাধুলা, শিল্পচর্চা ও remedial support নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চীনের সবকিছু নয়, উপযোগী শিক্ষা : চীনের শিক্ষাব্যবস্থার দ্বৈত অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে তার শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে উচ্চ ফল করেছে; অন্যদিকে অতিরিক্ত একাডেমিক প্রতিযোগিতা, tutoring I parental anxiety বড় সমস্যা তৈরি করেছে। Double Reduction–এর পরও private tutoring–এর চাহিদা পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে শুধু প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক সামাজিক সংস্কৃতি বদলানো কঠিন।
বাংলাদেশের শিক্ষা তাই হতে হবে বাছাই করা শিক্ষা: চীনের শৃঙ্খলা ও শিক্ষক উন্নয়নের সংস্কৃতি নেওয়া যায়, কিন্তু অতিরিক্ত পরীক্ষামুখিতা নয়; মানদণ্ড রাখা যায়, কিন্তু অন্ধ কেন্দ্রীকরণ নয়; পরিশ্রমের সংস্কৃতি উৎসাহিত করা যায়, কিন্তু শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া নয়।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা–দর্শন : চীনের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত দর্শন হতে পারে “প্রথমে ভিত্তি, তারপর বিস্তার; প্রথমে শিশু, তারপর পরীক্ষা; প্রথমে শেখা, তারপর নম্বর।”
এর জন্য প্রথম কয়েক বছরকে foundational learning–এর বিশেষ পর্যায় হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে; খেলাধুলা, প্রকৃতি, শিল্প, গল্প, সংগীত ও ব্যবহারিক কাজকে শিক্ষার অংশ করতে হবে; বিদ্যালয়ভিত্তিক continuous professional learning চালু করতে হবে; formative assessment শক্তিশালী করতে হবে; এবং পরিবারকে শিক্ষার অংশীদার করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত চীনের প্রাথমিক শিক্ষা দর্শনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যবই, প্রযুক্তি বা পরীক্ষা–পদ্ধতি নয়। আসল শিক্ষা হলো শিশুর শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা। একটি শিশু কত নম্বর পেল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সে কি পড়তে ভালোবাসে, প্রশ্ন করতে ভয় পায় না, ভুল হলে আবার চেষ্টা করে, অন্যের কথা শোনে, নিজের কাজ নিজে করতে পারে এবং প্রকৃতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হয় এই প্রশ্নগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ যদি প্রাথমিক শিক্ষাকে এই দৃষ্টিতে দেখতে পারে, তাহলে বিদ্যালয় শুধু পরীক্ষার ফল তৈরি করবে না; তৈরি করবে মানুষ। চীনের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে মূল্যবান পাঠ তাই শিক্ষাব্যবস্থার শক্তি শুধু তার পরীক্ষার ফলাফলে নয়; তার শক্তি হলো, সে কেমন মানুষ তৈরি করছে।
লেখক: প্রফেসর, বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।












